এম. এম. কায়সার
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৩ ০৯:০৩ এএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৩ ০৯:০৬ এএম
আগানিস্তান সিরিজ শুরুর এক দিন আগে সংবাদ সম্মেলনে তামিম ইকবাল বিশ্বকাপ নিয়েও কথাবার্তা বলেছিলেন। জানিয়েছিলেন তার মতামত। বিশ্বকাপে দলের কম্বিনেশন কেমন হবে- সে প্রসঙ্গও তুলেছিলেন। বিশ্বকাপ শুরুর এখনও মাস তিনেক বাকি। কিন্তু ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম স্বপ্ন সাজাচ্ছিলেন। সেই তামিম আকস্মিক সিরিজের প্রথম ওয়ানডের পরদিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। চোখে জল নিয়ে বললেন, আমি আমার শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর খেলব না।’ ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে বেশ কয়েকবার বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। চোখ গড়িয়ে নামা জল মুছে জানিয়ে দিলেন- ‘এটা হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। পরিবারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার বেশি কিছু বলার নেই। শুধু একটা কথাই বলব, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করেছি। সম্ভবত আমি বেশি ভালো ছিলাম না।’
আরও পড়ুন : তামিম ইকবালকে অবসরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান বিসিবি সভাপতির
তামিম বলছেন ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার তার এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ কোনো কিছু নয়। তবে পরিস্থিতি, পরিবেশ এবং সার্বিক অবস্থায় এটা স্পষ্ট যে- তামিম হঠাৎ করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং যে কায়দায় ও সময়ে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন তাতেই পরিষ্কার ক্রিকেট থেকে অবসরে চলে যাওয়ার তার বিষয়টির সঙ্গে অভিযোগ, অনুযোগ এবং অভিমানের ছায়া সুস্পষ্ট।
-প্রশ্ন হলো কার প্রতি এই অভিমান, অভিযোগ তার?
সেই উত্তরও সহজ- বিসিবি বস এবং কোচ।
সেই ব্যাখ্যায় যাই। সিরিজ শুরুর আগে থেকেই তামিম ইকবালের ফিটনেস নিয়ে বড় প্রশ্ন ছিল। ঢাকায় অনুশীলনেও নিজের ফিটনেস নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তামিম। পিঠের ব্যথা ভোগাচ্ছিল তাকে। সেই সংকট নিয়েই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। চট্টগ্রামে সিরিজ শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনেও তার ফিটনেস প্রসঙ্গটি উঠে আসে। সেখানে তামিম মেনে নেন, ‘আমি অবশ্যই আগামীকালের ম্যাচের জন্য আছি। শরীর আগের চেয়ে ভালো। তবে এটা বলব না যে শতভাগ (ঠিক আছি)। কাল খেলার পর আরও ভালো বুঝতে পারব যে অবস্থা। তবে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আমি আগামীকাল (প্রথম ওয়ানডে) খেলছি।’
শতভাগ ফিট না, তারপরও তামিমের ম্যাচ খেলার বিষয়টি দুজন ঠিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। প্রথমজন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। দ্বিতীয়জন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। বিসিবি সভাপতি এই প্রসঙ্গে তার বক্তব্য প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে সুস্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, এটা কি পাড়া-মহল্লার ম্যাচ নাকি যে তামিম এমন সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি জানান, কোচও তামিমের এমন পরিকল্পনায় ক্ষুব্ধ। তিনি চিল্লাচিল্লিও করেছেন। বিসিবি সভাপতি ও কোচের এমন মনোভাবের কথা পরদিন সকালে ম্যাচের আগে তামিম জানতে পারেন। টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে প্রায় প্রত্যক্ষভাবে তামিমের কাছে একটা সিদ্ধান্ত পাঠানো হয়। যেখানে তাকে এই ম্যাচ না খেলে বিশ্রামে থাকতে বলা হয়। তামিম সেই সিদ্ধান্ত শোনেন। কিন্তু মানেননি। ম্যাচে টস করতে নামেন। খেলেন। ২১ বলে ১৩ রান করে আউট হন। বৃষ্টিভেজা প্রথম ওয়ানডে বাংলাদেশ বৃষ্টি আইনে ১৭ রানে হারে।
একজন অধিনায়ক তার দল নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা ও চিন্তায় স্বাধীনতা অবশ্যই খুঁজবেন। কিন্তু তামিম টের পান তার সেই স্বাধীনতা ও স্বকীয় চিন্তা দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অধিনায়ক হিসেবে তার চিন্তা-চেতনার জগৎ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার এই মঞ্চে তিনি কেবল ক্রীড়নক! পাপেট। পুতুল অধিনায়কের খোলস গায়ে চড়িয়ে মাঠে নামার অমর্যাদা মেনে নিতে পারেননি তামিম ইকবাল। জোর করে দলে জায়গা দখল করে রেখেছেন- এমন একটা কথার প্রেক্ষিতে তামিম এক দিন টি- টোয়েন্টি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছিলেন। ওয়ানডে দলেও তাকে অনেক সময়ে শুনতে হয়েছে তিনি একাদশে খেলছেন শুধুমাত্র অধিনায়ক বলেই! তার খেলার ধরন। স্ট্রাইক রেট। ইনজুরি। প্রায় প্রতিটি ম্যাচ শেষে অযৌক্তিক সমালোচনার সুচালো সুচ- একসঙ্গে এত জটিলতা নিয়ে আর সামনে বাড়তে চাননি তামিম। এমনসব পরিস্থিতিতে ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের কাছেও তার ‘খেলো’ হয়ে পড়ার পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। স্বাধীন, স্বকীয় চিন্তায় ক্রিকেট জীবন কাটানোর ছবি আঁকা তামিম ইকবাল দেখলেন তার ‘ক্রিকেট পেইন্টিং’ নষ্ট করার লোকের লাইন বেশ লম্বা।
তাই ‘ইজেল’ গুটিয়ে নিলেন। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সুন্দর ক্যানভাসে কোনো কালো দাগ দিতে নারাজ তামিম।
তাই সরে গেলেন। নিজেকে গুটিয়ে নিলেন।
-ক্ষতি কার হলো?
উত্তরটা একটু অন্যভাবে খুঁজি। বিশ্বকাপের আগে নতুন অধিনায়ক খুঁজতে হবে এখন বাংলাদেশকে। নতুন ওপেনার খুঁজতে হবে। তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি আছে এমন ক্রিকেটার বাংলাদেশে একজনই। বাংলাদেশের হয়ে ব্যাটিংয়ে সর্বোচ্চ কিছুর প্রায় সব রেকর্ডই তার দখলে; জি, আপনি তাকে চেনেন।
তিনি গতকাল থেকে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার!