× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢিলেঢালা অভিযানে অপরাধীদের পোয়াবারো

কবির হোসেন

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬ ১১:৩১ এএম

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬ ১১:৩২ এএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বারবার ঘোষণা দিয়ে অভিযানে নামার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সরকার। বরং অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঢিলেঢালা এ অভিযান দুষ্কৃতকারীদের এতটাই অনুকূলে যে এতে তাদের ‘পোয়াবারো’ই হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কোথাও কোথাও সন্ত্রাসীদের আঘাতে রক্তাক্ত হচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। অভিযানে মাঠ পর্যায়ের অপরাধীরা ধরা পড়লেও পর্দার আড়ালে থাকছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়া গডফাদাররা। ফলে ক্রমাগত অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। এ জন্য দুর্বল অভিযান পরিচালনাকে দুষছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে সরকার তা বুঝতে পেরেছে। এটা খুবই ভালো ব্যাপার। তবে অভিযানগুলো যেভাবে পরিচালিত হওয়া দরকার, সেভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। তার মতে, কোনো অর্থবহ অভিযান হচ্ছে না। তিনি বলেন, শুধু মাঠ পর্যায়ের অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। পাশাপাশি এসব অপরাধীদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদেরকে সমানভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযান যে জোরালোভাবে হচ্ছে না সেই পরিস্থিতিটা অপরাধীরাও অনুধাবন করছে, যার ফলে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর আক্রমণ করছে, হামলা চালাচ্ছে। কখনও কখনও গণমাধ্যমকর্মীরাও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে অপরাধ তো নিয়ন্ত্রণ হচ্ছেই না, বরং বাড়ছে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য। 

জানা গেছে, গত ১ মে থেকে সারা দেশে মাদক, জুয়া ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সমন্বিত এবং কঠোর সাঁড়াশি অভিযান চলছে। অভিযানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করার কথা জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। ঠিক এক মাস পর গত শনিবার এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিগগিরই সারা দেশে অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে দলের ভেতরে যারা অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘যারা অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী, দাগি আসামি, যারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সেটা নির্মোহভাবে করা হচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে শিগগিরই।’ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাকে অন্তত দুবার প্রধানমন্ত্রীর তাগিদের মুখে পড়তে হয়েছে বলেও সভায় জানান তিনি। 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরাধবিরোধী অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলা ও বাধার মুখে পড়েছেন র‍্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। ৫ মে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর (বোয়ালা খাল) এলাকায় মাদকবিরোধী তথ্য সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাবের তিন সদস্য গুরুতর আহত হন। একই সময়ে রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকায় আসামি ধরতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় ওসিসহ পুলিশের সাত সদস্য আহত হন ও আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ১১ মে বিকালের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে রতনপুর ইউনিয়নের খাগাতোয়া গ্রামে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় একদল দুর্বৃত্তের অতর্কিত হামলায় র‍্যাবের তিন সদস্য আহত হন। তাদের চার ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ও অতিরিক্ত র‍্যাব সদস্যদের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।

এর আগে জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানকালে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন র‍্যাব সদস্যরা। এ সময় গুলি ও হামলায় র‍্যাব-৭-এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুল মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন ও আরও কয়েকজন সদস্য আহত হন। পরবর্তীতে গভীর রাতে র‍্যাব ও পুলিশের ক্যাম্পে বুলডোজার দিয়ে হামলা-ভাঙচুর চালানো হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে যৌথ অভিযান চালানো হয়। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই জঙ্গল সলিমপুরে গভীর রাতে বুলডোজার দিয়ে র‍্যাব ক্যাম্পের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। ২৪ মে গভীর রাতে র‍্যাবের একটি ক্যাম্পে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয় এবং বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছতে না পারেন, সে জন্য অন্তত তিনটি স্থানে রাস্তা ও কালভার্ট কেটে ফেলা হয়। এ ছাড়া ২২ মে সাভারের পশ্চিম রাজাশন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহকালে দুটি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলের সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে এক মাদক কারবারি ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করে পুলিশ। আহতরা হলেনÑ বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল দেশ টিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তাইফুর রহমান, ক্যামেরাপারসন কাইয়ুম, চালক জয়নাল ও এসএ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন।

এদিকে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সরকারের ১০০ দিনে অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে মোট ৬০৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই ও ৯০টি ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া চুরির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২১৪টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ৩ হাজার ৪৯৬টি। আলোচিত দুই মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন ও ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৯ থেকে ৮০টি, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ৩১ থেকে ৪২ জন, গণপিটুনিতে আহত হয়েছে ৭০ থেকে ১২৫ জন, কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১৪ থেকে ১৮ জন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনে আহত হয়েছে ৫ জন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে ৭ জন ও দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে তিনটি। সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ক্রমবর্ধমান ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। এ ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের অব্যাহত তৎপরতার ক্ষেত্রে ঢাকায় সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোর। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা লক্ষণীয়। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও কার্যকরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। 

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নাজুক ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ীÑ খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাট-অরাজকতার ঘটনা অব্যাহত ছিল। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অপরাধের ঘটনা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে। গত ১ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত এক মাসে সারা দেশে ৫১ হাজার ৩০২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে মামলা ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ৩৬ হাজার ৮০৪ জন ও চলমান বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪ হাজার ৪৯৮ জন। এ সময় বিভিন্ন অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। 

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ইন্তেখাব চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত আছে। তারা গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছেন। কিছু অভিযানে বাহিনীর সদস্যরা আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তাতে তারা দুর্বল হননি বরং তাদের কাজের পরিধি আরও বাড়িয়েছেন। গুরুতর আহত বাহিনীর সদস্যরা হাসপাতাল থেকে ফিরেই আবার অভিযানে যাচ্ছেন। অপরাধ কর্মকাণ্ডের তথ্য যেখানে পাচ্ছেন সেখানেই অভিযান চালাচ্ছেন।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা