আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এক বাজেট পেশ করার প্রস্তুতি শেষ করেছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার এই বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন। অর্থমন্ত্রী তার প্রথম বাজেটের শিরোনাম করেছেনÑ ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে (২০২৫-২৬) তাতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৩৪ হাজার কোটি টাকা। সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ প্রস্তাব করা হয়েছে। যার পরিমাণ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। এই প্রথম কোনো সরকার স্বাস্থ্য খাতে এত বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করল। মূলত গ্রামীণ স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান উন্নত করতে বরাদ্দ বেশি রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৪টি জেলা শহরে হেলথ কার্ড পরীক্ষামূলকভাবে প্রচলন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শিক্ষা খাতেও এবারের বাজেটে বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ আছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে এ বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
তবে বিশাল এ বাজেটে রয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার বিশাল এক ঘাটতি। এই বিশাল অঙ্কের ঘাটতি মেটাতে সরকার মূলত দুটি প্রধান উৎসের ওপর নির্ভর করছেÑ বৈদেশিক ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিশেষত বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৮৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাজেটের একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা।
অর্থ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ঘাটতির সীমা ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরামর্শ দেয়। সেই বিবেচনায় ঘাটতির হার কাগজ-কলমে নিয়ন্ত্রিত মনে হলেও এর অর্থায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির ৪৬ শতাংশ বা জিডিপির ১.৭ শতাংশ অর্থায়ন করা হবে বিদেশি উৎস থেকে। বাকি ৫৪ শতাংশ সংস্থান করা হবে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং সঞ্চয়পত্র থেকে।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত বাজেট সহায়তা না পাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। মে মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এই লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম অর্থাৎ মাত্র ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বৈদেশিক অর্থায়ন ছাড় হয়েছে। এই বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান প্রশাসনে স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর আস্থা ফেরাতে সাহায্য করবে।
বিগত সরকারের পতনের আগের সর্বশেষটির তুলনায় আসন্ন বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ৬৬ শতাংশ বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে থমকে যাওয়া মেগা প্রকল্পগুলো এতে পুনরায় গতিশীল হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক নিখোঁজ কিংবা অপসারিত হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, ক্রমেই তা কাটতে শুরু করেছে। নতুন সরকার পূর্ণাঙ্গ একটি অর্থবছর হাতে পাওয়ায় দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা জোরদার করেছে। বিশেষ করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক এবং জাপান থেকে বড় অঙ্কের অর্থছাড়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের পথে বাধা কম নয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বর্তমান অর্থবছরে বিদেশি অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা, কেনাকাটায় দেরি এবং দাতা সংস্থাগুলোর কঠিন শর্তাবলি দায়ী। তিনি জানান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উন্নয়ন সহযোগী অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তার মতে, বিদেশি অর্থায়ন বাড়াতে হলে দাতাদের আস্থা পুনর্গঠন করা জরুরি। বর্তমান সরকার অনেক স্থবির প্রকল্প পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিলেও দাতা সংস্থাগুলোর শর্ত পূরণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ ছিল গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এমনকি আইএমএফের দুটি কিস্তির ১.৫৩ বিলিয়ন ডলার শর্তপূরণে ব্যর্থতার কারণে স্থগিত হয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের চলমান প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া এডিবি থেকে ১ বিলিয়ন ডলার, জাপান থেকে ৩১৫ মিলিয়ন ডলার এবং এআইআইবি থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আগামী বছরের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
এদিকে বিদেশি ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। ঘাটতি মেটানোর এটিই হবে বড় উৎস। অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, সরকার যদি ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। একে অর্থনীতির ভাষায় ‘ক্রাউডিং আউট’ ইফেক্ট বলা হয়। বেসরকারি খাত বিনিয়োগের জন্য ঋণ না পেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কিছুটা কম থাকলেও স্থিতিশীলতা ফিরলে সঙ্গত কারণেই চাহিদা বাড়বে। তখন ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে।
সঞ্চয়পত্র থেকেও সরকার ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে উচ্চ সুদের দায় এড়াতে এই খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে কমিয়ে আনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা ১৯ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের বিদেশি ঋণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে চায়, কারণ অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহার অনেক বেশি, যা সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বিদেশি ঋণের ব্যবহার ছিল মাত্র ৩২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা কম। এই ধীরগতির মূল কারণ হিসেবে নতুন ক্রয় আইন এবং মন্ত্রণালয়গুলোর প্রশাসনিক স্থবিরতাকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনেক প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করছে। যেসব প্রকল্প জনস্বার্থে কম গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো বাদ দিয়ে উন্নয়নমূলক কাজে গতি আনার চেষ্টা চলছে। এতে আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবার কথা মাথায় রেখে বাজেট হচ্ছে: অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের প্রত্যেকটি মানুষের কথা মাথায় রেখে এবারের বাজেট দেওয়া হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার আগে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যাওয়ার প্রাক্কালে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশের প্রত্যেক নাগরিককে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কাউকে বাইরে রাখা হবে না। তাদের সুবিধা-অসুবিধা এবং জীবনযাত্রার মানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদের তুলনায় বাজেটে সবার সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনা করা হয়েছে।