× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যে ভোরে শেষবার আবাহনী প্রাঙ্গণে মুন্না!

এম. এম. কায়সার

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:০৯ পিএম

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:৪৪ পিএম

যে ভোরে শেষবার আবাহনী প্রাঙ্গণে মুন্না!

[২০০৫-এর ১২ ফেব্রুয়ারি ভোরে বাংলাদেশ ফুটবল কিংবদন্তি মোনেম মুন্না মারা যান। দীর্ঘ সময় কিডনি রোগে ভুগে মৃত্যুর কাছে হার মানেন। মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন এই ফুটবল গ্রেট। মুন্নার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রিপোর্টারের পুরোনো ডায়েরি ঘেঁটে বের করে সেদিনের এই লেখা (ঈষৎ পরিবর্তিত)] 

ফেব্রুয়ারির এই সময়টায় বাতাসে বসন্তের আগমনী গান। ফাগুনকে স্বাগত জানাতে চারধারের সবকিছুতেই বদলে যাওয়ার আনন্দধ্বনির মুহূর্তকাল এটি। অথচ সকালের চারধার কী অদ্ভুত এক নীরব চাহনিতে ম্রিয়মাণ! এই যে এখানে এত মানুষের হাঁটাচলা, একে অন্যের দিকে চাওয়া চোখাচোখি; যার বেশিরভাগই শব্দহীন কিংবা অস্ফুট আধো বলা। শূন্যতায় ভরা সেই দৃষ্টিতে কী যে বিপুল আর্তনাদ! চোখের ছায়ায় অসহায়ত্ব। অশ্রুবিন্দু! মানুষ যার নাম দিয়েছে বেদনা! খুব প্রিয় কিছুকে আকস্মিক হারিয়ে ফেলার কষ্টের মোচড় উপস্থিত সবার অবয়বে, অলিন্দের রক্তনালি, স্নায়ুতে!

মুন্নার বিজয়ের সঙ্গী হয়ে ক্লাব প্রাঙ্গণে আগে আবাহনীর গর্বের আকাশি পতাকা পতপত করে উড়ত। আর এদিন সকালবেলা থেকে চারধারে এত বাতাস অথচ স্ট্যান্ডের পতাকা লেপ্টে রইল অর্ধনমিত হয়ে কুর্নিশের ভঙিতে, বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে; ওরও বুঝি মন খারাপ!

আরও পড়ুন: ইস্টবেঙ্গলে মুন্নার রূপকথা আজও অমলিন

ক্লাবের প্রবেশপথের সামনে বটগাছের পাতা আগেও ঝরত। ১২ ফেব্রুয়ারি সকালেও ঝরল, কিন্তু সেই ঝরে পড়ায় স্পষ্টত শোনা গেল কান্নার সুর! সেই রাগিণীতে খুব প্রিয় কিছুকে বিদায়ের আয়োজন যেন। বেলা বাড়ছে কিন্তু আবাহনী মাঠের সবুজ ঘাস তখনও শিশির কণায় সিক্ত; সবকিছুই এখানে আজ কাঁদছে!

প্রিয় কিছু হারানোর বেদনায় সকাল-দুপুরের পুরো সময় ফেব্রুয়ারির এই রৌদ্রোজ্জ্বল নীল আকাশকে আবাহনী প্রাঙ্গণ থেকে আরও নীলাভ দেখাল! ইট-পাথরÑ এমনকি দেয়ালের সঙ্গে লেপ্টে থাকা নাম না জানা উদ্ভিদমূল; সবকিছু, চারপাশের উপস্থিতির সবকিছুর সবটুকু জুড়েই অসহনীয় এক ব্যথার কষ্ট, চাপা কান্নার ধমক। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হয়ে গায়ে লেপ্টে থাকল ফাগুনের পোহালি রোদ। 

ক্লাব প্রাঙ্গণের গা ঘেঁষে থাকা কাঁঠালি চাঁপার প্রায় পাতাশূন্য গাছের পাশ থেকে আগে হেঁটে গেলে সুতীব্র একটা ঘ্রাণ কাছে টানত। এদিন সেখানে মিলল লোবানের গন্ধ। শ্বাসনালি ধাক্কা খেল আগরবাতির ধোঁয়ায়। নিবিষ্ট মনে মাইকে কুরআন তিলাওয়াত চলছে। 

সবকিছুই জানিয়ে দিল এখানে প্রিয় কিছুকে চিরবিদায়ের আয়োজন চলছে। আজ এখানে মৃত্যু এসেছিল! 

ক্লাব প্রাঙ্গণে মোনেম মুন্না এসেছেন আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে, খাটিয়ায় শুয়ে। এবং কী আশ্চর্য, আগের মতোই সেই ভক্ত-সমর্থকদের কাঁধে চড়েই আরেকবার তার প্রিয় আবাহনী ক্লাব চত্বরে এলেন মুন্না। আগে আসতেন বিজয়ের আনন্দে, দু’হাত উঁচিয়ে। এবার এলেন বুকে হাত বেঁধে, কফিনে শুয়ে। আগেও ফুলের মালা থাকত, গলায়। এই যাত্রায়ও ফুল প্রচুর পেলেন; কফিনের ডালায়!

আরও পড়ুন: ও বলত তার দুটো সংসার প্রথমে ক্লাব, পরেরটা আমাকে নিয়ে সাজানো

মৃত্যুর সঙ্গে মুন্নার যন্ত্রণার লড়াই মুখোমুখি কায়দায় শুরু হয়েছিল মূলত ২০০০ সাল থেকেই। দুটো কিডনিই তার অকেজো হয়ে যায় সেই বছর। বোনের কাছ থেকে ধার করা কিডনি নিয়ে সেই সময়টায় মৃত্যুকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মুন্না। ট্রান্সপ্লান্ট করা কিডনি রোগীকে মানতে হয় প্রতি পদক্ষেপে অহরহ নিয়ম-কানুন। নিয়মিত পথ্যের ওপরই টিকে থাকে সে জীবন। এমনকি একরত্তি ধুলোও তখন তার দৈত্যাকার শত্রু। ভেতরের শরীর বাইরে থেকে পাওয়া কাউকে স্বস্তির জায়গা দিতে নারাজ। আর চিরজীবন আপসহীন মুন্না কেন মানবেন এই সমঝোতার সূত্র?

মানেনওনি! 

লড়ে গেছেন পাঁচ বছর। সেই সুযোগে ওত পেতে থাকা শত্রু ধীরলয়ে চড়ে বসে। ভাইরাস জ্বর নিয়ে হাসপাতালে বিছানা নেন। আর উঠতে পারেননি। টানা আঠারো দিন কাটল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষাংশে মন খারাপ করা এক সকালে হাসপাতাল ছাড়লেন কফিনে শুয়ে। 

সকালে ঘুম ভাঙলে অনেকের আগে মুন্না চলে আসতেন আবাহনী ক্লাবে। কী আশ্চর্য, এদিনও তাই এলেন। তবে ঘুম যে আর ভাঙল না! ক্লাবের নিচতলায় পাঁচ নম্বর রুমে জীবনের রঙিন সময় কেটেছে তার। সেই রুমের পশ্চিম কর্নারের বিছানা এদিনও বেশ পরিপাটি। কিন্তু মুন্নার বিছানা যে এখন অন্য কোথাও!

আরও পড়ুন: শুধু ভাবতাম, মাঠে মুন্নাভাই আছেন আর চিন্তা কিসের?

যে মাঠে ফুটবলার মুন্না নিয়মিত অনুশীলন করতেন, যে মাঠে ম্যানেজার মুন্না কৌশল নিয়ে আলাপ করতেন, আড্ডা দিতেন—সেই মাঠে এদিন সবাই ছিল, ফুটবলার, কর্মকর্তা, কোচ, ভক্ত-সমর্থক-অনুরাগী সবাই দাঁড়িয়ে-বসে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আর মুন্না কফিনে শুয়ে! নাকে তুলো।

মাঠের যে কোনায় মুন্নার অনুশীলনের সময় আশপাশের দেয়ালে ভক্তরা ভিড় করত, ঠিক সেখানেই তার জানাজা হলো। যখন খেলতেন, আনন্দে মন্থিত রাখতেন সবাইকে। যখন ক্লাবের ফুটবল কর্তা হলেন, আপসহীন দৃঢ়তায় বাঁধলেন সবাইকে। আর যেদিন বিদায় নিলেনকাউকে ডাকলেনও না! ভোরে পাখি-ডাকা বেলায় বিদায়। কার ওপর যেন আজন্ম সুতীব্র একটা অভিমান ছিল মুন্নার?

ফুটবলে তারকা খ্যাতির স্টিকার মূলত গোলকিপার, মিডফিল্ডার এবং স্ট্রাইকারদের গায়েই বেশি দেখা যায়। কিন্তু ডিফেন্ডার মুন্না অনেক ট্রফি জয়ের সঙ্গে ফুটবলের গ্ল্যামারও ঠিকই জিতেন। বহু ম্যাচ জিতেছেন। চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। কিন্তু মাত্র ৩৮-এ এসে জীবনের ম্যাচে হার! ফাগুন হাওয়ার দিনে এমন মৃত্যু কেন আসবে? বিয়েবার্ষিকীর দিনেইবা কেন সুরভী ভাবিকে কাঁদতে হবে? 

বিকেলে বেরিয়ে আসার সময় দেখলাম ছায়াঘেরা আবাহনী ক্লাবের আমগাছ হলুদ মুকুলে ছেয়ে গেছে। বুঝলাম মৃত্যু আসলে কোনো কিছুর শেষ নয়, শুরু মাত্র!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা