রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৭:৩৪ পিএম
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৮:০৯ পিএম
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়। ২০০৩ সালে মালদ্বীপকে হারিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে বাংলাদেশ। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন রজনী কান্ত বর্মণ। কিন্তু পরপর দুটি হলুদ কার্ডের কারণে ফাইনালের আগে হোটেলে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন রজনী।
রক্ষণে বুক পেতে সামলানো রজনী কান্ত বর্মণের সেদিনের কান্নায় সতীর্থরাও কেঁদেছিলেন, পেয়েছিলেন আত্মবিশ্বাস। সেই রজনীর চোখে এখনও কান্না, কিন্তু দেখার কেউ নেই। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের পিঙ্গাবহ গ্রামের নির্জনতায় কাটছে তার মানবেতর জীবন। এক বছর আগে ভারতের হুগলিতে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে প্রায় পঙ্গুত্ববরণ করেন রজনী।
চিকিৎসা করেও সম্পূর্ণ সুস্থ হননি। সংসার ও মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে বাড়িঘর ও জমিজমা যা কিছু সঞ্চয় ছিল, একে একে বিক্রি করে এখন শেষ পর্যায়ে। দেশকে সেরা সোনালি সাফল্য এনে দিলেও বাফুফে রজনীর খোঁজ-খবর রাখেনি।
আরও পড়ুন-
যা বলছেন তার সতীর্থ ও খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতি
মঙ্গলবার সকালে রজনীর গ্রামের বাড়ি গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ১৯৯৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ফুটবলের সঙ্গে ছিলাম। আমার স্ত্রী ও দুটি মেয়ে ভারতের হুগলিতে থাকে। অবসরে মাঝেমধ্যে তাদের কাছে গিয়ে থাকতাম। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে হুগলিতে মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে আরেকটা মোটরসাইকেল ধাক্কা দিলে ছিটকে পড়ে যাই। তখন একটি প্রাইভেটকার পায়ের ওপর দিয়ে উঠিয়ে দেয়। এতে মারাত্মক আহত হই। ব্যয়বহুল চিকিৎসার পরেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছি না। আয় না থাকায় পরিবার ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গাজীপুরের মৌচাকে থাকা ৬ শতাংশ জমি ও দোতলা একটি বাড়ি বিক্রি করে দেই। কষ্টের বিষয়, আমি চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসার দুই মাস পর খবর পেলাম আমার স্ত্রীও মারা গেছে। এতে জীবন আরও এলোমেলো হয়ে যায়। এখন আমার মেয়ে ঋত্তিকা বর্মণ ও মহিমা বর্মণ এতিম হয়ে গেছে। আমিও হাঁটাচলা তেমন করতে পারি না বলে ওদের কাছে যেতে পারি না। কিন্তু ওদের পড়াশোনার খরচ দিতে হয়। গ্রামে পৈতৃক সম্পত্তি যা ছিল তাই বিক্রি করে চলছে জীবন। বাফুফে এবং সাবেক ক্লাবের কেউই আমার খবর রাখেনি। তবে আমার এ দুরবস্থার মধ্যে সাবেক কয়েকজন সতীর্থ ফুটবলার খোঁজখবর নিয়েছে।
কালিয়াকৈরবাসীর অহংকার ও গর্বের নাম রজনী। অনেক ফুটবল খেলোয়াড় তাকে আইকন হিসেবে দেখতেন। প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা রজনীর শুরুটা কঠিন ছিল। গ্রামে গ্রামে আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে ফুটবল খেলতেন। নানা সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এক সময় সেরার সেরা হয়ে ওঠেন রজনী। ১৯৯৩ সালে ভালো খেলা উপহার দিয়ে তিনি পাইওনিয়র লিগে লালবাগ আর বয়েজের হয়ে শুরু করেন ক্যারিয়ার। এরপর তিনি মোহামেডান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, আবাহনী ও শেখ রাসেল ক্লাবে খেলেছেন।
এলাকাবাসী বলেন, রজনী আমাদের এলাকা ও দেশের গর্ব। তার এ দুর্দিনে ফুটবল ফেডারেশন থেকে তাকে সহযোগিতা করা দরকার। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমাদের গাজীপুরের সন্তান। যথাযথ মাধ্যমে খবরটা পৌঁছালে হয়তো তিনি সহযোগিতা করতে পারেন। এছাড়া তার বাড়িতে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটির কী অবস্থা তা না দেখলে বোঝা কঠিন। একে তো কাঁচা সড়ক তাও বেহাল দশা। শুষ্ক মৌসুমে সে সড়ক দিয়ে কোনো রকমে চলাচল করা গেলেও বর্ষা মৌসুমে একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। যারা দেশের সুনাম বয়ে আনে যুবক বয়সে, অন্তত শেষ সময়ে কিংবা বিপদের সময় রাষ্ট্রের বা সরকারি সহযোগিতা তাদের পাশে থাকা উচিত। তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হলে তরুণ প্রজন্ম দেশের জন্য নতুন কিছু করার সাহস পাবে।
রজনী কান্ত বর্মণের বৃদ্ধ মা বলেন, আমার ছেলেকে অনেক শাসন করার পরও ফুটবল ছাড়েনি। এত বড় খেলোয়াড় ছিল ছেলে আমার, অথচ এখন বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ বিক্রি করে চলতে হচ্ছে। বৃদ্ধ বয়সে ছেলের মুখে হাসি না দেখে তাকেই টানতে হচ্ছে আমার।
রজনী বর্মণ বলেন, ফুটবল ছিল আমার নেশা। দেশের জন্য খেলা, জয় এগুলোর আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা নেই। যখন রাস্তায় বের হই, মানুষ অনেক সম্মান দেয়। উপরওয়ালার লিখনে এখন আমি পঙ্গু। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়াতাম সেই আমি এখন একটু হাঁটলে পা অবশ হয়ে যায়। আমার চাওয়া এখন একটাইÑ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী যদি আমাকে কিছুটা সাহায্য করতেন তবে বাকি জীবনটা অসহায় মানুষের মতো থাকতে হতো না। জীবনে বাকি সময়টুকু সচ্ছলভাবে চলার একটা ব্যবস্থাই এখন আমার প্রয়োজন।