কলাম
গাজী আশরাফ হোসেন লিপু
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৩ ১০:৫৮ এএম
আপডেট : ১৯ মে ২০২৩ ১১:০৩ এএম
বিশ্বকাপ নিয়ে আশা তো সব সময় থাকে। সবচেয়ে বেশি আশায় ছিলাম শেষ বিশ্বকাপে। আমার মনে হয়, তখন ক্রিকেটাররা অনেক বেশি পরিণত এবং ভালো করার মতো অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে সিনিয়র ক্রিকেটাররা। এখনও তারাই আমাদের আশার আলো জোগাবে কিছু উঠতি ক্রিকেটারদের সান্নিধ্যে। তবে সব সিনিয়র ঠিক ছন্দে নেই। হয় স্ট্রাইক রেটে, রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে বা ফিল্ডিংয়ে কিছুটা পিছিয়ে। আয়ারল্যান্ড সিরিজের কথাই বলি, সাধারণ এক ক্যাচ ধরতে গিয়ে সাকিব ইনজুরিতে পড়ল। মাঠে এই রকম দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তবে আমি আশাবাদীদের দলেরই একজন। কিন্তু সেই সঙ্গে বাস্তবতাও মানি। তাই ঠিক উচ্চ আশাবাদী দলে আমি নেই। আমি এখনও মনে করি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মতো পরিপক্ব হয়ে উঠতে পারেনি আমাদের দল। আমাদের ব্যাটিং- বোলিং দুটোতেই এই ঘাটতি পরিষ্কার।
আরও পড়ুন : এশিয়া কাপ হতে পারে শ্রীলঙ্কায়: পাপন
এখনও ব্যাটিং অর্ডারে সাতে কে থাকবে? নিচের চারজন কারা হবে? ব্যাটার নিলে অলরাউন্ডার নিতে হবে- এসব প্রশ্নের সমাধান মেলেনি। বিশ্বকাপের বাকি মাত্র কয়েক মাস। আর দল এখনও এমনসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে।
কর্তারা গলা বাড়িয়ে বলছেন, এই দল ফাইনাল খেলবে। এতে নিশ্চিত বাড়তি চাপে পড়ছে দল। সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলার সম্ভাবনা বলা ঠিক আছে। এতটুকু চাপ হয়তো এই দল নিতে পারবে। ফাইনাল অনেক বড় চাপ। এটা ৫০ ওভারের খেলা। টি-টোয়েন্টি নয়। টি-টোয়েন্টিকে আমি ওই হিসাবে গোনায় ধরি না। ৫০ ওভারে যেকোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচে ফিরে আসার ক্ষেত্র থাকে। বড় টুর্নামেন্টে নিয়মিত ভালো করার মতো পর্যায়ে এখনও বাংলাদেশ দল পৌঁছেনি। এক মাস পর্যন্ত টানা এগারোজন খেলার অথবা অভিজ্ঞ কেউ ইনজুরিতে পড়লে তাকে রিপ্লেস করার রিজার্ভ বেঞ্চ আপনার কই? খেলাটা ক্রিকেট, অনিশ্চয়তার খেলা। আমি বাস্তবতার জমিনে থেকেই স্বপ্ন দেখি। চার বছর আগের বিশ্বকাপে যে সাকিবকে আমরা দেখেছিলাম, এবারও কি একই রকম পারফর্ম করতে পারবে সে? আমি কিছুটা শঙ্কিত। তাহলে আশা দেখাবে কে? কাউকে না কাউকে তো দলকে এগিয়ে নিতে হবে। শান্তকে নিয়ে হয়তো অনেকে আশার আলো দেখছেন। নিজের স্ট্রাইকরেটের দিকে নজর নিশ্চয়ই তামিমেরও রয়েছে। পুরো দলকে রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে দক্ষতা আরও অনেক ওপরে তুলতে হবে। এটা বিশ্বকাপ। এখানে চ্যালেঞ্জ অনেক। সামান্য ভুল করলেই বিপদ। তবুও আমি আশাবাদী। কারণ, এই বিশ্বকাপের পর আমাদের নতুন করে দল গোছানোর পর্যায়ে চলে যেতে হবে। টিমটিম করে যে বাতি জ্বলছে, সেটা বিশ্বকাপ জেতার মতো খুব উজ্জ্বল কিছু নয়। তবুও আলো জ্বলছে। আশার আলো!
আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় পুরো দলের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়াবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইংলিশ কন্ডিশনে দলের এই পারফরম্যান্স জানাচ্ছে ট্রু বাউন্সের উইকেটেও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে দল। শান্ত ভালো খেলোয়াড়। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মধ্যে আছে। ভালো উইকেট পেলে আরও ভালো খেলে। তাওহিদ হৃদয়কে দেখলাম, স্ট্রোকফুল ক্রিকেটার। এই সিরিজে আমাদের বেশ কিছু পর্যায়ে উন্নতিটা চোখে পড়েছে।
আগে কঠিন কোনো পরিস্থিতিতে পড়লে দল ঘাবড়ে যেত, পারব কি না? এর আগে অনেক ম্যাচে অনেক কাছে গিয়েও আমরা হেরে গেছি। সেই জায়গাতে একটু উত্তরণের আভাস পেলাম আমরা এই সিরিজে। ৩১৯ টপকে যাওয়া বা ২৭৪ রান করে মনে হচ্ছিল যে, আয়ারল্যান্ড বোধহয় জিতে যাচ্ছে। একসময় মনে হয়েছিল যে পারব না। কিন্তু সামান্য সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে বাংলাদেশ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে জিতল সেটাই অনেক বড় পাওয়া। শান্ত হঠাৎ বোলিংয়ে এসে ব্রেক থ্রু দিল। কিংবা মুস্তাফিজ শেষে যে বল করল, তাতেই ছোট্ট একটা সুযোগ তৈরি হলো। সেই সুযোগকে আরও বড় করে ম্যাচ জিতল বাংলাদেশ। এটাই বড় অর্জন।
সিনিয়র ক্রিকেটারের তালিকায় মুশফিক সিরিজে ভালো অবদান রেখেছে। তামিমের ইনিংসটা হয়তো আরও বিধ্বংসী হতে পারত। তবে শান্ত ও তাওহিদ হৃদয়, মিরাজ, লিটন যে ইনিংস খেলেছে বা যে সমর্থন দিয়েছে সেটাও বেশ ভালো। বোলিংয়ে এবাদত হোসেন ও হাসান মাহমুদ সাফল্য পেয়েছে। শরিফুল আশানুরূপ পারফর্ম করেনি।
অনেক ক্রিকেট তো দেখলাম। বাংলাদেশের অনেক বিশ্বকাপও দেখলাম। বয়স বাড়ছে আমার। আরও অনেকের মতো আমিও বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের বড় একটা সাফল্য দেখতে চাই।
বিশ্বকাপ মানেই কিন্তু কোনো ম্যাচই সহজ নয়। প্রতিটি ম্যাচে জয়ের জন্য নিজের সেরাটা দেখাতে হবে। চ্যালেঞ্জের জায়গা সেটাই।
আমাদের কোচ এবং টিম ম্যানেজমেন্টও নিশ্চয়ই ওইভাবে প্রস্তুতি নেবে। তবে মনে রাখতে হবে অনেক পার্থক্য থাকবে সেখানে। এটা যেকোনো ক্রিকেটার বুঝতে পারবে। কারণ, মাঠের ২২ গজের চাপ তো তাকেই মোকাবিলা করতে হয়। বল হবে ১৫০ কিলোমিটার গতিতে। আগে যেখানে ১৪০ কিলোমিটারকেই অনেক বেশি গতির মনে হতো, আর এখন অনেকেই নিয়মিতই ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করছে। চ্যালেঞ্জ দিন দিন বাড়ছে। তাওহিদ হৃদয়-শান্তকে কিন্তু আরও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিশ্বকাপ মানে এটা খুব আরামের কোনো জায়গা নয়। শুধু ব্যাটারদের নয়, আমাদের বোলারদেরও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। উইকেটে সেট হওয়া ব্যাটারকে বল করা কঠিন। ম্যাচ পরিস্থিতি নিয়ে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ট্রেনিং, ক্যালকুলেশন করতে হবে। এটা ডিফারেন্স বল গেম, বিভিন্ন প্রতিপক্ষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে নামতে হবে। প্রতিদিন নিজেদের নানা চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। সেই লড়াইয়ে জিততে হবে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ক্রিকেটার এবং কোচ সবার যৌথ ভূমিকা থাকতে হবে। কোচকেও বুঝতে হবে তার চ্যালেঞ্জ কী। আর আমি আমার শিষ্যকে প্রস্তুত করলাম কি না, সেই আত্মোপলব্ধিও থাকতে হবে। মাঠে গিয়ে সব সময় পারফর্ম করা সহজ নয়। কারও বাজে সময় গেলে কোচ তখন ঢাল হয়ে তাকে রক্ষা করবে।
বিশ্বকাপ দল তো ১৫ জনের হয়। বিশ্বকাপে তো কেউ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে না। বিশ্বকাপের ছায়া দল অনেক আগে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। যদিও সেটার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। কোন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কে খেলবে। কোন ছোট ছোট পরিবর্তন করা হবে, তাহলে বেঞ্চ থেকে কে খেলবে। ফিটনেস ঠিক থাকলে তাসকিন অবশ্যই দলে থাকছে। ৭ নম্বরে কে ব্যাট করবে সেই খোঁজ এখনও চলছে। বিকল্প ওপেনার হিসেবে নাঈম শেখকে ভেবেছিলাম। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাজে পারফরম্যান্সের কারণে সে সরে গেছে। বিজয়কে ডাকা হয়েছিল। সেও রণে ভঙ্গ দিয়েছে। রিয়াদের জায়গায় ইয়াসিরকে আনা হয়েছে। মাঝখানে মোসাদ্দেককে ট্রাই করা হয়েছিল। ইয়াসির রাব্বি কতটুকু ভালো করতে পারবে সেটা বলা কঠিন। সে যদি সুযোগ পায় তাকে সেরাটা দিতে হবে। সাত নম্বরে ব্যাট করার মতো গুণাবলি তার মধ্যে আছে কি না এটাও বড় প্রশ্ন। আমি যদি ভুল প্রমাণিত হই তাহলে খুশি হব। আমাদের নির্বাচকরা মনে হয় দেখছেন অপশনগুলো। নেটে অনেককে ভালো দেখা যায়, ম্যাচে গিয়ে চ্যালেঞ্জ নিতে পারে না। আমার মনে হয় খুব বেশি অপশন নেই। তাই ব্যাটিংয়ে সাত নম্বরের ওই জায়গাটি নিয়ে আমিও চিন্তিত। ৮, ৯, ১০, ১১ পজিশন নিয়েও চিন্তিত। ম্যাচে ভালো করতে হলে ভালো বোলিং অপশনও নিতে হবে।
এত লম্বা সময় ধরে আমরা খেলছি কিন্তু এখনও একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডার নেই। একজন লেগস্পিনারও তৈরি করতে পারলাম না। এটা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্য আমাদের!
লেখক : জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক