সীমান্তের ওপারে বিশ্বকাপ
হেলাল নিরব
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৩ ২০:২৩ পিএম
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩ ২০:২৪ পিএম
গল্পের মূল চরিত্রের জার্সির রঙও বদলে গেছে— টুইটার
ভারতের জার্সি গায়ে চার-ছক্কা হাঁকাচ্ছেন ছেলে রাচিন রবীন্দ্র। প্রতিপক্ষ বোলারদের তুলাধুনা করে আনছেন ফিফটি কিংবা গড়ছেন শতক। প্রিয় সন্তানের একের পর এক মহাকাব্যিক ইনিংস গ্যালারিতে বসে দেখছেন বাবা রবি কৃষ্ণমূর্তি। বুক ভরে যাওয়ার মতো দৃশ্য, মুখের হাসি চওড়া হওয়ার মতো তো বটেই! কিন্তু গল্পের চিত্রনাট্যে ঠিক এখানটাতেই এসেছে পরিবর্তন। আকর্ষণীয় সিনেমাটি ‘কাট’ বলে থামিয়ে দিয়েছেন ডিরেক্টরস, পেশায় সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট কৃষ্ণমূর্তি নতুন করে সাজিয়েছেন সব। ভারত ছেড়ে পরিবার নিয়ে এসেছেন নিউজিল্যান্ডে। গল্পের মূল চরিত্রের জার্সির রঙও বদলে গেছে তাতে।
গেরুয়া-সাদা-সবুজ রঙের স্ট্রিপ আঁকা জার্সি পরে নয়, আজ ধর্মশালায় কালোর মাঝে ধূসরের স্ট্রিপ টানা গেঞ্জি পরে নামবেন রাচিন। যার সত্তায় যে মিশে আছে ভারতীয়। রাচিন তবে একাই নন, আরও একজন আছেন— ইশ সোধি। যিনিও ভারতীয়। কিন্তু খেলবেন কিউইদের হয়ে। সোধি যদি হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট সংস্থা স্টেডিয়ামে ব্ল্যাক ক্যাপসদের একাদশে থাকেন, তবে তার বাবা-মা কাদের সাপোর্ট করবেন? নিজের দেশ ভারতকে নাকি বর্তমানে যেখানে থাকা হচ্ছে সেখানকার দেশকে! জিজ্ঞাসাটি বরং তাদের কাছেই তোলা থাকুক। তবে ছেলে ভালো খেলুক এবং তার দল জিতুক— প্রতিটি মা-বাবা এমনটিই চাইবেন।
রাচিন-সোধিরা তত বেশি আবেগতাড়িত হয়ে যাবেন না নিশ্চয়। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা রাচিন ব্যাট হাতে আগের ম্যাচগুলোর মতো এদিনও তাণ্ডব চালাবেন, বোলিংয়ে ধর্মশালার পিচে ঘূর্ণি ছোটাবেন সোধি। জন্মভূমির বিপক্ষে তাদের একটু কঠিন হতেই হবে। শেকড় ভুলে বিশ্বকাপের শীর্ষে থাকতে চাইলে জয়ের বিকল্প নেই।
বিশ্বকাপে টানা পাঁচ জয়ে সেমিফাইনালের পথ আরেকটু পাকা করতে চাওয়ার ম্যাচে রাচিন থাকছেন। উপমহাদেশের কন্ডিশন, টার্নিং ও স্লো পিচের মাঠে সোদিও একাদশে থাকতে পারেন। ভারতের বিপক্ষে ভারতের মাটিতে খেলতে যাওয়া দুই যুবকের গল্প বলি এবার। সোধির পুরো নাম ইন্দারবীর সিং সোধি। নিউজিল্যান্ডের ৩০ বর্ষী স্পিনারের বয়স যখন ৪, তখন তার পরিবার পাঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে অকল্যান্ডে পাড়ি জমায়। কিউই ডেরায়ই বেড়ে ওঠেন সোদি।
‘আমার হিন্দি নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে। আমার মনে হয় মা সংবাদ সম্মেলন দেখছেন। যদি বিন্দুমাত্র ভুল বলি (হিন্দি) তাহলে সে কঠিন সময় উপহার দেবে! সুতরাং ইংরেজিতে উত্তর দেব। আশা করি আমার হিন্দি একটু শোধরাতে পারব’
একটু-আধটু হিন্দিও বলতে পারেন, মাতৃভাষা বলে কথা! তবে মা সিমরাট সোধি ছেলের ভুলভাল হিন্দি কেন মেনে নেবেন, সেই কাহিনীও একবার অকপটে শুনিয়েছিলেন সোধি। টি-টোয়েন্টিতে রোহিত-কোহলিদের ধসিয়ে ২০২১ সালে একবার ম্যাচসেরা হওয়ার পর সোধি বলেছিলেন সেই গল্প, ‘আমার হিন্দি নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে। আমার মনে হয় মা সংবাদ সম্মেলন দেখছেন। যদি বিন্দুমাত্র ভুল বলি (হিন্দি) তাহলে সে কঠিন সময় উপহার দেবে! সুতরাং ইংরেজিতে উত্তর দেব। আশা করি আমার হিন্দি একটু শোধরাতে পারব।’
আরও পড়ুন:
সোধি নিজের হিন্দি কতটুকু সামলেছেন জানা নেই, তবে নিজেকে স্পিনে যে আরও উন্নত করেছেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একসময় কিউই দলের ‘উপমহাদেশের সিরিজের’ স্পিনার বনে যাওয়া সোধি এখন উইলিয়ামসন-লাথামদের বড় অস্ত্র। ঠিক একইভাবে নিজের জাত চেনাচ্ছেন রাচিন রবীন্দ্র। বাবা কৃষ্ণমূর্তি ছিলেন ক্রিকেটের পাঁড় ভক্ত। বেঙ্গালুরুর রাজ্য পর্যায় পর্যন্ত খেলেছেনও। কিন্তু বয়সের সঙ্গে দায়িত্ব বাড়ায় আর পারেননি। কিন্তু তিনি না পারলেও ছেলেকে দিয়ে ইচ্ছে পূরণ করবেন বলে সংকল্প করেছেন। মেয়েকে দিয়ে একবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু হলো না। শেষে ছেলে রাচিনই হলেন ভরসা।
ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা দুই ব্যাটসম্যানের নাম থেকে ছেলের নামকরণ করা ‘রা + চিন’ বাবার মানও রাখলেন। রাহুল দ্রাবিড়ের ‘রা’ আর শচিন টেন্ডুলারের ‘চিন’-এর মতো নিজেকেও এগিয়ে নিচ্ছেন দুর্বার গতিতে। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি পাওয়া রাচিন আছেন দুর্দান্ত ছন্দে। বোলিংয়েও রাখছেন মান। ভারতের বিপক্ষে টম লাথাম আগের মতো অগ্নিমূর্তি রাচিনকেই চাইবেন।
কিন্তু তাহলে ভিন্ন হতে পারে গল্প! দেড় যুগের আগে কৃষ্ণমূর্তির নেওয়া সেই ‘ডিরেক্টরস কাটের’ অপশনও এখানে নেই। রাচিন-সোধিরা কিউইদের জার্সিতে তাদের দেশের হয়েই খেলবেন, জন্মভূমিকে হারের স্বাদ দিয়ে শীর্ষও পোক্ত করতে চাইবেন। শেকড় ভুলে শিখরে উঠতে চাওয়াদের মাঝেমধ্যে হৃদয়হীন হতে হয়!