ড. মো. সহিদুজ্জামান
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৪ ঘণ্টা আগে
ড. মো. সহিদুজ্জামান। ফাইল ছবি
সকালের কুয়াশায় তখনও কাঁপছে সুনামগঞ্জের কোনো একটা হাওরপাড়। কিন্তু শৈশব বছরের, যেকোনো শিশুর ততক্ষণে কোমরজল ঠেলে এগিয়ে যাওয়া হয় গেছে। তাদের ডান হাতে ছেঁড়া জাল, বাঁ হাতের আপ্রাণ চেষ্টা একটা নড়বড়ে ডিঙি নৌকা সামলানোর। তাদের চোখে কোনো রঙিন স্বপ্ন নেই, আছে কেবল আরেকটা দিন পার করার হিসাব। কাঁটায় ক্ষতবিশ্লিষ্ট, পানিতে খসখসে হয়ে যাওয়া আঙুলগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, ওই হাতে আজ কলম থাকার কথা ছিল।
ক্লান্ত গলায় তাদের আক্ষেপের একটি রূপ যেন বলে, “রাইতে বাপে কইলো বাজারে মাছের দাম ভালো, আজ ইস্কুলে না গিয়া জালের নৌকায় উঠ। আমি না আইলে ছোট বইনডি না খায়া থাকব, ইস্কুল দিয়া তো পেট ভরব না।”- এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান গ্রামীণ জনপদে অসংখ্য শিশু প্রতিদিন নিজের শৈশব বিসর্জন দিচ্ছে আমন-বোরোর ফসলের মাঠে, উপকূলের চিংড়ি ঘেরে, উত্তরবঙ্গের তামাকের খেতে কিংবা পোলট্রি খামারের বিষ্ঠা পরিষ্কারের কাজে।
প্রতি বছর ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস এলে আমরা নানামুখী সেমিনার করি, নীতিমালার খসড়া মাপি, কিন্তু বাস্তবতার কর্দমাক্ত চিত্রটি খুব ধীর গতিতে বদলাচ্ছে। বিভিন্ন মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট শিশুশ্রমের প্রায় ৬১ শতাংশই ঘটে কৃষি খাতে, যা সংখ্যায় প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন শিশুর এক বিশাল অসহায় ও স্বপ্নহীন মিছিল।
বাংলাদেশের চিত্রটি আরও বেশি আশঙ্কাজনক এবং কাঠামোগত সংকটে জর্জরিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ (NCLS 2022) বলছে, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মোট ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত, যার মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশুই নিয়োজিত আছে বিভিন্ন বিপজ্জনক শ্রমে। পরিস্থিতি যে দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে, তার প্রমাণ মেলে বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ (MICS 2025)-এর তথ্যে।
প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত দেশের সবচেয়ে ব্যাপক এই জরিপটি জানাচ্ছে, বাংলাদেশে শিশুশ্রমের সামগ্রিক হার ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে বর্তমানে ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই ২.৪ শতাংশ বৃদ্ধির রুক্ষ গাণিতিক অর্থ হলো, মাত্র ছয় বছরে আরও ১২ লাখ নতুন শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে শ্রমের বাজারে প্রবেশ করেছে, যাদের সিংহভাগই শোষিত হচ্ছে গ্রামীণ কৃষি ও এর অনানুষ্ঠানিক বিপণন শৃঙ্খলে।
কৃষিতে এই শিশুশ্রমের বিস্তৃতির পেছনে কাজ করছে দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞানের এক নির্মম মনস্তত্ত্ব। অনেক দরিদ্র পরিবারে সন্তানকে ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বা বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয় না, বরং দেখা হয় বর্তমানের অবৈতনিক শ্রমশক্তি হিসেবে।
গ্রামবাংলার যেকোনো কৃষকই অকপটে তার বাস্তবতার কথা স্বীকার করে বলবেন যে, “হামার ঘরে ছাওয়াল-পাওয়াল বেশি হওয়া মানেই তো আল্লায় বাড়তি হাত দিছে। ধান কাটার সময় কামলা বা মজুর নিলে দিনে ৮০০ টাকা দেওয়া লাগে, লগে তিন বেলা খাওন। নিজের পোলাডারে মাঠে নামায় দিলে সেই টাকাটা বাঁচে। আমাগো মতন গরিবের সংসারে বেশি পোলা মানেই তো মাগনা খাটার লোক।”
