× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শুধু ভাবতাম, মাঠে মুন্নাভাই আছেন আর চিন্তা কিসের?

কৃষ্ণেন্দু রায়

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১০:০২ এএম

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:০৭ পিএম

শুধু ভাবতাম, মাঠে মুন্নাভাই  আছেন আর চিন্তা কিসের?

মোনেম মুন্না সম্পর্কে লিখতে বসে মান্না দে’র গানের একটা লাইন আমার মনে পড়ছে। গুনগুন করে গাইছি— ‘যদি হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে।’ গানের এই লাইনগুলো বোধহয় মোনেম মুন্নার জন্যই লেখা। মুন্নাভাই আমার, কলকাতার এবং বাংলাদেশের হৃদয় জুড়ে রয়েছেন। ওর কথা ভাবতে বসে এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি যে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। স্মৃতিরা সব ভিড় করছে। আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই ফেলে আসা দিনগুলোয়। 

বহির্জগতের কাছে তিনি মোনেম মুন্না। আমার কাছে মুন্নাভাই। আমার বাটানগরের বাড়িতে গিয়েছেন। আমার সঙ্গে বসে খেয়েছেন। কোনো সময়েই মনে হয়নি প্রতিবেশী দেশের এক ফুটবলার খেলতে এসেছেন অচেনা এক ভূমিতে। অপরিচিত এক ক্লাবে। খুব সহজ সরল এক মানুষ। সবুজ মাঠে যার দুটো পা কথা বলত। তার উপস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করত, সাহস জোগাত, নির্ভরতা দিত। আমরা মনে করতাম, মুন্নাভাই আছেন যখন, তখন আর চিন্তা কীসের।  

দু’বছর ইস্টবেঙ্গলে খেলার পর ১৯৯০ সালে আমি মোহনবাগানে সই করি। তার ঠিক পরের বছরই মোহনবাগান ছেড়ে চলে আসি ইস্টবেঙ্গলে। আর সেই বছরই বাংলাদেশ থেকে ইস্টবেঙ্গলে এলো থ্রি মাস্কেটিয়ার্স— রুমি-মুন্না-আসলাম।

একটু প্রসঙ্গান্তর ঘটাই। আমার সঙ্গে বাংলাদেশের একটা অদ্ভুত যোগাযোগ রয়েছে। ভারতের জার্সিতে আমার প্রথম টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে। কবীর সুমনের গানের কথা একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলি, বাংলাদেশ জানে আমার প্রথম সবকিছু। ১৯৭৯ সালে এশিয়ান ইয়ুথ খেলতে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর দেশে। ১৯৮৫ সালের সাফ গেমসে বাংলাদেশকে হারিয়ে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। খেলা গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। টাইব্রেকারে প্রথম গোল আমার ছিল। রুমি-মুন্না-আসলামসহ নামি ফুটবলাররা খেলেছিলেন বাংলাদেশের হয়ে। ফলে ইস্টবেঙ্গলে আসার পরে বাংলাদেশের ‘ত্রয়ী’র সঙ্গে আমার পরিচয় এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। কলকাতায় বসেই শুনতাম তিনজনের অসাধারণ ফুটবল দক্ষতার কথা। তিন ফুটবলার তিন ধরনের। রুমি শিল্পী প্লেয়ার। গোল চেনে আসলাম। গোলের পর গোল করে চলেছে ও। আর মুন্নাভাই যেকোনো দলের হৃৎপিণ্ড। 

আরও পড়ুন: ও বলত তার দুটো সংসার প্রথমে ক্লাব, পরেরটা আমাকে নিয়ে সাজানো

ইস্টবেঙ্গলেও মুন্নাভাই ছিলেন মাঝমাঠের ব্রিগেডিয়ার। ’৯১ সালে ইস্টবেঙ্গলের কোচ সৈয়দ নইমুদ্দিন। সেই বছরই মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য লাল-হলুদ ছেড়ে চলে যান মোহনবাগানে। স্টপারে তরুণ দে ও স্বরূপ দাসকে দাঁড় করান নইমদা। মুন্নাভাইয়ের জায়গা হলো মাঝমাঠ। নইমদা বিচক্ষণ কোচ। তাই রত্ন চিনতে ভুল করেননি। বলতে কোনো দ্বিধা নেই, মুন্নাভাই হৃদয় দিয়ে ফুটবল খেলতেন। আর আমি বিশ্বাস করি বুকের বাঁ দিক দিয়ে যদি কেউ কিছু করে, তাহলে তা সব সময়ই দৃষ্টিনন্দন হয়। তা সবার নজর কেড়ে নেয়। সেই কারণেই মুন্নাভাই খুব অল্প দিনের মধ্যেই ইস্টবেঙ্গল জনতার মনের রাজা হয়ে উঠেছিলেন। অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিলেন। এই তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা পেয়েও মুন্নাভাইয়ের মাথা কিন্তু ঘুরে যায়নি। ওর সঙ্গে খেলতে খেলতে একটা কথাই আমার মনে হয়েছিল, মুন্নাভাই যেকোনো দলের সম্পদ। এ রকম ইউটিলিটি ফুটবলার যদি কোনো দলে থাকে, তাহলে সেই দলকে রোখে কার সাধ্যি! ’৯১ সালে ইস্টবেঙ্গল দল বেশ ভালো ছিল। সাফল্যও পেয়েছিল ক্লাব। আর সেই সাফল্যের অন্যতম কান্ডারি মুন্নাভাই। 

একেকজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। মুন্নাভাই সে রকমই একজন খেলোয়াড় ছিলেন। মাঝমাঠে যখন দাঁড়াতেন, তখন মনে হতো রাজা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। খেলা শুরু হলে মুন্নাভাই জাদু দেখাতে শুরু করতেন। দুটো উইংকে বল সরবরাহ করে জীবন্ত করে রাখতেন। বল ডিস্ট্রিবিউশন খুব ভালো ছিল। জোরালো শট নিতে পারতেন। বল কন্ট্রোল খুব ভালো ছিল। সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন মুন্নাভাই। যেকোনো পজিশনে খেলতে পারতেন। আমাকে অনেকেই বিভিন্ন সময়ে জিজ্ঞাসা করেছেন মুন্নাভাইয়ের সেরা ম্যাচ কোনটা? আমি উত্তর দিতে পারিনি। মুন্নাভাই কোন ম্যাচ খারাপ খেলেছিলেন, সেটাই তো আমি মনে করতে পারি না। ওর খেলার ধরন আমাদের সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের মতো। গোটা মাঠ জুড়ে খেলা। 

আরও পড়ুন: যে ভোরে শেষবার আবাহনী প্রাঙ্গণে মুন্না!

এ তো গেল ফুটবলার মুন্নাভাইয়ের কথা। এত নম্র, ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের ফুটবলার আমি খুব কমই দেখেছি। ওকে দেখে মনে হতো ঘরের ছেলে। যে খাবার আমি খাই, সেই খাবার ও খায়। কোনো টালবাহানা নেই। এহেন মানুষটা যে এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে, আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন তা কল্পনাও করতে পারিনি। ওর অসুস্থতার খবর পেয়ে ফোন করেছিলাম। কথা হয়েছিল সুরভী বৌদির সঙ্গে। দুঃসংবাদটা যেদিন শুনেছিলাম, সেদিন নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে বিশ্বাস করতে পারিনি। মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়েছিলাম। মুন্নাভাইয়ের সঙ্গে আমার দারুণ বন্ধুত্ব ছিল। আসলামভাইয়ের সঙ্গেও আমার ভালো সম্পর্ক। এখনও মাঝে মাঝে যোগাযোগ হয় আসলামভাইয়ের সঙ্গে। মুন্নাভাইয়ের প্রসঙ্গ উঠলে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। মুন্নাভাইকে নিয়ে এই আবেগ, মন হু হু করা অনুভূতির কারণ আমি উপলব্ধি করতে পারি। একবার ওকে যে দেখেছেন, তিনি কোনো দিনই ভুলতে পারবেন না। মনের মানুষকে কি ভোলা যায়? 

বাংলাদেশে আমি একাধিকবার গিয়েছি। প্রেসিডেন্টস গোল্ডকাপ খেলেছি সেই দেশে। সাফ গেমস, এশিয়ান ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রদর্শনী ম্যাচ গিয়ে খেলে এসেছি। অনেক ভালোবাসা পেয়েছি বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে। ইদানীং যাওয়া হয়নি। বাংলাদেশ যাওয়ার সুযোগ এলে, একবার অন্তত মুন্নাভাইয়ের বাড়ি যাবই। দেখে আসব এক ক্ষণজন্মা ফুটবলারের শিকড়।

কৃষ্ণেন্দু রায় : প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার ও ইস্টবেঙ্গলে মোনেম মুন্নার সতীর্থ


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা