আপন তারিক
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:১৬ পিএম
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৫:০৪ পিএম
তাদের পরিচয়ের গল্পটা ল্যান্ডফোনের সেই দিনগুলোতে। রুপালি পর্দায় যেমনটা দেখা যায়, অনেকটা তাই। একদিন এক নির্জন মধ্যদুপুরে মোনেম মুন্নার ল্যান্ডফোন বেজে উঠল। ওপার থেকে মিষ্টি কণ্ঠের এক তরুণী বলে উঠলেন, ‘আপনি কি মুন্না বলছেন? কিছুক্ষণ কথা বলা যাবে?’ ব্যস, তারপরই পথচলা শুরু মিষ্টিমধুর এক সম্পর্কের!
পরিচিত একজনের কাছ থেকে ফুটবলার মুন্নার নম্বরটি পেয়েছিলেন সুরভী। কিছুটা ভয়, কিছুটা দ্বিধা নিয়েই তো ল্যান্ডফোনের দিনগুলোতে এগিয়ে যেত সম্পর্কের বুনন! এখানেও তাই। তার ওপর মুন্না তখন সুপারস্টার। রক্ষণের একজন ফুটবলারও যে তারকাদ্যুতিতে স্ট্রাইকারদের পেছনে ফেলতে পারেন তার বড় উদাহরণ। প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের মারাত্মক ট্যাকলে যিনি দিশেহারা করে দেন, তার সঙ্গে কথা বলাটা তো ঝুঁকিরই ছিল। কিন্তু সুরভী সাহস নিয়েই শুরু করেছিলেন সেদিন!
তারপর যেমনটা হয়েছে গত শতাব্দীতে। লুকিয়ে লুকিয়ে কিছুদিন কথাবার্তা। এরপর চটজলদিই দুই পরিবারের সম্মতি। মাস ছয়েকের পরিচয়পর্ব শেষে ১২ ফেব্রুয়ারিতে দুই হাত এক হলো। মুন্না তার কণ্ঠের গাম্ভীর্য দূরে সরিয়ে বললেন, কবুল! কিন্তু সেই সম্পর্কের গল্পটা দীর্ঘ হলো না, পথচলাটা অসম্পূর্ণই থাকল। মাত্র ১২ বছরেই সব শেষ!
আরও পড়ুন: যে ভোরে শেষবার আবাহনী প্রাঙ্গণে মুন্না!
সত্যিই কি সব শেষ? না, সুরভী মোনেম তেমনটা মনে করেন না। ধানমন্ডির শেরেবাংলা রোডের ৪৯/এ নম্বরের বাড়ির সাততলায় ছোট্ট ফ্ল্যাটটিতে বসে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার চোখের জল মুছলেন। আবেগে ভাসলেন, আবার কখনও প্রয়াত স্বামীর কথা বলতে গিয়ে গর্বে মাথা উঁচু করলেন। যে বাড়িটাতে মুন্নার শেষ কিছুদিন কেটেছে সেই ঘর, সাড়ে নয়শ স্কয়ার ফিটের বাড়িটাতে এদিক-সেদিক এখনও মুন্নাকে খুঁজে বেড়ান তিনি।
২০০৫ সালের আজকের দিনে (১২ ফেব্রুয়ারি) হারিয়েছেন মানুষটাকে, প্রিয়তম স্বামীকে। অথচ তার কাছে মনে হয় মুন্না হয়তো এখানেই আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেখছেন তাকে আর দুই আদরের সন্তান পুত্র আজমান সালিদ এবং কন্যা ইউসরা মোনেম দানিয়াকে! সুরভী বলছিলেন, ‘মুন্না আসলে অনেক বড় এবং ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে আমার সংসারজীবন বারো বছরের। এই সময়ে তাকে যতটুকু কাছে পেয়েছি, আসলে অর্ধেক জীবন তার ফুটবলের সঙ্গে ছিল, সংসারে সেভাবে সময় দিতে পারেননি, তারপরও তিনি যথেষ্ট ভালো এবং বড় মনের মানুষ ছিলেন। ব্যস্ত থাকলেও সংসার এবং বাচ্চাদের প্রতি তার কোনো ধরনের অবহেলা ছিল না।’
‘মুন্না আসলে অনেক বড় এবং ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে আমার সংসারজীবন বারো বছরের। এই সময়ে তাকে যতটুকু কাছে পেয়েছি, আসলে অর্ধেক জীবন তার ফুটবলের সঙ্গে ছিল, সংসারে সেভাবে সময় দিতে পারেননি, তারপরও তিনি যথেষ্ট ভালো এবং বড় মনের মানুষ ছিলেন। ব্যস্ত থাকলেও সংসার এবং বাচ্চাদের প্রতি তার কোনো ধরনের অবহেলা ছিল না।’
প্রয়াত কিংবদন্তি ফুটবলার মোনেম মুন্নার মেয়ে দানিয়া এখন নরওয়েতে মাস্টার্স করছেন। আসছে জুনে ফাইনাল পরীক্ষা। ছেলে ইউল্যাব থেকে অনার্স শেষ করে একটা এডুকেশনাল কনসালটেশন ফার্মে আছে। মানে সন্তানদের একা হাতে ঠিক পথেই রেখেছেন সুরভী।
আরও পড়ুন: ইস্টবেঙ্গলে মুন্নার রূপকথা আজও অমলিন
না, একা হাতে নয়, এখানেও স্বামী মুন্নার ছায়া খুঁজে পান সুরভী—‘বাবা হিসেবে তার সঙ্গে অন্য কারও তুলনা করা যায় না। দিনশেষে সব বাবা বাবাই। সে আসলে তার বাচ্চাদের অনেক ভালোবাসত। হয়তো এখনও বাসে। আমার বাচ্চারা হয়তো তাকে এখনও মিস করে, আমিও করি। এত বছর হয়ে গেল ও চলে গেছে, কিন্তু প্রতিমুহূর্ত তাকে স্মরণ করি। আজ যদি সে বেঁচে থাকত তাহলে এটা হতো বা ওটা হতো। সন্তানরা ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে, ও থাকলে সন্তানরা আরও ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারত। আল্লাহর কাছে তাও কোটি কোটি শুকরিয়া, আমার বাচ্চাদের এতদূর এনেছেন। হয়তো মুন্না জানতে পারলে খুশি হবে, তার বাচ্চারা একটা ভালো পর্যায়ে গেছে।’
হয়তো জীবন নদীর ওপারে থেকে মোনেম মুন্না দেখছেন তার রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ কাজটা ঠিকঠাক মতোই শেষ করেছেন সুরভী। হাল ছাড়েননি, বরং কণ্ঠ ছেড়েছেন জোরে!
সংসার করেছেন মাত্র ১০ বছর। এরপরই মুন্নার দুই কিডনি অকেজো হয়ে যায়। বড়বোন কিডনি দিলেন। ভারতে চিকিৎসা করে সুস্থ হয়েও ফিরলেন। কিন্তু প্রিয় ক্লাব আবাহনীর ম্যানেজার হয়ে নানা মানসিক কষ্ট সইতে হয় তাকে। ফলোআপ চিকিৎসা ঠিকঠাক না হওয়াতে ফের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায়। তারপর তো চলেই গেলেন, চিরতরে।
আরও পড়ুন: ও বলত তার দুটো সংসার প্রথমে ক্লাব, পরেরটা আমাকে নিয়ে সাজানো
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের সুরভী বলতে শুরু করলেন, ‘এই বাসাটা না কেনা হলে আসলে ঢাকায় ভাড়াবাসায় থেকে বাচ্চাদের লেখাপড়া করানোর মতো অবস্থা ছিল না। বাসাটা থাকাতে বাচ্চাদের পড়ালেখা করাতে পেরেছি এবং এতদূর আনতে পেরেছি। নইলে হয়তো আমাকে বন্দরে ফিরে যেতে হতো!’
‘এই বাসাটা না কেনা হলে আসলে ঢাকায় ভাড়াবাসায় থেকে বাচ্চাদের লেখাপড়া করানোর মতো অবস্থা ছিল না। বাসাটা থাকাতে বাচ্চাদের পড়ালেখা করাতে পেরেছি এবং এতদূর আনতে পেরেছি। নইলে হয়তো আমাকে বন্দরে ফিরে যেতে হতো!’
জীবনের অধ্যায়েও বড্ড তাড়াহুড়ো করেছেন মোমেন মুন্না। মাত্র ৩৮। এই বয়সেই কিনা চলে গেলেন অন্যলোকে। যে দিনটাতে ঘর বেঁধেছিলেন, সেই বিয়েবার্ষিকীর দিনেই কিনা হারালেন প্রিয় মানুষটিকে। মুন্নার স্মৃতিটা অ্যালবামের পাতায় ভাসে এবং স্মৃতিতে ফিরে আসেন সুরভীর রূপকথার নায়ক। এখনও মধ্যদুপুরে যখন একা হয়ে যান সুরভী, তখন পুরোনো সেই অ্যালবামের পাতায় চোখ রাখেন। এনালগ যুগের সেই ফিল্মের ছবিগুলোও ইদানিং কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। স্মৃতির বয়স বাড়ছে। কিন্তু চোখের নোনাজলের ঝাপটা তো আর কমে না!
এখনও মুন্নাকে, দানিয়া-আজমানের বাবাকে খুঁজে বেড়ান সুরভী। ছোট ঘরের এখানে সেখানে! আহা যদি তিনি আবার ফিরে আসতেন! সন্তানরা তো বড় হয়ে গেছে; সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এই সুযোগে এমন মধ্যদুপুরে দুজন ফের মুখর হতেন সুখ-দুঃখের আড্ডায়...