দলিল নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা
সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়, সাভার। ছবি: সংগৃহীত
সুপ্রিম কোর্টের রায়। আপিল বিভাগের নিষেধাজ্ঞা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সতর্কবার্তা। এসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাভারের আমিন বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে জমি কেনাবেচা।
বিলামালিয়া মৌজার একটি বিতর্কিত আবাসন প্রকল্পে বছরের পর বছর ধরে নিষিদ্ধ এলাকায় দলিল নিবন্ধনের যেন মহোৎসব চলেছে। এতে একদিকে যেমন আদালতের আদেশ লঙ্ঘিত হয়েছে, তেমনি সরকার বঞ্চিত হয়েছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে। চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য সামনে আসার পর এবার কঠোর অবস্থানে গেছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (নিবন্ধন) হাসান মাহমুদুল ইসলাম মঙ্গলবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। প্রাপ্ত নথিপত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিধি মোতাবেক দ্রুতই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তবে তদন্ত চলমান থাকায় এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সাভার সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন আবদুল্লাহর দায়িত্ব পালনকালে (২১ নভেম্বর ২০২১ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩) ওই মৌজায় প্রায় আট হাজার দলিল সম্পাদিত হয়। এর বড় একটি অংশই হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের হস্তান্তর নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে। বর্তমানে খিলগাঁওয়ে কর্মরত এই কর্মকর্তা অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নিবন্ধন বাণিজ্য
বিতর্কিত ওই আবাসন প্রকল্পটি নিয়ে উচ্চ আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই হয়েছে। রাজউকের মহাপরিকল্পনায় জলাধার ও বন্যাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত স্থানে এমন প্রকল্পের বৈধতা বাতিল করেন সুপ্রিম কোর্ট। এরপর বিলামালিয়া ও বলিয়ারপুর মৌজার নির্দিষ্ট সম্পত্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার পাশাপাশি রাজউক জনসতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও জারি করে। তার পরও ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে হাজারো দলিল নিবন্ধনের নেপথ্যে কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের সক্রিয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্ষতিপূরণের ফাঁদে নতুন ক্রেতা
নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দালাল চক্রের প্রলোভনে এখনও জমি কেনাবেচা থামেনি। ‘ভবিষ্যতে সরকার প্লট মালিকদের মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হবে’Ñ এমন চটকদার আশ্বাসে অনেকেই বিনিয়োগ করছেন। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুরনো ক্রেতারাই এখন চরম অনিশ্চয়তায় আছেন, নতুনরা আরও বড় ঝুঁকিতে পড়ছেন। আদালতের রায় অবজ্ঞা করে এসব দলিল সম্পাদনের বিষয়টি অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্তের দাবি রাখে।’
শ্রেণি পরিবর্তন ও রাজস্বহানি
ভূমি নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী জমির শ্রেণি ভিত্তিক সরকারি মূল্য নির্ধারিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, আবাসিক বা ‘বাড়ি’ শ্রেণির অতি মূল্যবান জমিকে দলিলে ‘সাইল’ বা নিচু জমি হিসেবে দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ নিবন্ধন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক ও স্থানীয় কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। তবে মাইকেল মহিউদ্দিনের দাবি, তার সময়ে জমির শ্রেণি বদল করে কোনো নিবন্ধন হয়নি।
ভ্যাট ও উৎস করের হদিস নেই
সবচেয়ে ভয়ংকর জালিয়াতি হয়েছে ভ্যাট ও উৎস করের ক্ষেত্রে। ২০১০ সালের রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন আইন অনুযায়ী, রাস্তা বা অবকাঠামো উন্নয়ন করে জমি বিক্রি করলে বিক্রেতাকে ডেভেলপার হিসেবে গণ্য করে কর আদায় বাধ্যতামূলক। কিন্তু শত শত দলিলে রাস্তার উল্লেখ থাকলেও কর আদায়ের কোনো প্রমাণ মেলেনি। ২০২৩ সালে সম্পাদিত বেশ কিছু দলিলে প্লটকে সাধারণ জমি দেখিয়ে প্রায় ১১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ রাজস্ব কর্মকর্তার মতে, এটি কর আইনেরও মারাত্মক লঙ্ঘন, যা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
প্লট বিক্রিতে সাধারণ জমির আড়াল
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, একই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ব্যবহার করে একটি জমিকে অসংখ্য ছোট অংশে ভাগ করে বিক্রি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই দিনে একাধিক ক্রেতার নামে দলিল হয়েছে, যা পুরোপুরি বাণিজ্যিক প্লট বিক্রির প্রতিচ্ছবি। অথচ কাগজে-কলমে একে সাধারণ জমি দেখিয়ে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
অস্বচ্ছতার বেড়াজালে দলিল লেখক ও শনাক্তকারী
দলিলের বৈধতা নিশ্চিতে মুসাবিদাকারক (দলিল লেখক) ও শনাক্তকারীর সই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বহু দলিলে তা অনুপস্থিত। কোথাও নাম থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে। নিবন্ধন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পরিচয় যাচাই ছাড়া এসব ভুয়া দলিলের কারণে ভবিষ্যতে মারাত্মক মালিকানা বিরোধ ও আইনি জটিলতা তৈরি হবে।
প্রশাসনের কঠোর নজরদারি
সার্বিক পরিস্থিতি আইন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ মহলের নজরে আসায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি সুসংগঠিত দুর্নীতির অংশ; তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. গাজী সিরাজুল ইসলামের মতে, এটি কেবল একটি আবাসন প্রকল্পের সমস্যা নয়; বরং আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সুরক্ষার মতো বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রশ্ন। এখন সবার নজর মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপের দিকে; কারণ এই তদন্তই প্রমাণ করবে, শত শত অবৈধ নিবন্ধনের পেছনে স্রেফ অবহেলা ছিল, নাকি বিশাল কোনো দুর্নীতির সিন্ডিকেট কাজ করেছে।