আপন তারিক
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৩৮ এএম
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৩ ১৭:২১ পিএম
৭০ পেরোনো এক তরুণ তিনি। সারাক্ষণই চনমনে, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। সেই মানুষটিকেই কিনা টেলিফোনের অন্য প্রান্ত থেকে কেমন নিষ্প্রাণ লাগছিল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে! বড্ড অচেনা মনে হচ্ছিল রকিবুল হাসানকে! অথচ এই সময়টাতে তিনিই হতে পারতেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের একজন। গেল মাসেই পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার। দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের আনন্দে যখন ভেসে যাচ্ছেন তখনই কিনা তার জীবনে বিনা মেঘে বজ্রপাত!
সন্তানের দুঃসংবাদ যখন ভেসে আসে, তখন কী আর বাবা স্থির থাকতে পারেন? বীর মুক্তিযোদ্ধা, ক্রিকেটার, ম্যাচ রেফারি, বর্ণিল ক্রীড়াব্যক্তিত্ব রকিবুল হাসানের ছেলে সাজিদ হাসান ক্যানসারে আক্রান্ত। আশি-নব্বইয়ের দশকের ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটের খবর যারা রাখতেন তাদের কাছে সাজিদ হাসান নামটা বেশ পরিচিত। জাতীয় দলের হয়ে কয়েকটা ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন। সেই সাবেক ক্রিকেটারটি এখন পরবাসী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডা এই দুই দেশেই তার বসবাস। সেখান থেকেই সন্তানের দুঃসংবাদটি শুনেছেন রকিবুল।
সাজিদ নিজেও এখন বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় আছেন। সাত দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। ডাক্তারের কাছে যেতেই আচমকা দুঃসংবাদ শুনলেন। নিজেই ফেসবুকে জানালেন-প্রোস্টেট ক্যানসারের দ্বিতীয় ধাপে তিনি! লড়ছেন এখন অন্য এক লড়াইয়ে।

নিজের স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির এই সময়ে ছেলের এই দুঃসংবাদে ভেঙে পড়াটাই স্বাভাবিক। গতকাল রবিবার দুপুরে রকিবুল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলছিলেন, ‘আমরাও জানতাম না। ও কয়েক দিন আগে থেকেই জানাচ্ছিল শরীরটা খারাপ। এরপর ডাক্তারের কাছে চেকআপে যেতেই দুঃসংবাদ পেল- রিপোর্ট মিলল ও ক্যানসারে আক্রান্ত!’
আমি আর ও একসঙ্গে মাঠে খেলেছি। জুটি বেঁধেছি। ও ফাইটার। এটা ঠিক আমরা মানসিকভাবে চিন্তিত, বিচলিত। ওর চিকিৎসা চলছে কানাডায়। দেখা যাক কী হয়। ওখানে কিছু করা না গেলে এখানে এনে কিংবা চেন্নাইয়ে নিয়ে চিকিৎসা করানোর পরিকল্পনা আছে’
অনেক দিন ধরেই দূর পরবাসে আছেন ক্রিকেটার রকিবুলের ছেলে সাজিদ। স্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। নিজেও গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে কাজ করেন। ২০০০ সাল থেকেই ইমিগ্রেন্ট। দুই মেয়ে-স্ত্রী নিয়ে সুখের সংসার তার। এমন হাসিখুশি জীবনে হঠাৎ দুশ্চিন্তার কালো মেঘ!
গোটা জীবন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাটানো রকিবুল তার ছেলের সঙ্গে বন্ধুর মতোই মেশেন। একসঙ্গে দুজন ক্রিকেট মাঠেও ব্যাটিংয়ে নেমেছেন। ১৯৯১-৯২ মৌসুমে প্রথম বিভাগ লিগে রকিবুল ছিলেন ভিক্টোরিয়ার অধিনায়ক। তখন উদিতি ক্লাবের অধিনায়ক পুত্র সাজিদ হাসানের প্রতিপক্ষ হিসেবে টস করতেও নেমেছিলেন তিনি। একই ম্যাচে পিতা-পুত্রের খেলার পাশাপাশি দুই দলের অধিনায়ক হিসেবে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা দারুণ আনন্দময় ও ব্যতিক্রমী!
আরও পড়ুন :
এখানেই শেষ নয়, ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে দামাল সামার ক্রিকেটে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে বাবার সঙ্গে ব্যাটিং ওপেন করতে নেমেছিলেন সাজিদ। নাভানা প্রিমিয়ার লিগেও একই দলে খেলেছেন বাবা-ছেলে। এরপর ১৯৯৪ সালে আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলেন সাজিদ। যদিও জাতীয় দলে ক্যারিয়ারটা দীর্ঘ হয়নি তার!
ক্রিকেট মাঠে অনেক ম্যাচ জেতা সাজিদ হাসান নিশ্চয়ই এই ‘জীবন ম্যাচেও’ জিতবেন
বন্ধুর বেড়ে ওঠার মতো এই সন্তানের দুর্দিনে বিচলিত বাবা। রকিবুল বলছিলেন, ‘আমি আর ও একসঙ্গে মাঠে খেলেছি। জুটি বেঁধেছি। ও ফাইটার। এটা ঠিক আমরা মানসিকভাবে চিন্তিত, বিচলিত। ওর চিকিৎসা চলছে কানাডায়। দেখা যাক কী হয়। ওখানে কিছু করা না গেলে এখানে এনে কিংবা চেন্নাইয়ে নিয়ে চিকিৎসা করানোর পরিকল্পনা আছে!’
৪৬ বছর বয়সি ছেলের কথা বলতে গিয়ে বাক্য জড়িয়ে আসছিল রকিবুলের। এমন আচমকা দুঃসংবাদ সামাল দেওয়া সহজ নয়। ফোন রাখার আগে উদ্বিগ্ন এক বাবার ছোট্ট আর্তি, ‘আমার সন্তানের জন্য দোয়া করো সবাই।’
ক্রিকেট মাঠে অনেক ম্যাচ জেতা সাজিদ হাসান নিশ্চয়ই এই ‘জীবন ম্যাচেও’ জিতবেন।