এই ‘অধিক সন্তান মানেই অধিক মুক্ত শ্রমিক’ ধারণার আড়ালে লুকিয়ে আছে বংশানুক্রমিক দারিদ্র্যের এক অন্ধকার চক্র। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ুর তীব্র অভিঘাত। উপকূলীয় সাতক্ষীরায় যখন জোয়ারের নোনা জল বাঁধ ভেঙে চিংড়ি ঘেরে ঢুকে পড়ে, তখন কৃষকের ভাগ্য এক রাতেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। নদীভাঙনে জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত পরিবারগুলো যখন বেঁচে থাকার তাগিদে শহরতলির চালকল, চাতাল কিংবা সবজি বাজারে আশ্রয় নেয়, তখন ঘরের ছোট ছেলে বা মেয়েটিই হয় তাদের প্রথম অর্থনৈতিক ঢাল।
কৃষির রূপান্তর ও এর মূল্য শৃঙ্খল (Value Chain) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশুরা এখন আর শুধু মাঠের চাষাবাদেই সীমাবদ্ধ নেই। হাওরের মৎস্য আহরণ থেকে শুরু করে যশোরের পাইকারি সবজি বাজার, গাজিপুরের পোলট্রি খামার, কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের শুঁটকি চাতাল, সবখানেই সস্তা শ্রমের জোগান দিচ্ছে শিশুরা। অথচ এই কাজগুলো তাদের কোমল শরীরের জন্য কতটা মারাত্মক, তা আমরা শহরবাসী ভোক্তারা টেরই পাই না। কাওরান বাজারে সবজি কিনতে আসা সরকারি বড় কর্মকর্তারা যেমনটা বলেন, “আমরা প্রতিদিন যে তাজা টমেটো বা শসা কিনছি, তার পেছনে কোনো শিশুর বারো ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনি আছে কি না, তা ভাবার অবকাশ আমাদের হয় না। শহরের বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় যে গলদা চিংড়ি আমরা খাচ্ছি, তা হয়তো সাতক্ষীরার কোনো শিশুর নোনা পানিতে ১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ধরা।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের সংস্পর্শে আসার কারণে এই শিশুরা মারাত্মক চর্মরোগ, ফুসফুসের ক্রনিক জটিলতা এবং দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের তামাকের খেতে কাজ করা শিশুরা গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস (GTS)-এর মতো নিকোটিনজনিত বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে, যা তাদের স্নায়ুতন্ত্রকে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
এই সংকট দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি অশনিসংকেত। আজকের শিশুশ্রমিকই আগামী দিনের মূল কৃষক। কিন্তু সে যদি আজ শিক্ষার প্রাথমিক সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হয়, তবে আগামী দিনের আধুনিক ও স্মার্ট কৃষির সঙ্গে সে তাল মেলাবে কীভাবে? বাংলাদেশ এখন ড্রোনের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়, স্বয়ংক্রিয় সেচ এবং ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে যাচ্ছে। অশিক্ষিত, ভগ্নস্বাস্থ্যের একদল যুবশক্তিকে দিয়ে আমরা কখনো টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব না। কৃষিতে শিশুশ্রম টিকিয়ে রাখা মানে দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের গোড়ায় কুঠারাঘাত করা।
যখন মাঠে নতুন কোনো আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বা জলবায়ু-সহনশীল চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তখন প্রান্তিক খামারিদের পাশে কোনো তরুণ বা শিক্ষিত প্রজন্ম দেখা যায় না। যারা আছে তারা হয় বৃদ্ধ, নয়তো অল্পবয়সী নিরক্ষর শিশু। ফলে নতুন প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার গতি শ্লথ হয়ে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করছে।
সামগ্রিকভাবে এই চিত্র বদলাতে হলে বিভিন্ন বিছিন্ন উদ্যোগগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাটামোগত রূপ দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূলের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা যে অর্জিত হয়নি সেটি ILO ও UNICEF তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এর মূল কারণ, আমাদের আইনি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা। শ্রম আইনের কড়া নজরদারি মূলত তৈরি পোশাক শিল্প বা প্রাতিষ্ঠানিক কলকারখানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, অনানুষ্ঠানিক গ্রামীণ কৃষি খাত এখনো সম্পূর্ণ তদারকির বাইরে। এই অচলাবস্থা ভাঙতে হলে পাঁচ ধাপের সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়িত করতে হবে। এতে শিশুশ্রমের হার হ্রাস পাবে, কৃষি আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
প্রথম ধাপে তথ্যভিত্তিক ম্যাপিং ও গ্রামীণ প্রয়োগ জোরদার করা অত্যাবশ্যক। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জিআইএস-সমর্থিত জরিপের মাধ্যমে শিশুশ্রমের হটস্পট চিহ্নিত করে মোবাইল শ্রম পরিদর্শন ইউনিট গঠন করতে হবে, যাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও এনজিওর সমন্বয়ে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত হয়।
দ্বিতীয় ধাপে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য শর্তযুক্ত নগদ সহায়তা (সিসিটি) এবং স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। ফসল কাটার মৌসুমে শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পরিবারগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এবং মহিলাদের জন্য আয়বর্ধক কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুশ্রমের অর্থনৈতিক চাহিদা হ্রাস করা যাবে।
তৃতীয় ধাপে কৃষির যান্ত্রিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতির উপর ভর্তুকি বৃদ্ধি করে শ্রমের চাহিদা কমানো এবং প্রাক্তন শিশুশ্রমিকদের যন্ত্রচালনায় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।
চতুর্থ ধাপে শিক্ষা ব্যবস্থার নমনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্র্যাকের মতো সংস্থার নমনীয় স্কুল ক্যালেন্ডার ও সন্ধ্যাকালীন ক্লাসকে জাতীয়ভাবে প্রসারিত করে কৃষি-সম্পর্কিত দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে শিশুরা শিক্ষা ও কৃষির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পারে।
পঞ্চম ধাপে জবাবদিহিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে টেকসই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে রিয়েল-টাইম মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালু, আন্তর্জাতিক সহায়তার সাথে লক্ষ্যমাত্রা যুক্তকরণ এবং ভোক্তা সচেতনতা অভিযানের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরে দায়বদ্ধতা তৈরি করা প্রয়োজন।
তবে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে আমাদের ঘোষিত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও জাতীয় মহাপরিকল্পনাগুলো কেবলই কি বার্ষিক দিবসের সেমিনারে আর পত্রিকার পাতায় বন্দি থাকবে? নাকি কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভাবনার মূল কেন্দ্রে স্থান পাবে? দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোর লাখো শিশুর জীবন যদি অন্ধকারের কাদা মাটিতেই আটকে থাকে, তবে সেই কৃষি আমাদের জন্য প্রকৃত সমৃদ্ধি বা টেকসই উন্নয়ন এনে দিতে পারবে না।
একটি শিশুর হারানো শৈশব কেবল তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি দেশের সামগ্রিক কৃষি, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের এক অপূরণীয় জাতীয় ক্ষতি। বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসের স্লোগান ও অঙ্গীকার তখনই সার্থকতা পাবে, যখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধাকর থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবেন। পরদিন ভোরে সেই শিশু আবার কাদা মাটি মাখা জাল কাঁধে তুলে নেবে, নাকি স্কুলব্যাগ? সেই সিদ্ধান্ত শুধু তার হতদরিদ্র পরিবারের নয়; সেটি আসলে বাংলাদেশের আধুনিক কৃষি, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