কৃশানু মজুমদার
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১০:৪৫ এএম
আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২০:১৪ পিএম
‘আমাকে ওস্তাদ বলে ডাকত। একবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আমাকে নিচে বসে থাকতে দেখে ভিআইপি বক্সে নিয়ে গিয়েছিল মুন্না।’ স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন সাবেক ফুটবলার-কোচ সৈয়দ নইমুদ্দিন। এপারের মতো ওপারেও সমান পরিচিত তিনি। বাংলাদেশের কিংবদন্তি ফুটবলার মোনেম মুন্না যখন ইস্টবেঙ্গলে, সেই সময়ে লাল-হলুদের কোচ ছিলেন নইম। গুরুর প্রতি শিষ্যের শ্রদ্ধা, সমীহ, ভালোবাসা ফুটে ওঠে ‘দ্রোণাচার্য’র এই স্মৃতি রোমন্থনে। ইস্টবেঙ্গলের শঙ্কর মালি ‘বাংলাদেশের গর্ব’ মুন্না সম্পর্কে বলতেন, ‘মানুষের বেশে স্বয়ং ঈশ্বর নেমে এসেছেন ধরিত্রীতে।’
ভারতের সাবেক ফুটবলার বিকাশ পাঁজি স্মৃতির পাতা উল্টে বলছিলেন, ‘সেই সময়ে আমাদের ইস্টবেঙ্গলে একাধিক লিডার ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল মুন্না।’ এ দেশের আরেক ডাকাবুকো সাবেক ফুটবলার কৃষ্ণেন্দু রায় বলছিলেন, ‘সময়ের থেকে অনেক এগিয়েছিল মুন্না।’
টুকরো টুকরো কত ছবি, আঁকা হয়ে যায় এ জীবনে কিছু যায় হারিয়ে, কিছু সব ছাড়িয়ে, বারে বারে ফিরে আসে মনে। মুন্না সম্পর্কে ছোট ছোট গল্পগুলো শুনে গানের এই লাইনগুলোই প্রথমে মনে এলো। খণ্ড খণ্ড এই ছবিগুলো দিয়েই মালা গাঁথা যায়। যে মালার নাম মোনেম মুন্না। পরিচয় পাওয়া যায় এক রক্ত-মাংসের মহাজীবনের। আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে বঙ্গবন্ধুর দেশ থেকে এ দেশের সবুজ মাঠে এসে যে রূপকথা লিখে গিয়েছিলেন মুন্না, তা আজও অমলিন। স্মৃতিমেদুর বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর কাছে আড্ডা-তর্কের মসলা। মোনেম মুন্না এক আবেগের নাম। তাকে নিয়ে কত গল্প, কত মিথ। সৈয়দ নইমুদ্দিন মুন্নার নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলেন, ‘হোয়াট আ গ্রেট প্লেয়ার। আমার মিডফিল্ডের ব্রিগেডিয়ার।’ শোনা যায়, এক ইস্টবেঙ্গল-মোহামেডান ম্যাচের আগে নইম-সাহেব মুন্নার ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রথম একাদশ তৈরি করার। নইমের এতটাই আস্থা ছিল শিষ্যের ওপর।
মাত্র নব্বই মিনিটের একটা খেলা এক ফুটবলারকে ভিন দেশের নতুন ক্লাবে নায়ক বানিয়ে দিয়েছিল। তিনি যেন সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। সেই সময়ের অন্যতম সেরা ক্রাউডপুলার। এই উপমহাদেশে ক্রিকেট চিরকালই সেরা বক্স অফিস। আর ক্রিকেটাররা গণহিস্টিরিয়া তৈরি করার পক্ষে যথেষ্ট। এ রকম এক বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থার মধ্যেও ভিন দেশের এক ক্রিকেট অধিনায়কের মতোই সমান জনপ্রিয় প্রতিবেশী দেশের এক বাঙালি ফুটবলার—বাঙালি হিসেবে তা ভাবতেও গর্ববোধ হয়। রক্তের গতি বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের বর্ষীয়ান সাংবাদিক দিলু খন্দকর দারুণ এক গল্প তুলে ধরেন মুন্নাকে নিয়ে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘কলকাতা লিগে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের ম্যাচ। তার আগে ইস্টবেঙ্গলের এক দ্রুতগতির উইংগার দরকার ছিল। বাংলাদেশ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সতেরো বছরের গোলাম গাউসকে কলকাতা নিয়ে গিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গল কর্তা। দুর্দান্ত ফুটবলার ছিল গোলাম। আমি আর এক চিত্রসাংবাদিক বনগাঁ দিয়ে কলকাতা যাওয়ার সময়ে বুঝতে পেরেছিলাম মুন্নার জনপ্রিয়তা। আমি দৈনিক ইত্তেফাক কাগজের সাংবাদিক এবং মুন্নার বন্ধু জেনে ইমিগ্রেশন অফিসার বলে ওঠেন, আপনি মোনেম মুন্নার দেশের সাংবাদিক? মুন্নার বন্ধু এবং সাংবাদিক পরিচয় কাজ সহজ করে দিয়েছিল। কলকাতায় পৌঁছনোর পরে দেখেছিলাম ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে মুন্না। ওর অনুশীলন দেখতে ভিড় করছে দশ হাজারের কাছাকাছি সমর্থক। ওর নামে জয়ধ্বনি উঠছে। গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো ব্যাপার।’
আরও পড়ুন: শুধু ভাবতাম, মাঠে মুন্নাভাই আছেন আর চিন্তা কিসের?
