অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে নতুন উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোর জন্য টার্নওভার ট্যাক্স বা ব্যবসায়িক লেনদেনের ওপর কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের করছাড়ের পরিকল্পনা করছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে নতুন উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোর জন্য টার্নওভার ট্যাক্স বা ব্যবসায়িক লেনদেনের ওপর কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিদ্যমান সাড়ে ৭শতাংশ উৎসে কর বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের এমন পদক্ষেপে দেশের প্রযুক্তি খাতের চিত্র আমূল বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বার্ষিক ১০০ কোটি টাকার নিচে লেনদেন করা নতুন ও উদ্ভাবনী ব্যবসাগুলোকে স্টার্টআপ হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশে বর্তমানে ১ হাজার ২০০-এর বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ রয়েছে, যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানকে তাদের মোট বিক্রির ওপর ০.৯ শতাংশ হারে টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়, যা ব্যবসায় লাভ হোক বা না হোক প্রদান করা বাধ্যতামূলক। প্রস্তাবিত বাজেটে এই কর বিলোপ করা হলে পাঠাও, সহজ কিংবা ডালডালের মতো উদীয়মান প্রতিজনগুলো বড় ধরনের তআর্থিক স্বস্তি পাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রযুক্তি খাতের বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার কথা মাথায় রেখে এই বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ সাজানো হচ্ছে। আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত মাসে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নীতিগত সিদ্ধন্তগুলো ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে উদ্যোক্তারা তাদের আয়ের টাকা কর হিসেবে না দিয়ে ব্যবসার প্রসারে পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারবেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে কেবল স্টার্টআপ নয়, সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ কমানোর ইঙ্গিতও রয়েছে। মোবাইল ফোনে কথা বলা, খুদেবার্তা পাঠানো এবং ডাটা প্যাকেজ ব্যবহারের ওপর বিদ্যমান ১২ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এছাড়া সিম কার্ড বিক্রির ওপর বর্তমানে যে ৩০০ টাকা নির্দিষ্ট ফি রয়েছে, তার পরিবর্তে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব আসতে পারে। এর ফলে টেলিকম সেবার বায় সাধারণ গ্রাহকের নাগালে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা সরকারের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাগত জানিয়েছেন। বেসিসের সাবেক সভাপতি একেএম ফাহিম মাশরুর মনে করেন, টার্নওভার ট্যাংক্স তুলে দিলে একদম প্রাথমিক পর্যায়ের কোম্পানিগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে সুবিধা পাবে। ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর প্রতিষ্ঠাতা রাইসুল কবিরের মতে, কর কাঠামো সহজ হলে উদ্যোক্তারা ট্যাক্স ফাইল গোছানোর চেয়ে পণ্য উদ্ভাবন ও ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর দিকে বেশি মনোনিবেশ করতে পারবেন। তবে পাঠাও-এর প্রধান নির্বাহী ফাহিম আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, স্টার্টআপের যোগ্যতা নির্ধারণের শর্তগুলো যেন খুব কঠিন না হয়, যাতে বড় আকারের লেনদেন করা প্রতিষ্ঠানগুলোও এই সুবিধা ভোগ করতে পারে।
এদিকে বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিলগ (এসএমই) খাতের জন্য বাড় ঘোষণা আসতে পারে। বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা ক্ষুদ্র উদ্যোক্রনদের আয়করমুক্ত রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এ মাড়া ঢাকার বাইরে শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন ও শ্রীড়া অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের যন্ত্রপাতির দামের ৬০ শতাংশ প্রথম বছরেই খরচ হিসেবে দেখাতে পারবেন, যা তাদের করের বোনা কমিয়ে দেবে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, আগামী বাজেটে প্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগকে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা। রাখবে। করের বোঝা লামার হওয়ার পাশাপাশি যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উৎসে কর কর্তনের নিয়মগুলো আরও সহজ করা যায়, তবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী টেক-হাবে পরিণত হওয়ার পথে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।