পিছিয়ে থাকা ম্যাচে মেসির আর্জেন্টিনা যেভাবে জিতেছে, তা বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তনের একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ছবি: মার্কা
পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক ম্যাচের দৃশ্যপট বদলে দিতে পারেন লিওনেল মেসি, চলতি বিশ্বকাপে এই সত্যটা এখন প্রবাদের পর্যায়ে উন্নীত। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মিসরের বিপক্ষে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা ম্যাচে মেসির আর্জেন্টিনা যেভাবে জিতেছে, তা বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তনের একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এবার শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ হার না মানা মানসিকতার সুইজারল্যান্ড। ক্যানসাস সিটিতে শেষ আটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই দল। ম্যাচটি শুরু হবে রবিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়। এর ৪ ঘণ্টা আগে সেমিফাইনালে ওঠার যুদ্ধে নামবে হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড ও আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে। বিশ্বকাপের আশা বাঁচিয়ে রাখা ও গোল্ডেন বুটের জমজমাট লড়াই এই ম্যাচকে দাঁড় করিয়েছে একই বিন্দুতে। আজ শনিবার মিয়ামিতে বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে এই তাপ ছড়ানো ম্যাচটি।
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছেন ফরাসি স্পিড স্টার কিলিয়ান এমবাপে ও মেসি। দুজনই করেছেন ৮ গোল। তাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছেন হালান্ড ও কেইন। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির হালান্ডের ঝুলিতে ৭ গোল। আর কেইন পেয়েছেন ৬ গাল। এরই মধ্যে সেমিফাইনালে উঠে কমপক্ষে আরও একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ তৈরি করে ফেলেছেন এমবাপে। এখন সেই কাতারে জায়গা করে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ মেসি, কেইন ও হালান্ডের।
আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০১৪ ব্রাজিলের আসরে। এক যুগের দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আবারও দ্বৈরথে নামছে। সেবার নকআউট পর্বের ১১৮তম মিনিটে আঞ্জেল ডি মারিয়ার একমাত্র গোলে সুইসদের স্বপ্ন ভেঙে ফাইনালে উঠেছিল মেসির দল। মাত্র দুই মিনিটের জন্য ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়নি। সাও পাওলোর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের পর এবার সুইসদের সামনে প্রতিশোধ মিশন আর মেসিদের অভিযাত্রা শিরোপা স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার।
এদিকে একের পর এক কঠিন বাধা পেরিয়ে বেশ সতর্ক আর্জেন্টাইন শিবির। দলটির কোচ লিওনেল স্কালোনির ভাষায়, এবারের টুর্নামেন্টের ফেভারিট দলগুলোও অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা নিম্ন-র্যাঙ্কিংয়ের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হিমশিম খাচ্ছে। আমার মনে হয় এই বিশ্বকাপটি সবার জন্যই বেশ কঠিন হয়ে উঠছে। এখানে এককভাবে কোনো দলকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হচ্ছে না। ফ্রান্সকে শক্তিশালী মনে হয়েছিল কিন্তু প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। যোগ করেন, ‘স্পেনকেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে হয়েছে। বিশ্বকাপের আগে বড় দলগুলো যে ফর্ম দেখিয়েছিল, তা ধরে রাখতে পারেনি কেউই।’ কোচের মতোই কঠিন ম্যাচের কথাই বলেছেন মেসিও ‘আমাদের বেশ ভুগতে হয়েছে, তবে এটি তো বিশ্বকাপ। তবে আমাদের এই দলটি কখনোই হাল ছাড়ে না এবং শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যায়।’ কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে শিরোপা জেতার আগে ২০১৪ আসরে রানার্সআপ হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল মেসিদের।
ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেমি ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে সুইজারল্যান্ড। যে সম্ভাবনা ২০১৪ সালে কেড়ে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোর সেই লড়াইয়ের তিনজন খেলোয়াড় এখনও দুই দলে আছেনÑ মেসি এবং সুইজারল্যান্ডের অধিনায়ক গ্রানিত জাকা ও ডিফেন্ডার রিকার্ডো রদ্রিগেজ। ৩৩ বছর বয়সী সুইস মিডফিল্ডার জাকা মেসিকে প্রশংসায় ভাসিয়ে বলেন, ‘মেসির যুগে ফুটবল খেলতে পারাটা সৌভাগ্যের। তবে শুধু মেসি নন, বর্তমান আর্জেন্টিনা দলটাই অসাধারণ।’ মেসির প্রশংসা করলেও প্রতিশোধ নিতেও তারা মরিয়া। দলটির মিডফিল্ডার জিব্রিল সো বলেছেন, ‘আমরা এমন একটা দেশের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে চলেছি, যারা ট্রফি জেতার অন্যতম দাবিদার। খুব কঠিন ম্যাচ হতে চলেছে। কিন্তু আমাদের জেতার সুযোগ রয়েছে। আমরা বড় দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখি।’
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার রেকর্ড অবশ্য ঈর্ষণীয়। দুই দলের হেড-টু-হেড লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার পাঁচটি জয় আর বাকি দুটি ম্যাচ ড্র।
ইংল্যান্ড-নরওয়ে
এদিকে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর গত ছয় দশকে আসরটির ফাইনালেও উঠতে পারেনি ইংল্যান্ড। এবার কেইন-জুড বেলিংহাম জুটি সেই স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তাদের সামনে হালান্ড নামের এক গোল মেশিনের চ্যালেঞ্জ। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে হালান্ড ম্যাজিকে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে নরওয়ে। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে জোড়া গোল করে ব্রাজিলের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছেন হালান্ড। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হালান্ডের ম্যাচটি বিশেষভাবে আবেগের। কেননা এই নরওয়েজিয়ান তারকার জন্ম ইংল্যান্ডে। জন্মভূমি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা নিয়ে হালান্ড বলেন, ‘এটি আমার জন্য বিশেষ একটি ম্যাচ। আমি ক্লাব ফুটবলে ইংল্যান্ডে খেলি, ইংল্যান্ডেই আমার জন্ম। সেখানে আমার অনেক সতীর্থও আছে। তাই ম্যাচটি ভিন্ন রকমের অনুভূতি দেবে। আশা করছি এটি উপভোগ্য হবে।’
এদিকে নরওয়ের প্রতি সমীহ দেখালেও শিরোপার পথে এগিয়ের প্রত্যয় ইংলিশ অধিনায়ক কেইনের। তার কথায়, ম্যাচটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে আমরা ট্রফির আরও একধাপ কাছাকাছি পৌঁছতে চাই।’ প্রতিদ্বন্দ্বী হালান্ডের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত কেইন জানান, হালান্ডকে আটকানো যেকোনো দলের জন্যই অনেক কঠিন, তাই নরওয়ের বিপক্ষে আমাদের রক্ষণভাগকে সতর্ক থাকতে হবে।
এই দুই ইউরোপীয় দলের লড়াইয়ে পাল্লাটা ইংল্যান্ডের দিকেই ভারী। দুদলের ১২ দেখায় ইংল্যান্ড জিতেছে ৭ ম্যাচ, বিপরীতে নরওয়ের জয় ৩ ম্যাচ, বাকি দুটো ম্যাচ ড্র।