বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৪ ০০:৩২ এএম
আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৪ ১৬:২০ পিএম
জবি আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা। সংগৃহীত
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও সহপাঠীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে অভিযোগ পোস্ট করে এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী শুক্রবার (১৫ মার্চ) রাত ১০টার দিকে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি কুমিল্লার বাড়িতে গলায় ফাঁস দেন। আত্মীয় ও পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ফাইরুজ অবন্তিকা নামে এই শিক্ষার্থী ফেসবুকে পোস্ট করা সুইসাইড নোটে তার মৃত্যুর জন্য সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দ্বীন ইসলামকে দায়ী করেছেন। আম্মান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে তিনি হয়রানি এবং হুমকি দেওয়াসহ নানা অভিযোগ তুলেছেন। সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসে ডেকে নিয়ে হয়রানি ও মানহানির অভিযোগ তুলেছেন। তা ছাড়া ‘সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজিভ কমেন্ট’ করার অভিযোগ তুলেছেন।
ফেসবুক পোস্টে ফাইরুজ অবন্তিকা লিখেছেন, ‘আমি যদি কখনও সুইসাইড করে মারা যাই, তবে আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র দায়ী থাকবে আমার ক্লাসমেট আম্মান সিদ্দিকী, আর তার সহকারী হিসেবে তার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে তাকে সাপোর্টকারী জগন্নাথের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম। আম্মান যে আমাকে অফলাইন-অনলাইনে থ্রেটের ওপর রাখত, সে বিষয়ে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ করেও আমার লাভ হয় নাই। দ্বীন ইসলাম আমাকে ভয় দেখায় যে, আমাকে বহিষ্কার করা ওনার জন্য হাতের ময়লার মতো ব্যাপার। আমি জানি এখানে কোনো জাস্টিস পাব না। কারণ দ্বীন ইসলামের মতো অনেক চামচা ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। এ লোককে আমি চিনতামও না। আম্মান আমাকে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজিভ কমেন্ট করায় আমি তার প্রতিবাদ করলে আমাকে দেখে নেওয়ার জন্য দ্বীন ইসলামের শরণাপন্ন করায়। আর দ্বীন ইসলাম আমাকে তখন প্রক্টর অফিসে একা ডেকে নারীজাতীয় গালিগালাজ করে। সেটা অনেক আগের ঘটনা হলেও সে এখনও আমাকে নানাভাবে মানহানি করতেছে বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন কথা বলে। আর এ লোক কুমিল্লার হয়ে কুমিল্লার ছাত্রকল্যাণে তার ছেলেমেয়ের বয়সি স্টুডেন্টদের মাঝে কী পরিমাণ প্যাঁচ ইচ্ছা করে লাগায়, সেটা কুমিল্লার কারও সৎসাহস থাকলে সে স্বীকার করবে। এই লোক আমাকে আম্মানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাতবার প্রক্টর অফিসে ডাকে নেয়। বলে, ‘খা...(অশালীন শব্দ) তুই এই ছেলেরে থাপড়াবি বলসস কেন? তোরে যদি এখন আমার জুতা দিয়ে মারতে মারতে তোর ছাল তুলি তোরে এখন কে বাঁচাবে?’ আফসোস, এই লোক নাকি ঢাবির খুব প্রমিনেন্ট ছাত্রনেতা ছিল। একবার জেল খেটেও সে এখন জগন্নাথের প্রক্টর। সো ওর পলিটিকস আর নষ্টামির হাত অনেক লম্বা। না হলে ও এত কুকীর্তির পরও এভাবে বহাল তবিয়তে থাকে! কোথায় এই লোকের কাজ ছিল গার্ডিয়ান হওয়া আর সে কিনা শেষমেশ আমার জীবনটারেই শেষ না হওয়া পর্যন্ত মুক্তি দিল না।’ শেষে অবন্তিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাদেকা হালিমের কাছে বিচার চান।
আরও পড়ুন: প্রতিবাদী অবন্তিকার করুণ সমাপ্তি

তিনি আরও লিখেছেন, ‘আর আমি ফাঁসি দিয়ে মরতেসি। আমার ওপর দিয়ে কী গেলে আমার মতো নিজেকে এত ভালোবাসে যে মানুষ সে মানুষ এমন কাজ করতে পারে। আমি জানি এটা কোনো সলিউশন না, কিন্তু আমাকে বাঁচতে দিতেছে না, বিশ্বাস করেন। আমি ফাইটার মানুষ। আমি বাঁচতে চাইসিলাম! আর পোস্টমর্টেম করে আমার পরিবারকে ঝামেলায় ফেলবেন না। এমনিতেই বাবা এক বছর হয় নাই, মারা গেছেন, আমার মা একা। ওনাকে বিব্রত করবেন না। এটা সুইসাইড না। এটা মার্ডার। টেকনিক্যালি মার্ডার। আর আম্মান নামক আমার ক্লাসমেট ইভটিজারটা আমাকে এটাই বলছিল যে, আমার জীবনের এমন অবস্থা করবে যাতে আমি মরা ছাড়া কোনো গতি না পাই। তাও আমি ফাইট করার চেষ্টা করসি। এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে সহ্যক্ষমতার।’

অবন্তিকে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয় তখন সেখানে দায়িত্বে ছিলেন ডাক্তার জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আমরা তার দেহ নিথর অবস্থায় দেখতে পাই। তার গলার নিচে দাগ ছিল। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।’
কুমিল্লা জেনারেল হাসপালের আবাসিক সার্জন ডা. আব্দুল করিম খন্দকার বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আনলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপরেও স্বজনদের আকুতির কারণে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়।’
ফাইরুজ অবন্তিকারমৃত্যুর প্রতিবাদে রাতেই জবি ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর পূ্র্বের ঘটনা নিয়ে নিয়ে আমি অবগত ছিলাম না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সে যদি আসত তাহলে আমি ভিসি ম্যামের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিতাম।’ তবে অবন্তির মৃত্যুর পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশে ইতোমধ্যে অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অফিস খুললে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আর আমরা একটি প্রক্টরিয়া টিম কুমিল্লায় পাঠাচ্ছি।’ তারা রাতেই কুমিল্লা যাবেন বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে কথা বলতে শিক্ষার্থী আম্মান সিদ্দিকী ও দ্বীন ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা কেউ রিসিভ করেননি।
আরও পড়ুন: আরও ৬ জনের নাম বললেন অবন্তিকার মা
রাতে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পুলিশ যাওয়ার আগেই লোকজন ওই ছাত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। শনিবার ময়নাতদন্ত করা হবে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।’