× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রমজান বিশেষ

সিকান্দার রাজা : হার না মানা এক যোদ্ধা

হেলাল নিরব

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৮:২৪ পিএম

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৮:৩১ পিএম

সিকান্দার রাজা : হার না মানা এক যোদ্ধা

আকাশ তাকে খুব টানত। স্বপ্ন দেখতেন পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধবিমান ওড়াবেন। নীল আকাশের বুক চিরে সাঁ সাঁ করে ঘোরাবেন যুদ্ধবিমান। এক এক করে ধ্বংস করে দেবেন শত্রুদের সব ঘাঁটি। সিকেন্দার রাজার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। সব ঠিক ছিল তবে রাজা আটকে গেলেন চোখের ত্রুটিতে। কিন্তু রাজারা যে আটকান না, বুক চিতিয়ে লড়ে যান। গল্প লেখেন, নিজেকে নিয়ে লিখতে বাধ্য করেন। হার না মানা যোদ্ধা রাজার গল্পও তেমন অম্লমধুর। যিনি ধুঁকতে থাকা জিম্বাবুয়েকে দেখাচ্ছেন পথ, বিশ্বাস রাখেন ধর্মে এবং নিজের কাজে। তাই তো রাজা মাথা উঁচু করে বলেন, ‘আমি মানুষ হিসেবে একজন যোদ্ধা।’

আরও পড়ুন - কলকাতার জয়ে ফেরা নিয়ে আশাবাদী লিটন

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটে ১৯৮৬ সালে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক ছেলেসন্তান। বাবা-মা আদর করে নাম দেন সিকেন্দার অর্থাৎ মানবতার রক্ষক। পরে যিনি সত্যিই নিজের নামের প্রমাণ করে চলছেন। বিমানের স্টিয়ারিং ধরে শত্রুকে গুটিয়ে দিতে না পারলেও, ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষের বোলারদের দিচ্ছেন গুঁড়িয়ে— বল হাতে ধসিয়ে। রাজা রাজার মতো ক্রিকেটের বাইরেও বিচরণ করছেন। আফ্রিকার নানা প্রান্তে গিয়ে সাহায্য করছেন দুস্থদের।

২০০১ সালে সপরিবারে জিম্বাবুয়ে অভিবাসিত হন রাজা। নানা চড়াই-উতরাই পার করে ২০০৭ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যোগ দেন তিনি। পড়ালেখাও চালিয়ে যান। ২০১০-১১ মৌসুমে পড়ালেখা শেষ করে পুরোদস্তুর ক্রিকেটে মন দেন রাজা। যদিও আফ্রিকার দেশটিতে নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। সে সমস্যা সমাধান হতে সময় লাগে ১০ বছর। রোডেশিয়ানদের হয়ে অভিষেক হতেও তাই দেরি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে তার অভিষেক। এরপর গত কয়েক বছরে নিজেকে জিম্বাবুয়ের প্রধান ক্রিকেটার হিসেবেই গড়েছেন। বহু ম্যাচ জয়ের সাক্ষী রাজা এখন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটা জিম্বাবুইয়ানও হয়তো এখন গর্ব করে বলবেন, সিকেন্দার আমাদের দেশের ছেলে।

নিয়ম অনুযায়ী কোনো খেলোয়াড় ইনজুরি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত ফিল্ডার মাঠে নিতে পারবে না। কিন্তু নামাজের সময় কেউ আমাকে আটকায় না। একজন সাব ফিল্ডার নেওয়ার জন্য আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়। আইসিসিও আমার ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যখন নামাজের সময় হয় তখন অধিনায়ককে পাঁচ মিনিট সময় দেওয়ার জন্য বলি। তাকে শ্রদ্ধা করি এবং সে আমার ধর্ম এবং বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে।

রাজা ২০০০ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে পাড়ি জমান। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পড়াশোনা করতে। কোডিংও শিখেছিলেন পুরোপুরি। তবে সেই বিষয়টি টানছিল না, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন রাজা। স্কটল্যান্ডের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ক্রিকেটকে বেছে নিয়েছিলেন সেমি-প্রফেশনাল হিসেবে। রাজা পরে এক স্মৃতিচারণমূলক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘প্রথম কয়েক বছর আমরা ডান্ডি ও আবেরদিনে ভ্রমণ করতাম। তখন একটা ম্যাচ খেলতে পারলেই খুশি থাকতাম। স্কটল্যান্ডের একটা ক্লাবে খেলতাম, যেখানে সব সময় বাতাস থাকত, প্রচণ্ড ঠান্ডাও। সারাক্ষণ বিমান ওঠানামা করত। কিন্তু আমরা খেলার জন্যই রোমাঞ্ছিত থাকতাম।’

স্কটল্যান্ডের সেসব দিনের কথা বলতে গিয়ে রাজা জানিয়েছিলেন, তিনি সবার থেকে সাপোর্ট পেতেন। মুসলিম হিসেবে অন্য সবার মতো খুব একটা বর্ণবাদের শিকারও তাকে হতে হয়নি, ‘পেছন ফিরে তাকিয়ে খুবই খুশি। স্কটল্যান্ডে শুধু ব্যক্তিগতভাবেই না, মানুষ হিসেবেও। রোজার সময় ক্লাবগুলো খুব সম্মান দেখাত। তুমি জোরে দৌড়াচ্ছ না কেন বল ধরতে, এমন চিৎকার করে কেউ বলত না। সমীহ করত। নামাজের সময় তারা ড্রেসিং রুমে চুপচাপ থাকত। আমরা স্কটল্যান্ডে পরিবারের মতো থেকেছি। দেশটি আমাকে সবকিছু দিয়েছে।’

পাকিস্তান থেকে স্কটল্যান্ড হয়ে সবশেষ জিম্বাবুয়ে— ২০০২ সালে রাজা বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে আসেন আফ্রিকার দেশটিতে। এখানের পথটাও তার ক্রিকেটের সঙ্গে ছিল না। নানা চড়াই-উতরাই পার করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। পরের বছর নিজের জন্মভূমি পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেন প্রথম টেস্ট। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজা এখন জাতীয় দল থেকে ঘরোয়া হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন রাজার মতো, রাখছেন দৃষ্টান্ত। ধর্মভীরু ‍মুসলমান তারকা নিজেকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন ব্যাটে-বলে এবং মনুষ্যত্বেও।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কোনো এক ম্যাচে ব্যাট করছিল বাংলাদেশ। হুট করে দেখা গেল সিকেন্দার রাজা মাঠে ছাড়ছেন। কোনো চোট নেই, সমস্যাও নেই কিন্তু মাঠ ছাড়ছেন কেন রাজা? পরে জানা গিয়েছিল, নামাজ পড়তে মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি। ওই ম্যাচের পর এক প্রশ্নের জবাবে রাজা বলেছিলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী কোনো খেলোয়াড় ইনজুরি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত ফিল্ডার মাঠে নিতে পারবে না। কিন্তু নামাজের সময় কেউ আমাকে আটকায় না। একজন সাব ফিল্ডার নেওয়ার জন্য আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়। আইসিসিও আমার ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যখন নামাজের সময় হয় তখন অধিনায়ককে পাঁচ মিনিট সময় দেওয়ার জন্য বলি। তাকে শ্রদ্ধা করি এবং সে আমার ধর্ম এবং বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে।’

মুসলমান হিসেবে রাজা নিজেও গর্বিত, ‘মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়ায় আমি গর্বিত। যখনই আজান হয়, সতীর্থরা আমাকে মনে করিয়ে দেয় নামাজের সময় হয়েছে। কেউ আমাকে বলে এটা তোমার জন্য অ্যালার্ম ঘড়ি। এটা আমার বিশ্বাস এবং ধর্মের প্রতি সতীর্থদের শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ।’

যার চোখে ছিল আকাশে ওড়ার স্বপ্ন, সেই রাজা এখন দুহাত ছড়িয়ে আকাশে ওড়ার উদযাপনে মাতেন। সাড়ে তিন বছর পাকিস্তানের এয়ার ফোর্স কলেজে পড়ার স্মৃতিতে রাজা ফিরে যান বারবার কিন্তু তৃপ্ত হয়ে ফেরেন, ‘আমি হয়তো যোদ্ধা পাইলট হতে পারিনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে একজন যোদ্ধা।’শতপ্রতিকূলতা পেরিয়ে রাজা তাই কখনও ভেঙে পড়েন না। ৩৬-বর্ষী হার না মানা যোদ্ধার ভাষায়, ‘আমি বিমান বাহিনীতে ছিলাম। আমরা কখনও হার মানি না। ব্যথা পাই, আমার আঙুল ভাঙে কিন্তু এসবে আমার কোনো কিছু যায় আসে না।’

রাজার বোধ হয় কিছুতেই কিছু যায় আসে না। তাই তো তিনি ব্যাট হাতে ধসে পড়া দলকে সামাল দেন, রানের চাকাও রাখেন সচল। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বল হাতেও কাজটা তাকেও নিতে হয়। সব্যসাচী হয়ে কাজটা দারুণভাবেই করছেন সিকেন্দার রাজা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা