× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ও বলত তার দুটো সংসার প্রথমে ক্লাব, পরেরটা আমাকে নিয়ে সাজানো

আপন তারিক

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:৩৮ পিএম

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:০৯ পিএম

ও বলত তার দুটো সংসার প্রথমে ক্লাব, পরেরটা আমাকে নিয়ে সাজানো

ক্ষণজন্মা তিনি। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোনেম মুন্না চলে গেছেন অন্যলোকে। তারপরই লড়াই শুরু সুরভী মোনেমের। কন্যা দানিয়া আর ছেলে আজমানকে নিয়ে সেই লড়াইয়ে জয়ী তিনি। তারপরও মনের কোণে আক্ষেপ—আহা, যার সঙ্গে ঘর বেঁধেছিলাম সেই মুন্না যদি আজ বেঁচে থাকত। বিয়েবার্ষিকীর দিনেই হারিয়েছেন প্রিয় মানুষটিকে। জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার, আবাহনীর মহাতারকা মোনেম মুন্নার স্ত্রী স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে। সুরভীর মুখোমুখি হয়েছেন আপন তারিক। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব আজ।

প্রশ্ন : আমরা জানি মোনেম মুন্না মানেই আপনার জন্য অশ্রুসজল স্মৃতি। কিন্তু আমরা আপনার চোখের জল না, আনন্দের গর্বের হাসি দেখতে চাই; মুন্নাকে নিয়ে তেমন কিছু শুনতে চাই; যা আপনাকে, আপনার পরিবারকে, আমাদের সবাইকে এবং নতুন প্রজন্মকেও বলবে আমাদের একজন আইকন ছিল।

সুরভী মোনেম : নতুন প্রজন্ম আসলে মোনেম মুন্নাকে চেনে না। কয়েক দিন আগে ধামরাইতে গিয়েছিলাম, সেখানে আমার খালু কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—কেউ চিনে না। এভাবে যদি আমাদের সব ফুটবলার হারিয়ে যায় সেটা ভালো না। মুন্নাকে চিনে না, অন্যদেরও চিনতে পারবে না হয়তো। এটা তো মিডিয়া বা আপনাদের মাধ্যমে জানাতে হবে। আমি যেমন ধানমন্ডির ৮ নম্বরে মুন্নার নামে একটি ব্রিজ করেছিলাম। কিন্তু এখন ওটার কোনো চিহ্ন নেই। সেখানে যদি মুন্নার ছোট পরিচয় দিয়ে ম্যুরাল বানানো হয়, তাহলে আসা-যাওয়ার পথে অন্তত ওই জায়গায় নতুন প্রজন্ম বা বয়স্কÑ সব ধরনের মানুষের চলাচল। তো সেটি পড়লেও মানুষ ওর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবে। মুন্না কে ছিলেন, কী করেছিলেন, ফুটবলের ভালোবাসায় সে যে কত ত্যাগ স্বীকার করেছে—সব জানতে পারবে। কিন্তু এটা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনোভাবেই সফল হতে পারছি না। 

আরও পড়ুন: শুধু ভাবতাম, মাঠে মুন্নাভাই আছেন আর চিন্তা কিসের?

শেষবার আমাদের মাননীয় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের কাছে গিয়েছিলাম। ওনার কাছে একটা অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়েছি, তিনি বলেছেন বিষয়টি দেখবেন। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। আমিও সেই আশায় আছি।

প্রশ্ন : আমরা আমাদের আগের প্রজন্ম, আপনি যে নতুন প্রজন্মের কথা বলছিলেন। তাদের অনেকেই মুন্নাকে চিনে না, নামটাও জানে না। কিন্তু আমরা আমাদের আগের প্রজন্ম ক্যারিশম্যাটিক মুন্নার ক্যারিয়ারে মুগ্ধ এবং সেই মুগ্ধতা এখনও ছড়াচ্ছে। আপনি তো মুন্নার সঙ্গে সংসার করেছেন। আমরা তো জানি—মাঠের মুন্না কেমন অপ্রতিরোধ্য ছিলেন, গ্ল্যামারার্স ফুটবলার ছিলেন, দেশকে কী এনে দিয়েছেন। আসলে জানতে চাচ্ছি, ব্যক্তিজীবনের মুন্নার সম্পর্কে...

উত্তর : মুন্না আসলে অনেক বড় এবং ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে আমার সংসার জীবন বারো বছরের। এই সময়ে তাকে যতটুকু কাছে পেয়েছি, আসলে অর্ধেক জীবন তার ফুটবলের সঙ্গে ছিল, সংসারে সেভাবে সময় দিতে পারেননি, তারপরও তিনি যথেষ্ট ভালো এবং বড় মনের মানুষ ছিলেন। ব্যস্ত থাকলেও সংসার এবং বাচ্চাদের প্রতি তার কোনো ধরনের অবহেলা ছিল না। যতটুকু পেরেছেন তিনি আমাদের জন্য করে গেছেন। 

প্রশ্ন : আমরা জানি তিনি দুই সন্তানের জনক। তো বাবা হিসেবে তিনি কেমন ছিলেনÑ যেহেতু খুব বেশি সময় সন্তানদের পাননি। তো সেই সময়ের আবেগ-অনুভূতিটা যদি বলতেন...

উত্তর : বাবা হিসেবে তার সঙ্গে অন্য কারও তুলনা করা যায় না। দিনশেষে সব বাবা বাবাই। সে আসলে তার বাচ্চাদের অনেক ভালোবাসত। হয়তো এখনও বাসে। আমার ছেলেমেয়ে... (কান্না)

প্রশ্ন : শুরুতে বলেছিলাম, আমরা মোনেম মুন্নার অশ্রুসজল স্মৃতি তুলতে চাই না। তিনি ৩৮ বছরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন, যিনি এত দ্রুত প্রিয় মানুষ, বন্ধুবান্ধব পরিবার ছেড়ে পরপারে চলে যান। তার গল্প শুনতে গেলে চোখের বাঁধ ধরে রাখা কঠিন। আমরা মোনেম মুন্নার বাড়িতে এসে সেটিই দেখছি। আসলে আপনাকে কাঁদাতে আসিনি। মোনেম  মুন্না আপনার জন্য অশ্রুসজল গল্প। বারো তারিখ ওনার মৃত্যু দিবস, ওইদিন আপনাদের বিবাহবার্ষিকী। মোনেম  মুন্না আমাদের কাছে আসলে একটা দুঃখগাথার নাম হয়ে গেছেন। ফুটবলে তার অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। সেই মানুষটি হারিয়ে গেছেন। তার কথায় আমাদের সবার আসলে আবেগ ধরে রাখা কঠিন। তো বাবা হিসেবে বলছিলেন...

উত্তর : আমার বাচ্চারা হয়তো তাকে এখনও মিস করেন, আমিও করি। এত বছর হয়ে গেল ও চলে গেছে, কিন্তু প্রতিমুহূর্ত তাকে স্মরণ করি। আজকে যদি তিনি বেঁচে থাকতেন তাহলে এটা হতো বা ওটা হতো। সন্তানরা ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে, ও থাকলে সন্তানরা আরও ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারত। আল্লাহর কাছে তাও কোটি কোটি শুকরিয়া, আমার বাচ্চাদের এতদূর এনেছেন। হয়তো মুন্না জানতে পারলে খুশি হবেন, তার বাচ্চারা একটা ভালো পর্যায়ে গেছে।

আরও পড়ুন: ইস্টবেঙ্গলে মুন্নার রূপকথা আজও অমলিন

প্রশ্ন : আামাদের চোখের ফ্রেমে বাঁধা যে ছবি, ছোট ছোট দুটি বাচ্চা। তারা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। আসলে কী করছেন ওরা...

উত্তর : আমার মেয়ে দানিয়া, ও এখন নরওয়েতে মাস্টার্স করছে। আসছে জুনে ওর ফাইনাল হবে। ছেলে ইউল্যাব থেকে অনার্স শেষ করে একটা এডুকেশনাল কনসালটেশন ফার্মে আছে—জিগাতলাতে। 

প্রশ্ন : ওরা তো নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর পেছনে অনেক গল্প আছে নিশ্চয়ই। আমরা জানি এতটা পথ আপনি একা লড়েছেন। আমরাও আক্ষেপে পুড়েছি। সেই একা লড়ে যাওয়ার গল্প অনেকবার শুনিয়েছেন। সংগ্রামটি অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার হতে পারে। মুন্নাভাইকে হারানোর পর সন্তানদের নিয়ে আপনার এতদূর আসার বন্ধুর পথ সম্পর্কে কিছু বলেন...

উত্তর : মুন্নাকে হারানোর সময় বাচ্চারা ছোট ছিল। আমার সঙ্গে আমার ফ্যামিলি ছিল, বাবা-মা-ভাই, ওদের থেকে সাপোর্ট পেয়েছি। শ্বশুরবাড়ি থেকেও অনেক সাপোর্ট পেয়েছি, বিশেষ করে দেবরের কথা বলতে হয়। আসলে তেমন বলার মতো কষ্ট করতে হয়নি। বাইরে জব করেছি ছয় বছর, তখন আমার মা বাচ্চাদের দেখাশোনা করেছেন। একা ছিলাম না কখনই, কেউ না কাউকে পাশে পেয়েছি। আল্লাহ তো সঙ্গে ছিলেনই। 

তবে কিছু কিছু বিষয় ছিল, যেমন ফিন্যান্সিয়াল বিষয়গুলো। বাচ্চাদের পড়াতে গিয়ে মাঝে মাঝে আটকে গেছি। কারও না কারও কাছে বলেছি। আল্লাহ সেটার সহায়তা করে দিয়েছেন। অনেকেই আড়ালে থেকে সহায়তা করেছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ওনাদের ঋণ শোধ দিতে পারব না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের একটা ফ্ল্যাট দিয়ে, সঞ্চয়পত্রের টাকা দিয়ে যে বড় সহযোগিতা করেছেন, তার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। 

প্রশ্ন : শুরুর দিকে আরেকটা কথা বলছিলেন, মোনেম  মুন্না বা এই ধরনের কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের নানাভাবে স্মরণ করা হয়। আমরা দেশের বাইরে গেলে বিদেশিদের মাঝে এটা দেখি, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন হয় না। আপনি যে বলছিলেন, ধানমন্ডি ৮ নম্বরের ব্রিজের কথা। তো আমরা কীভাবে মুন্নাকে ধরে রাখতে পারি...

উত্তর : মুন্নাকে ধারণ করতে মিডিয়ায় তো প্রচার হতেই হবে। শুধু মৃত্যুবার্ষিকী আসলেই তাকে সবাই স্মরণ করেন, এ ছাড়া ওভাবে স্মরণে রাখা হয় না। টিভিতে সেভাবে সাবেক ফুটবলারদের নিয়ে প্রোগ্রাম দেখি না। তবে অনেক জায়গায় বা প্রোগ্রামে তার স্ত্রী হিসেবে বা তার প্রতিনিধি হিসেবে আমি কথা বলি। সেখানে গেলে আমার ভালো লাগে তার কথা বলতে। ছেলেকেও মাঝে মাঝে নিয়ে যাই, সেও জানুক তার বাবা কী বা কে ছিলেন। ব্রিজের ব্যাপারটা আসলে জানি না। আমি যেভাবে চাচ্ছি সেভাবে হবে কি না জানি না। তবে আমি চাই নারায়ণগঞ্জে মুন্নার জন্য কিছু হোক। কেননা ওই অঞ্চলের মুখ উজ্জ্বল করেছে যেসব ফুটবলার, তাদের মাঝে মুন্নাও একজন। তাই নারায়ণগঞ্জে মুন্নার নামে হয় কোনো স্টেডিয়ামের নাম বা বন্দরে তার যে এলাকা সেখানে কোনো রাস্তার নাম যদি তার নামে করা হতো তাহলে বর্তমান প্রজন্ম জানতে পারবে মুন্না নামে একজন ফুটবলার ছিলেন।

আরও পড়ুন: যে ভোরে শেষবার আবাহনী প্রাঙ্গণে মুন্না!

প্রশ্ন : বাংলাদেশ পেরিয়ে যখন কলকাতায় যাই, তাদের ইস্টবেঙ্গল হল অব ফ্রেমে মুন্নাকে ধরে রেখেছে। আমাদের বাংলাদেশে সেটা হয়তো সেভাবে হয়নি। মুন্না ভাইয়ের সঙ্গে আপনার নিশ্চয় ফুটবল নিয়ে কথা হতো, গল্প হতো। তিনি কি ফুটবল নিয়ে কখনও স্বপ্নের কথা বলতেন...

উত্তর : মুন্না বাসায় আসলে খেলা নিয়ে কম কথাই বলতেন। আমি যেটা দেখেছি, ফুটবল খেলার প্রতি তার নিষ্ঠা। এমনও হয়েছে বিয়ের পর প্রথম ঈদ, ও সেদিনও প্র্যাকটিস করেছে। ও সব সময় ফুটবলকে সর্বোচ্চ দিতে চাইত। বিশেষ করে আবাহনী ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা সব সময় প্রকাশ করেছে। সে বলত তার দুইটা সংসার—ক্লাব প্রথমে, অপরটি আমাকে নিয়ে সাজানো। তবে ও বলত, ক্লাবের বিষয়ে যেন আমি মাথা না ঘামাই। তো খেলার প্রতি যে তার ভালোবাসা সেটি আমি দেখেছি। খেলা ছাড়া অন্য কোনো দিকে তার মনোযোগ ছিল না। খেলা না খেলে বা অন্য ব্যবসায় মনোযোগ দিত তাহলে হয়তো আমরা আরেকটু ভালো থাকতে পারতাম। খেলার জন্য এত করেছে বলেই সতেরো-আঠারো বছর পরও প্রত্যেকটা মানুষ তারা মুন্নার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলেনি বা শুনিনি। তার ব্যক্তিগত সম্পর্কে ভালো শুনেছি। খেলা সম্পর্কেও। এটাই আমার কাছে বড় প্রাপ্তি। যে মানুষটা মারা গেছে তাকে অন্তত মানুষ এভাবে স্মরণ করে। কেউ কখনও খারাপ কিছু বলে না। এটাই আমার জন্য তার দেওয়া গর্ব। ও আসলেই অনেক বড় এবং ভালো মনের মানুষ ছিল। 

(সাক্ষাৎকারের বাকি অংশ পড়ুন আগামীকাল খেলার পাতায়)

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা