ফ্রান্সের সাথে জয়ের প্রত্যাশা লামিন ইয়ামালের। ছবি: সংগৃহীত
নান্দনিক ফুটবলে বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ যাত্রা থামিয়ে দিয়েছে শিরোপা প্রত্যাশী স্পেন। সোনালি ট্রফি ছোঁয়ার পথে এগিয়ে স্পেনের সামনে সেমিতে বড় বাঁধা ফ্রান্স! দুর্দান্ত ছন্দে থাকা এমবাপ্পেদের বিপক্ষে জিতলেই ফাইনাল!
সেমির আগে অতীতের দুই জয়ের স্মৃতি উজ্জীবিত করছে স্পেনকে। শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে, একই সুর তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের কণ্ঠেও। আগামী ১৫ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ডালাসে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই পরাশক্তি স্পেন ও ফ্রান্স।
বিশ্ব ফুটবলের দুই অন্যতম সফল দলের এই লড়াইকে অনেকেই আগাম ফাইনাল হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। দুই দলই পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে এবং শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকলেও আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই স্পেন শিবিরে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন। ম্যাচটিতে শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। শেষ পর্যন্ত লড়াই করে জয় তুলে নিয়ে ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠে তারা। অন্যদিকে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স। দিদিয়ের দেশমের দলও পুরো আসরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়ে নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রমাণ করেছে।
দুই দলই শিরোপার বড় দাবিদার হলেও টুর্নামেন্টে তাদের যাত্রার শুরু ছিল একেবারেই ভিন্ন। ফ্রান্স গ্রুপপর্বে শতভাগ জয় নিয়ে নকআউট পর্বে ওঠে এবং প্রতিটি ম্যাচেই নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দেয়। স্পেনের শুরুটা ছিল হতাশাজনক। নবাগত কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে সমালোচনার মুখে পড়েছিল ইউরো চ্যাম্পিয়নরা। তবে সেই ধাক্কা সামলে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় তারা। নকআউট পর্বে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে স্প্যানিশরা। স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে মনে করেন, ফ্রান্স নিঃসন্দেহে শক্তিশালী দল হলেও তাদের হারানোর মতো মান ও সামর্থ্য স্পেনের রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক অতীতের সাফল্য তার দলকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করেছে। দে লা ফুয়েন্তে বলেন, “ফ্রান্স অসাধারণ একটি দল এবং তারাও এই টুর্নামেন্টে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। আমরাও ভালো খেলছি। এটি এমন একটি ম্যাচ, যেখানে যে কেউ জিততে পারে। তবে আমরা জানি, ফ্রান্সকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে। অতীতেও তাদের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জিতেছি, সেটি আমাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে”।
গত তিন বছরের মধ্যে এটি হবে স্পেন ও ফ্রান্সের তৃতীয় মুখোমুখি লড়াই। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে এবং ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে ফরাসিদের হারিয়েছিল স্পেন। তাই পরিসংখ্যানও স্প্যানিশদের পক্ষেই কথা বলছে। অবশ্য অতীতের ফলাফলে ভরসা না করে বর্তমান ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন দে লা ফুয়েন্তে। তিনি বলেন, “সেমিফাইনাল মানেই ভিন্ন চাপ, ভিন্ন আবেগ এবং ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। আগের অভিজ্ঞতা অবশ্যই কাজে লাগবে। কিন্তু এবারও কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। জয় পেতে হলে আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শতভাগ প্রস্তুত থাকতে হবে এবং নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে হবে”।
কোচের মতো একই আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়েছে স্পেনের তরুণ ফরোয়ার্ড লামিন ইয়ামালের কণ্ঠেও। বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করার পর ফ্রান্সকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “যদি কাউকে ভয় পেতে হয়, তাহলে ফ্রান্সেরই আমাদের ভয় পাওয়া উচিত। আমরা আগেও তাদের দুইবার হারিয়েছি। আমার বিশ্বাস, এই বিশ্বকাপের সেরা দুই দলই মুখোমুখি হচ্ছে। কী হবে, সেটা মাঠেই দেখা যাবে। তবে আমাদের কোনো ভয় নেই”। ১৭ বছর বয়সী ইয়ামাল আরও মনে করেন, স্পেনের পারফরম্যান্স শুধু স্কোরলাইন দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। প্রতিপক্ষের রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণে অনেক সময় তাদের আধিপত্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। তিনি বলেন, “অনেকের মনে হতে পারে আমরা খুব ভালো খেলছি না। কিন্তু প্রতিটি দল আমাদের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলছে। কেউই সমানে-সমান লড়াই করতে আসছে না। তারপরও আমরা ম্যাচ জিতছি। দিন শেষে জয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ”।
তিনি আরও বলেন, “আমরা সেমিফাইনালে উঠতে পেরে ভীষণ খুশি। অনেক বছর পর এই পর্যায়ে ফিরেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য শুধু ফাইনালে ওঠা নয়, শিরোপা জিতেই দেশে ফেরা”। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারই প্রথম ফাইনালে ওঠার সুযোগ পেয়েছে স্পেন। অন্যদিকে ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। গত আসরে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে রানার্সআপ হয়েছিল দেশমের দল। ফলে এবারের আসরে সেই আক্ষেপ ঘুচানোর মিশনও থাকবে ফরাসিদের সামনে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এই সেমিফাইনাল। একদিকে সাম্প্রতিক সাফল্যে উজ্জীবিত স্পেন, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা, গভীর স্কোয়াড ও ধারাবাহিকতায় এগিয়ে থাকা ফ্রান্স। দুই ইউরোপীয় শক্তির এই মহারণে যে দল চাপ সামলে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তারাই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে।
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন...