রমজান বিশেষ
হেলাল নিরব
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৩ ১৮:১৩ পিএম
আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৩ ১৮:২২ পিএম
সোনার চামচ মুখে জন্ম নেননি, দেখেছেন দারিদ্র্য। বাবা হারানোর যন্ত্রণা কুরে কুরে খেত তাকে। কখনও না খেয়েও থেকেছেন, পরনের কাপড়েরও ছিল অভাব। হাকিম জিয়েশ সেই সময় পেরিয়ে এসেছেন। বাবা হারানো আট ভাইবোনের সংসার আগলে রাখা মাকেই পেয়েছেন বাবার ভূমিকায়। অভিযোগ ছিল না, ছিল না আক্ষেপ। এরপর কত কিছু ঘটে গেছে। হাকিম জিয়েশ এখন বড় ফুটবলার। মরক্কোর মিডফিল্ডার পরিচয় ছাপিয়ে এখন তিনি মহানুভব। কারও প্রয়োজনে সবার আগে হাজির তিনি। হাজারো মানুষের মুখে খাবার আসে তার অর্জিত অর্থে। ফুটবলের মাধ্যমে জয় করেছেন সব। ভক্ত-সমর্থকদের কাছে মহানুভব জিয়েশ মানুষ নন, উইজার্ড— যে জাদুকরের ছোঁয়ায় বদলে যায় দারিদ্র্যের খোলনলচে।
আর পড়ুন - আবাহনী-প্রাইম ব্যাংকের জয়ের দিনে রূপগঞ্জের হার
চাইলে নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলতে পারতেন হাকিম জিয়েশ। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মায়ের দেশের হয়ে খেলবেন। সেখানেই তার তারকা হয়ে ওঠা, এরপর বিতর্ক, অবসর, এবং সবশেষ অবসর ভেঙে বিশ্বকাপে মরক্কোর ইতিহাসের নায়ক। ৩০-বর্ষী তারকার বয়সের তিন দশকও চলছে এমনভাবে। ভাগ করে বললে, প্রথম দশকে বাবা ছিলেন— সব যেন ছিল তার। পরের দশকে দারিদ্র্য দেখেছেন। বাবাহীন সংসারকে কীভাবে মা আগলে রেখেছেন দেখে বারবার অবাক হতেন। শেষ দশ বছরে জিয়েশ রেখেছেন নিজের কথা, দারিদ্র্যকে ভুলে যাননি। তাই তো কাতার বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করে পাওয়া অর্থের পুরোটা দান করেছেন দাতব্য সংস্থায়। মরক্কোর সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য তার তরফ থেকে গেছে বোনাসসহ ২ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি অর্থ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি।
আমরা অনেক গরিব ছিলাম। আমার ফুটবল খেলার জন্য মা বাড়তি কাজ করতেন, টাকা জমাতেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সব সময় সাপোর্ট করতেন, সাহস জোগাতেন। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না আমার ফুটবলার হওয়ার পেছনে তার কত শ্রম। আমি মায়ের জন্য ফুটবল খেলি
এখানেই শেষ নয়। ইংলিশ ক্লাব চেলসির হয়ে মাঝমাঠ দাপিয়ে বেড়ানো জিয়েশ মরক্কোর হয়ে খেলার পর থেকে বেতনের একটি টাকাও নেননি। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে তিনি জানতেন, ক্ষুধার কী কষ্ট। তাই যখনই পারেন মানুষকে সাহায্য করেন। বাদ যাননি তার সতীর্থরাও। কেউ তার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছেন আর তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এমন হয়নি। ২০১৫ সাল থেকে নিজেই চালাচ্ছেন একটি দাতব্য সংস্থা। মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার আনন্দ জিয়েশকে মুগ্ধ করে রাখে।
জিয়েশের বাবা নেদারল্যান্ডসের, মা মরোক্কান। অষ্টম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন জিয়েশ। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তার ছোটবেলা থেকেই। ড্রন্টন শহরে সন্ধ্যা পর্যন্ত বড় ভাই ফাউজির সঙ্গে স্ট্রিট ফুটবল খেলতেন। জিয়েশের বয়স যখন ১০ বছর, তখন তার বাবা মারা যান। আর্থিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে যায় পরিবারটি। পরিবারের অভাব-অনটনের মুখেও নিজের স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হননি জিয়েশ। যে বয়সে বই হাতে স্কুলে দৌড়াবার কথা, সেই বয়সে জিয়েশ মাঠে নামেন বল-পায়ে। তার চোখে প্রফেশনাল ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন, পরিবারের আর্থিক অভাব ঘুচিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন।
জিয়েশ বলেছিলেন, ‘যখন আমার ১০ বছর তখন বাবাকে হারিয়েছি। বাবা যেদিন মারা গেলেন সেদিনের কথা ভুলব না। মা তার বিছানার পাশে বসেছিলেন। খুব সকাল তখন। পরিবারের সবাই চিৎকার করে উঠলেন। আমি বুঝলাম বড় সম্পদ হারিয়ে ফেলেছি।’
মরক্কোর নায়ক বনে যাওয়া জিয়েশের পরিবারে দারিদ্র্য তারও আগে থেকে শুরু। সেইসব দিন এখনও মনে করেন তিনি, আর যতটা সম্ভব মানুষকে সাহায্য করেন- ‘আমরা অনেক গরিব ছিলাম। আমার ফুটবল খেলার জন্য মা বাড়তি কাজ করতেন, টাকা জমাতেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সব সময় সাপোর্ট করতেন, সাহস জোগাতেন। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না আমার ফুটবলার হওয়ার পেছনে তার কত শ্রম। আমি মায়ের জন্য ফুটবল খেলি।’
জিয়েশ শুধু তার মায়ের জন্যই নয়, দেশের জন্যও ফুটবল খেলছেন। মুসলিম হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ইউরোপে। বাবার দেশ নেদারল্যান্ডসের ক্লাব আয়াক্সে খেলার সময় একবার রোজা রেখে ফুটবল খেলেছিলেন জিয়েশ। সমালোচিত হন খুব। কিন্তু টটেনহ্যামের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই ম্যাচটিতে গোল করেছিলেন। এরপর প্রায়ই রোজা রেখে খেলে শিরোনাম হন জিয়েশ। মরক্কোর হয়ে বড় বড় দলকে হারিয়ে দিয়ে সতীর্থদের নিয়ে একযোগে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, রবের প্রশংসায়। তবে জিয়েশ যতটা না মুসলিম হিসেবে পরিচিত, তারচেয়ে বেশি মানুষ হিসেবে। তার মনুষ্যত্ব এবং মানবিকতা অবাক করে দেয়। সেই কারণেই তাকে আয়াক্সের সমর্থকরা ভালোবেসে নাম দিয়েছিলেন ‘উইজার্ড’।
মাঝমাঠে দাপিয়ে বেড়ানো সেই জাদুকর পায়ের জাদুতে যেমন বল বানিয়ে দিতেন বা কখনও গোল করে দলকে সাহায্য করতেন; তেমনি মাঠের বাইরেও তার জাদুতে মুগ্ধ মানুষ। তার অর্থে খাবার আসে হাজারো দুস্থ মানুষের মুখে। হাকিম জিয়েশ উইজার্ড বটে!