হেলাল নিরব
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৩ ০৯:০১ এএম
আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৩ ১২:০৯ পিএম
ইমপোস্টার সিনড্রোমে ভুগতেন শাহিন শাহ আফ্রিদি। কঠোর পরিশ্রম করলেও দিনশেষে বলতেন, ‘আমাকে দ্বারা হবে না। এত বড় দেশ, কতশত তরুণ’— সুযোগ কীভাবে পাব?’ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা শাহিনের জন্য প্রশ্নটা বড় হয়েও উঠেছিল। অনূর্ধ্ব-১৬ দল সিলেকশনের ট্রায়ালে মোটে দুটি বল করতে পারলেন। কিশোর শাহিনের মনে তখন ঝেঁকে বসেছে ভয়। কালবিলম্ব করলেন না। কল করলেন বড় ভাই রিয়াজ আফ্রিদিকে, ‘আমি মনে হয় সুযোগ পাচ্ছি না। এত প্রতিভার মধ্যে আমাকে নিতে তাদের বয়েই গেছে!’ ফোনে যতটুকু পারা যায় সাহস জোগালেন রিয়াজ। আশ্বাস দিলেন, ‘তুই সুযোগ না পেলে পাবেটা কে!’
সেই ‘তুই না পেলে কে পাবে’ বাক্যটি এখন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বহুদূর ছড়িয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়ার লান্ডি কোতালের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে করাচি হয়ে পাকিস্তানের সীমানা ভেদ করেছেন। শাহিন এখন পাকিস্তান জাতীয় দলের মূল পেসার, দলের অন্যতম সদস্য। মানসিক অবস্থায় নড়বড়ে শাহিনই এখন কাঁপন ধরান। প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের ভাবতে বাধ্য করান, ‘ওকে কীভাবে মোকাবিলা করব?’ ইমপোস্টার সিনড্রোমে ভোগা শাহিন একই রোগে খুব করে ভোগান প্রতিপক্ষকে। কয়েকশ উইকেট ও দুর্দান্ত সব রেকর্ডের মালিক বনে যাওয়া শাহিনকে কেউ কেউ এখনই দেখছেন কিংবদন্তিদের কাতারে। ‘কিছু না’ থেকে ‘এত কিছু’ হওয়ার পেছনে কিন্তু দ্বিধাদ্বন্দ্বের ছিটেফোঁটাটাও নেই। শাহিনের ছিল একাগ্রতা, মনোবল, মনোযোগ আর কঠোর পরিশ্রম। অনুশীলনে চুল পরিমাণ ছাড় দিতে নারাজ শাহিন এখন পাকিস্তানের তো বটে, বিশ্বের সেরা বোলারদেরও একজন!
শাহিনকে আরও অনেক কিছু শিখতে হবে, ছাড়তে হবে কমফোর্ট জোন। শাহিন ছাড়লেন। পছন্দের শহর ছেড়ে পাড়ি জমালেন দেশের আরেক প্রদেশে। নরম মনের অল্পভাষী শাহিন সদালাপী হয়ে উঠলেন। বনে গেলেন পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘কমফোর্ট জোনে’
অথচ তিনিই কিনা ক্রিকেট বল হাতে নিয়ে ভেবেছিলেন, ‘ক্রিকেটার হওয়া আমার দ্বারা হবে না।’ শাহিনের এমন ভাবনার পেছনেও কারণ ছিল। কোথায় খেলবেন, অনুশীলন করবেন কোথায়, শুরুটা কই আর শেষটাইবা কোথায়! শাহিন অবশ্য শেষটা শুরুতেই ঠিক করে বসেছিলেন, ‘হবে না! এত লোকের ভিড়ে আমি কিচ্ছু না।’ তার ওপর শাহিনকে ছাড়তে হবে প্রত্যন্ত গ্রাম। কিন্তু সব হলো। আফগানিস্তানের বর্ডারের পাশে থাকা অঞ্চল থেকে শাহিন এলেন বড় শহর করাচিতে। সেখানেই শুরু, এখনও চলছে। আজকের শাহিন হওয়ার পেছনে যার সবচেয়ে বড় অবদান, সেই বড় ভাই রিয়াজের কথা সুযোগ পেলেই তাই বলে চলেন তারকা পেসার, ‘ভাইদের মধ্যে সবাই ক্রিকেটার। তাদের দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছি। জীবনের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হলো, আমার একজন বড় ভাই (রিয়াজ আফ্রিদি) আছেন। যিনি ক্রিকেট সম্বন্ধে কত কিছু জানেন। আমি তাকেই অনুসরণ করি। ক্রিকেটে তিনিই আমার আদর্শ।’
পত্রিকার ঝকঝকে কাগজে পড়তে ক্লিক করুন...
২০০০ সালে জন্ম নেওয়া শাহিন সাত ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। বড় ভাই রিয়াজ নিজেও পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন খেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি! তাই খুব চাইতেন তার যে স্বপ্নটা পূরণ হয়নি, সেটি তার ছোট ভাই পূরণ করবে। কিন্তু সেজন্য শাহিনকে আরও অনেক কিছু শিখতে হবে, ছাড়তে হবে কমফোর্ট জোন। শাহিন ছাড়লেন। পছন্দের শহর ছেড়ে পাড়ি জমালেন দেশের আরেক প্রদেশে। নরম মনের অল্পভাষী শাহিন সদালাপী হয়ে উঠলেন। বনে গেলেন পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘কমফোর্ট জোনে’।
লান্ডি কোতাল ছেড়ে ভাইয়ের পরামর্শে পেশোয়ারে চলে আসেন শাহিন। সেখানে খান ল্যাবরেটরিজ নামে একটি ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন। শুরু করেন স্কিল ডেভেলপমেন্ট। শাহিনকে এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ফেডারেলি অ্যাডমিনিস্টার্ড ট্রাইবাল এরিয়াসের অনূর্ধ্ব-১৬ ট্রায়াল থেকে একে একে সুযোগ করে নিলেন পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলেও। টুর্নামেন্টে ১২ উইকেট শিকার করা তারুণ্যে ঝলমলে শাহিন পেয়ে যান আইসিসির ‘রাইজিং স্টার অব দ্য স্কোয়াড’ পুরস্কার।
২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক পরিসরে অভিষেক হয় শাহিনের। অথচ এর আগে তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে সবেধন নীলমণি হিসেবে ছিল কেবল একটি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ। লাইন-লেন্থ, গতি আর বিধ্বংসী সব ইয়র্কারের দুর্দান্ত দক্ষতা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা শাহিন এখন আতংকের নাম! ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার শাহিন নিজেকে ছাপিয়ে গেছেন, এবার বুঁদ হয়ে আছেন সবাইকে ছাপিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে। এখন নিশ্চয় দ্বিধার সেই রোগটি উঁকিঝুঁকি দেয় না। বরং দুহাত শূন্যে ভাসিয়ে শাহিন বুক চিতিয়ে জানান দেন, ‘পারব। আমি না পারলে কে পারবে!’