সাবেক ফুটবলার বিকাশ পাঁজি আবার ফুটবলার মোনেম মুন্নাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের দেশের সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের মতোই খেলার ধরন ছিল মুন্নার। গোটা মাঠ জুড়ে খেলত। চোখে লেগে থাকত সেই খেলা। সেই সময়ে আইএফএ’র (বাংলার ফুটবল নিয়ামক সংস্থা) নিয়ম অনুযায়ী অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলার খেলাতে হতো। অমিত দাসকে দারুণ গাইড করেছিল মুন্না। ওর গাইডেন্স পেয়ে অমিত এতটাই উজ্জীবিত ফুটবল খেলতে শুরু করে দেয় যে ওকে বসানোই কঠিন হয়ে পড়ছিল। কিন্তু এ রকম প্রাণবন্ত একজন ফুটবলারের চলে যাওয়ার খবর যেদিন পেলাম, ভেঙে পড়েছিলাম আমরা। মর্মে আঘাত করেছিল।’
আরও পড়ুন: ও বলত তার দুটো সংসার প্রথমে ক্লাব, পরেরটা আমাকে নিয়ে সাজানো
ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে মুন্নার সেরা ম্যাচ বাছতে বসে দারুণ এক সমস্যায় পড়ে গেলেন কৃষ্ণেন্দু রায়। ডাকাবুকো এই রাইট ব্যাক বললেন, ‘মুন্নাভাই কোন ম্যাচটা খারাপ খেলেছিলেন, সেটাই তো আমি মনে করতে পারি না।’ একজন ফুটবলার এতটাই ছাপ ফেলেছিলেন যে সাফ গেমসের আগে কলকাতার বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল—‘শাহবাজ, ঊষা ও মুন্নার গেমস আজ শুরু।’ ১৯৯৫ সালের সাফ গেমসের আসর বসেছিল এখনকার চেন্নাইয়ে।
ইদানীংকালে বাংলাদেশ, কলকাতার ফুটবলে বিদেশির ভিড়। প্রচুর অর্থ রোজগারের জন্যই বিদেশ থেকে তারা চলে আসছেন এখানে। উঁচুদরের ফুটবল সবাই যে তুলে ধরতে পারছেন এমনটা নয়। নিজের দেশের ফুটবলের সংস্কৃতি তারা তুলে ধরছেন এমনটা নয়। কিন্তু সেই ১৯৯১-৯৩ সালে মুন্না কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিলেন। তার ফুটবল তুলে ধরেছিল বাংলাদেশের সার্বিক ফুটবলের চালচিত্রকে। মুন্না সে কথা গোপন করেননি।
ইস্টবেঙ্গল ক্লাব তাঁবুতে রয়েছে মোনেম মুন্নার ছবি। একবার লিগ খেতাব জয়ের পরে এক মহিলা ভক্ত এসে মুন্নার ঘামে ভেজা জার্সি ধরে টানাটানি করেছিলেন সই সংগ্রহের জন্য। জয়ের আনন্দের মধ্যেও ওই সই-শিকারির এহেন আচরণে রেগে গিয়েছিলেন মুন্না। সেই মহিলা ভক্ত কেবলমাত্র মুন্নার সই নেওয়ার জন্য বহুদূর থেকে ছুটে এসেছিলেন। এমনই ছিল বাংলাদেশের তারকা ফুটবলারের আকর্ষণ। এমন সব গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দুই বাংলার ধুলোমাখা মাঠে।
আরও পড়ুন: যে ভোরে শেষবার আবাহনী প্রাঙ্গণে মুন্না!
বাংলাদেশে তাকে নিয়ে একটা গল্প লোকগাথার পর্যায়ে পৌঁছেছে। মুন্না ছিলেন আবাহনী অন্তপ্রাণ। আবাহনীই তার যৌবনের তপোবন, বার্ধক্যের বারাণসী। সেই আবাহনী আর তার ভালোবাসা প্রসঙ্গে প্রচলিত মিথ, মুন্নার রক্তের গ্রুপ হয়তো এ। এ ফর আবাহনী।
পদ্মাপারের ফুটবল-ঈশ্বর মুন্না এ কথা বললেও অত্যুক্তিকরা হবে না। কিন্তু এমন অসামান্য এক প্রতিভা এত দ্রুত পৃথিবী ছেড়ে হারিয়ে যাবেন তারাদের দেশে, এ কথা কেউই মেনে নিতে পারবেন না। না ওপার, না এপার।
কৃশানু মজুমদার : কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক