প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৩ ০৮:১৯ এএম
আপডেট : ০৬ জুন ২০২৩ ০৮:৩৩ এএম
ক্যারিয়ার-সূর্য ডুবে গেলে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকতে থাকা ক্রীড়াবিদদের গল্প বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেহাত কম নয়। সে গল্পে নতুন সংযোজন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের গোলরক্ষক মহসিনের নাম। তার খেলোয়াড়ি জীবনের ’৮০-৯০ দশকে তো বটেই, বাংলাদেশের ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা এই গোলরক্ষক ঠেকিয়েছেন অজস্র আক্রমণ, দলকে জিতিয়েছেন অনেক ম্যাচ। সেই মহসিনই কি না এখন অর্থাভাবে ধুঁকছেন বিনা চিকিৎসায়!
আরও পড়ুন : ওয়েম্বলিতে বিরুশকা
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে যাত্রা শুরু মহসিনের। এরপর ১৯৮১ সালে আবাহনীতে পাড়ি জমান। সুযোগের অভাবে পরের বছর চলে যান মোহামেডানে। সেখান থেকেই মূলত তার আলো ছড়ানো শুরু। মোহামেডান আবাহনী ম্যাচে একবার ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন অন্যতম দেশসেরা স্ট্রাইকার কাজী সালাউদ্দিনের পেনাল্টিও।
জাতীয় দলেও ছড়িয়েছেন আলো। তার দুরন্ত সব সেভ বাংলাদেশকে এনে দিয়েছিল অনেক জয়। হারলেও তার পারফরম্যান্স প্রশংসা কুড়িয়েছে বহু ম্যাচে। তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক শহিদুল আজম বলেন, ‘গোলরক্ষক মহসিনকে আমরা বলি, ’৮০ থেকে ’৯০ দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের গোলবারে বা মোহামেডান, আবাহনী, মুক্তিযোদ্ধার গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী। খুবই সাহসী ছিলেন। আমাদের দেশের ফুটবলের ইতিহাসে কিন্তু গোলরক্ষকদের অবদান অনেক বড় ছিল। স্বাধীনতার পর সান্টু ছিলেন… এই প্রক্রিয়া দিয়েই কিন্তু তার আসা।’
ঢাকা ডার্বিতে মহসিনের সালাউদ্দিনের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেওয়া আজও তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ‘তার যে সাহস, তখন আবাহনী মোহামেডানের ম্যাচ দেখতে আসা ৬০ হাজার দর্শক, তাদের সামনে সালাউদ্দিনের মতো খেলোয়াড়ের পেনাল্টি তিনি ঠেকিয়ে দেন। তখন থেকেই মূলত তিনি মোহামেডানের এক নম্বর গোলরক্ষক হয়ে যান।’
এই মহসিনকে দেখেই পরবর্তী প্রজন্মের অনেকে গোলরক্ষক বনেছেন, অভিমত শহিদুলের। তার কথা, ‘ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে যদি আপনি আমাকে বলেন, ’৮০ থেকে ’৯০ দশকের মাঝামাঝি মহসিন খেলেছেন, তখন তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন। এরপর যারা এসেছেন, পনির বলি, এরপর যারাই আছেন, অনেকেই মহসিনকে অনুসরণ করেছেন।’
তবে খেলোয়াড়ি জীবনে সাহসিকতার অন্য নাম মহসিনের বর্তমান পরিস্থিতি খুব একটা সুখকর নয়। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কানাডা চলে যাওয়া এই গোলরক্ষক ২০১৪ সালে ফেরেন দেশে। মায়ের অসুস্থতার কারণে তাকে সেবা করতে ফেরা মহসিনকে এরপর যেতে হয়েছে বিবাহ-বিচ্ছেদের মধ্য দিয়েও। এরপর তার জায়গা বেদখল হয়েছে ভূমিদস্যুদের হাতে।
শারীরিক অবস্থাও খুব ভালো নয়। হাতের আঙুল বেঁকে গেছে, চোখে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। বয়সের ভারে ক্রমেই হানা দিচ্ছে নানা অসুখ-বিসুখ। তার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে শহীদুল বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তার পারিবারিক সমস্যা ছিল। আমরা আসলে মাঠের যে মহসিনকে দেখেছি, স্টাইলিশ, সাহসী, তার সঙ্গে এখনকার যে চেহারা দেখছি, তার সঙ্গে আসলে কোনো মিল নেই।’
তার এমন পরিস্থিতি কাঁদাচ্ছে সাবেক সতীর্থ আশরাফ উদ্দীন আহমেদ চুন্নুকেও। বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে মহসিনের আবাহনীতে আসা এই চুন্নুর হাত ধরেই। সাবেক সতীর্থের এমন পরিস্থিতিতে ব্যথিত তিনিও। তার কথা, ‘মহসিনের এমন অবস্থার কথা যখন জানতে পারলাম, আমি তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি, চোখের পানি বেরিয়েছে অজান্তেই।’
সাবেক এই খেলোয়াড়ের এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের এগিয়ে আসা উচিত, অভিমত দেন শহিদুল। তার কথা, ‘ফুটবলারদের ক্ষেত্রে আমরা যা দেখি, তা হলো, ফুটবল ছেড়ে গেলে তার খোঁজখবর আর কেউ নেয় না। আমাদের জাতীয় দলের সাবেকরা যারা আছেন, তারা বিদেশে থাকলে ব্যবসা করেন, চাকরি করেন। তাদের পুনর্বাসন-দেখাশোনা করা হয় না। তারা তো আইকনিক খেলোয়াড়; তাদের মাধ্যমে অনেক খেলোয়াড় তৈরি হবেন, তাদের আমরা ব্যবহার করতে পারতাম। হয়তো ফুটবল ফেডারেশন বলবে আমরা কিছু জানি না বুঝি না। এখন যেহেতু জানছে, তখন আমরা আশা করতে পারি তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ ফুটবল ফেডারেশন নেবে।’