× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিষিদ্ধ দলের সদর দপ্তরে…

তোফাজ্জল হোসেন কামাল

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

 আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বর্তমান চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বর্তমান চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

একসময়ের চাকচিক্যময় ভবনটি এখন কেবলই বিবর্ণ, দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষ নিয়ে। ভেতরে কোনো জনসমাগম-কোলাহল নেই, নেই নেতাকর্মীদের আনাগোনা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে যেখানে চলত কয়েক দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি, মঙ্গলবার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সেখানে ছিল শুধুই নীরবতা।

অথচ চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের আগের দিনও রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে প্রতিদিনই হাজির হতেন সারা দেশের প্রভাবশালী সরকারদলীয় নেতারা। দলটির সব ধরনের কর্মসূচিও পরিচালনা হতো এখান থেকেই। নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকত ভবনটি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পটপরিবর্তনের পর বদলে গেছে সেই চিত্রপট। নিচতলা এখন পথচারী এবং ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের শৌচাগারে পরিণত হয়েছে। আর ওপরের দরজা-জানালাবিহীন কক্ষগুলোতে অবাধে যাতায়াত করছেন ভবঘুরে ও মাদকসেবীরা। রাত হলে এখানে চলে মাদক সেবনসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডও। গত সোমবার সরেজমিন ঘুরে ও অনেকের সঙ্গে কথা বলে এই রকম চিত্রই পাওয়া গেছে। তবে মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন।

গুলিস্তানের ২৩ শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউর (সাবেক বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) ১০ তলাবিশিষ্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি ২০১৮ সালের ২৩ জুন উদ্বোধন করেছিলেন দলের সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। একসময়ের নন্দিত সেই ভবনটির দিকেই এখন নিক্ষিপ্ত হয় বহু মানুষের নিন্দিত দৃষ্টি। তাছাড়া সুসজ্জিত ভবনটি এখন অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ভেতরের আসবাব লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের নিচতলা শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। প্রতিদিনকার মলমূত্র জমে থাকার কারণে উৎকট গন্ধ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এজন্য ভবনের সামনের সড়কে নাক চেপেও হাঁটা দায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভবনটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর চলে লুটপাট। তখন থেকেই ভবনটি পরিত্যক্ত। বাইরে থেকে ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ চোখে পড়ে। ভেতরে পোড়া দেয়াল ছাড়া কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভবনটির পাশের এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমি এই এলাকায় প্রায় ২০ বছর ধরে ব্যবসা করি। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের এই অফিস কীভাবে আগুন লাগিয়ে ভাঙচুর করে ধ্বংস করা হয়েছে, তা নিজের চোখে দেখেছি। সেদিন অন্তত ২০০-২৫০ জন লোক এসে পুরো ভবন তছনছ করে আসবাব নিয়ে গেছে।”

তার মতে, ‘আওয়ামী লীগ যেমন কর্ম করেছে, তেমন ফল ভোগ করছে। এই ভবনে বসে তারা দেশের মানুষের ওপর নির্যাতনের নকশা আঁকত। এটা ছিল তাদের রাজপ্রাসাদ। আজ সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এখান থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত যে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।’

ভবঘুরে লোকদের ঠিকানা

সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, ভবনটির নিচতলা লোকজন গণশৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করছেন। উৎকট গন্ধের কারণে নাক চেপে মানুষ এই ভবনের সামনের অংশ পার হচ্ছেন। এ সময় বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে ভবনের নিচতলায় গিয়ে প্রস্রাব করতে দেখা যায়। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের শৌচাগার হিসেবেও এই ভবনের নিচতলা ব্যবহার হচ্ছে।

ভবনটির ভেতরে প্রবেশের পর দেখা যায়, নিচতলায় দুটি কক্ষে নোংরা পানি জমে আছে। পুরো ফ্লোরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখা গেল বাথরুম থেকে শুরু করে সব কক্ষের মালামাল লুট করার পর এসব কক্ষ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে ধ্বংসাবশেষ। খুলে নেওয়া হয়েছে প্রতিটি কক্ষের দরজা। দরজা খুলতে গিয়ে ভবনের দেয়াল ভাঙতে হয়েছিল। সেখানে ইটের খোয়া ও কাচের টুকরা পড়ে আছে। ছয়তলায় গিয়ে দেখা গেল, কয়েকজন মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাদের ছিন্নমূল বলে মনে হয়েছে। কতদিন ধরে থাকছেন জানতে চাইলে তারা বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে তারা এই ভবনে আছেন। রাতে আরও অনেক লোক থাকার জন্য আসেন বলে জানান তারা।

তৃতীয় তলায় উঠতেই দেখা যায়, পাঁচ থেকে ছয়জন ভবঘুরে বিছানা পেতে লুডু খেলে সময় পার করছেন। ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় আরও কয়েকজন ভবঘুরের আনাগোনা দেখা যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন মাস ধরে এখানে অবস্থান করছেন। বলা চলে তাদের ঘরবাড়ি এখন এই ভাঙাচোরা কার্যালয়।

তৃতীয় তলায় লুডু খেলা শরীফ নামের এক ভবঘুরে বলেন, “দুই বছর আগে এই ভবনের কাছে-কিনারে আমরা আসতে পারতাম না। বড় বড় নেতারা আমাদের গায়ের ময়লা কাপড় দেখলেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। এখন এখানে আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। কিন্তু সেই বড় নেতারা হারিয়ে গেছে, তাদের আর দেখা মেলে না।”

সপ্তম তলায় ধ্বংসাবশেষে শুয়ে থাকা মাহিম নামের এক ভবঘুরে বলেন, “আমি সিটি করপোরেশনে ময়লা সংগ্রহের কাজ করি। মাসে ছয় হাজার টাকা পাই। থাকার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নাই, আগে রাস্তায় বা যেখানে জায়গা পেতাম সেখানেই ঘুমাতাম। গত তিন মাস ধরে এখানে থাকছি। আমিসহ আরও ১৫-২০ জন রাতে এখানে থাকি।”

শুধু ভবঘুরে কিংবা ছিন্নমূল মানুষ নয়; অনেক শ্রমজীবীও আওয়ামী লীগের এই কার্যালয়ে রাতে ঘুমাতে আসেন।

মো. সোহেল নামের এক রিকশাচালক বলেন, “রিকশা চালানো শেষে গ্যারেজে রেখে আমি আর শাহিন নামে এক বন্ধু এখানে এসে রাতযাপন করি। দেড় মাস ধরে এখানেই থাকি। আগে তো রিকশার ওপরই ঘুমাতাম। এখন একটু আরামে ফ্লোরে কাঁথা পেতে ঘুমাই।”

ভবন থেকে বেরিয়ে কথা হয় এই কার্যালয়ের সামনের কয়েকজন ভ্রাম্যমাণ দোকানির সঙ্গে। লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুর রহিম জানান, তার মালিক ভুট্টো ৪০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে চায়ের স্টল দিয়ে ব্যবসা করছেন। 

কার্যালয়ের বর্তমান দশা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, “ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়, এটা সকলের বোঝা উচিত।”

পাশের আরেক দোকানির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় হকার থেকে শুরু করে পথচারীরাও ভবনটিকে শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজনকে এখানে শৌচকাজ সারতে তারা দেখেছেন। 

সন্ধ্যা হলেই বাড়ে মাদকাসক্ত ও যৌনকর্মীদের আনাগোনা

দিনের বেলায় মাদকাসক্তদের তেমন চোখে পড়ে না। তবে সন্ধ্যা হলেই মাদকাসক্ত এবং যৌনকর্মীদের আনাগোনা বেড়ে যায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এই কার্যালয়ে। পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে কারবারিরা এখানে অবাধে মাদক বিক্রি করেন।

এছাড়া দুজন নারীর উপস্থিতিও লক্ষ করা যায় সেখানে। তাদের একজন বলেন, পেটের দায়ে এখানে এসেছি। আগে তো রাস্তায় কাজ করতাম। এখন এটা নিরাপদ জায়গা। তাছাড়া এখানে আসার জন্য টাকাও দিয়েছি। টাকা কাকে দিয়েছেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এই ভবনে কাজ করতে হলে প্রতিদিন জনপ্রতি ৫০ বা ১০০ টাকা দিতে হয়।”

এদিকে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে নেতাকর্মী না আসায় ব্যবসায় ধস নেমেছে আশপাশের হোটেল ও ফুটপাতের চায়ের দোকানিদের।

মালেক ব্যাপারী নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমাদের ব্যবসা চলত পার্টি অফিসে আসা নেতাকর্মীদের দিয়ে। এখন আর সেই ব্যবসা নাই।” অনেক নেতাকর্মীর কাছে বকেয়া অনেক টাকা পাননি বলেও জানান এই দোকানি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ভবনটি যেমন ছিল

আগের দিনের চেয়ে গতকালের চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। নিচের প্রধান ফটকটি মরিচা পড়া শিকলে তালাবদ্ধ দেখা গেছে। ফটকের ফাঁকগলে ভেতরে উঁকি দিতেই দেখা যায় ভ্যানভর্তি পলিথিন, সেখানে ব্যবসায়ীদের মালামাল আটকা পড়ে আছে। তালা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান ফটকের ডানপাশের বেঞ্চে গোমরামুখে বসে থাকা এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভাই, অনেক বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। আওয়ামী লীগের সাথে তাল মিলিয়ে চলেছি। এখন ভেতরটা খালি হয়ে যাওয়ায় মালামাল রাখার সুযোগ আমার মতো অনেকেই পেয়েছেন। প্রতিরাতে মাল রেখে যাই, সকালে এসে বের করে ফুটপাতে দাঁড়াই। আজ সকালে এসে দেখি কে বা কারা তালা লাগিয়ে গেছে। এজন্য মাল বের করতে পারিনি, ব্যবসাও নেই।’

ভবনটিতে যাওয়ার দুটো পথ আছে। একটি পীর ইয়ামেনী মার্কেটের দিক থেকে, অপরটি স্টেডিয়ামের দিক থেকে। গতকাল এই দুটি সড়কের মুখেই ছিল পুলিশের ব্যারিকেড। ফলে ভবনের সামনের সড়কটি ছিল ফাঁকা, কোনো হকারও বসতে পারেনি। ছিল কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থাও। যারা ব্যারিকেড পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে চেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই আশপাশের ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন গণমাধ্যকর্মী।

দুপুর ২টার দিকে যুবদলের একটি মিছিল ওই ভবনটির সামনের সড়ক প্রদক্ষিণ করে যায় বলে জানান স্থানীয়রা। এছাড়া নিরাপত্তা শংকায় ওই সড়কটি গতকাল অনেকেই এড়িয়ে গেছেন। 

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। পীর ইয়ামেনী মার্কেটের সামনে ছিল বিজিবির দুটো পিকআপভর্তি টহল দল। আগের দিনের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি ছিল। সোমবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পাহারার লেশমাত্র না থাকলেও গতকাল সেখানে সশস্ত্র পাহারায় ছিলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা। এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যসহ সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পালাক্রমে সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা