জবি ছাত্রীর আত্মহনন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৪ ১৫:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৪ ১৬:২২ পিএম
মেয়ে হারিয়ে অবন্তিকার মায়ের বিলাপ। শনিবার কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন বাসায়। প্রবা ফটো
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহননের ঘটনায় আরও ছয়জনকে দায়ী করেছেন তার মা। তাদের হয়রানি সইতে না পেরে অবন্তিকা এ পথ বেছে নিয়েছে দাবি করে অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনম অভিযোগ করেন– বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও হয়রানির বিচার পাননি তারা। এ কারণেই তার মেয়ে অবন্তিকা আত্মহত্যা করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে। একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার মেয়ের জীবনটাকে বিষিয়ে তুলেছিল। তারা বিভিন্নভাবে আমার মেয়েকে হয়রানি করে আজকের অবস্থার সৃষ্টি করেছে।’
এ সময় তিনি অবন্তিকার মৃত্যর জন্য দায়ী করে নতুন করে ছয় জনের নাম জানান। প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানতে পেরেছে, তারা সবাই অবন্তিকার সহপাঠী। তাদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
শনিবার (১৬ মার্চ) দুপুরে কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন বাসায় বিলাপ করতে করতে শবনম আরও বলছিলেন, ‘আমি তো কোনো দিন কারও কোনো ক্ষতি করিনি। এক বছর আগে স্বামী চলে গেছে, আজ আমি মেয়েকেও হারালাম। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিভাগের চেয়ারম্যান, প্রক্টর সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য। আমার মেয়ে যাতে ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করতে পারে, সেটি আর হলো না। ওদের জন্য আমি মেয়ে হারিয়েছি, আমি তাদের বিচার চাই।’
শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জবির আইন বিভাগের ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা ফেসবুকে শিক্ষক ও সহপাঠীকে দায়ী করে পোস্ট দেন। এর কিছুক্ষণ পরই কুমিল্লার নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস নেন ওই ছাত্রী। আত্মীয় ও পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার দুপুরে অবন্তিকার মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বেলা ৩টায় কুমিল্লা সরকারি কলেজ মাঠে জানাজা শেষে শাসনগাছা এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
অবন্তিকার পোস্ট করা সুইসাইড নোটে সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে হয়রানি, হুমকিসহ নানা অভিযোগ তুলেছেন। আর সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসে ডেকে নিয়ে হয়রানি ও মানহানির অভিযোগ তুলেছেন। তা ছাড়া ‘সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজিভ কমেন্ট’ করার অভিযোগ তুলেছেন ওই ছাত্রী।
আরও পড়ুন: শিক্ষক ও সহপাঠীকে দায়ী করে ফাঁস দিলেন জবি ছাত্রী
ঘটনার পরপরই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে আগুন জ্বালিয়ে ভোর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ সমাবেশ করে তারা। পরে রাত দেড়টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ক্যাম্পাসে এসে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের। উপাচার্যের আশ্বাসের পরও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থামাননি। পরে ভোরে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাড়লেও শনিবার বেলা ৩টায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেন তারা।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, ‘যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয় একটা আইন অনুযায়ী চলে। সে আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাকে স্থায়ী বরখাস্ত করা হবে। তদন্ত ছাড়া আমরা আইনের বাইরে গিয়ে এটা করতে পারি না। আমার হাতে যা আইন আছে, সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এ যৌন হয়রানির যে অভিযোগ বা রিপোর্ট, তার ব্যাপারে জানতাম না। জানলে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিতাম। আমি শোনামাত্রই বর্তমান প্রক্টরকে নির্দেশ দিয়েছি। আসন্ন সিন্ডিকেটে যতগুলো যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে, সব নিষ্পত্তি করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় একটা আইনে চলে। আইনের সব ধারা-উপধারা ব্যবহার করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপাচার্যের আশ্বাসের পর শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম সই করা পৃথক দুটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শিক্ষার্থী রায়হান সিদ্দিকি আম্মানকে সাময়িক বহিষ্কার ও দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে সহায়তাকারী ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দ্বীন ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত ও প্রক্টরিয়াল বডি থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি প্রদান করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন: আমার মেয়ে সেশনে ফার্স্ট, এটাই কি তার অপরাধ প্রশ্ন অবন্তিকার মায়ের
এ ছাড়া জবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে উপাচার্যের কাছে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।