ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৪ এএম
গৃহকর্মী প্রথার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতাÑ দারিদ্র্যের কারণে শিশু পরিবারের ভরসায় অচেনা ঘরে পাঠানো হয়। কিন্তু সেই শিশুদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রতীকী ছবি
একটি শিশুর শরীরে পোড়া ক্ষত, দীর্ঘদিনের মারধরের দাগ আর ভয়ের নীরবতা কখনোই বিচ্ছিন্ন অপরাধের আলামত নয়। এগুলো সমাজের একটি ব্যর্থতার প্রতিফলন, যা ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নৈতিকতার ওপর দায় চাপিয়ে দেয়। আর যখন এই নির্যাতনের স্থান হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার বাসা, তখন বিষয়টি একান্তই ব্যক্তিগত নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওর বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা ১১ বছর বয়সী শিশুটির ওপর যে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। চিকিৎসকদের ভাষায়, শিশুটির শরীরজুড়ে মারধর ও পোড়া ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে এবং সে গভীর মানসিক ট্রমায় ভুগছে, যার জন্য নিয়মিত সাইকোথেরাপি প্রয়োজন। এটি প্রমাণ করে যে নির্যাতন কেবল দেহেই সীমাবদ্ধ নয়; শিশুর মানসিক ও আবেগীয় জগৎও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, এই শিশুর আত্মসম্মান, নিরাপত্তা বোধ এবং সামাজিক বিশ্বাসও তলানিতে নেমে গেছে।
নির্যাতনের চিহ্নসহ শিশুটিকে ফেরত দেওয়ার সময় তাকে নীরব থাকতে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এমনকি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে অপরাধটি কেবল নিষ্ঠুর নয়, বরং পরিকল্পিত ও সচেতনভাবে গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ক্ষমতার ছায়ায় সত্য চাপা দেওয়ার এই প্রবণতা আমাদের বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থার জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা।
শিশুর নিপীড়ন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সামাজিক সংকেত। যে সমাজ যেখানে শিশুর নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও অরক্ষিত, সেখানে নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের বিপর্যয় স্পষ্ট।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম ও শিশু নির্যাতন দমন-সংক্রান্ত আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। বিশেষ করে গৃহস্থালি কাজের মতো ‘ব্যক্তিগত পরিসরে’ সংঘটিত নির্যাতন শনাক্ত ও প্রতিরোধের জন্য কার্যকর কোনো কাঠামো নেই। নেই শিশু-গৃহকর্মীদের নিবন্ধন ব্যবস্থা, নেই নিয়মিত পরিদর্শন, নেই নিরাপদ ও গোপন অভিযোগ জানানোর পথ। ফলে নির্যাতন নীরবে চলতে থাকে, আর শিশুরা শিখে যায় সহ্য করতে।
শিশু-গৃহকর্মী প্রথা আদৌ কতটা মানবিক? শিশুদের প্রকৃত জায়গা স্কুল, খেলাধুলা, নিরাপদ পরিবার ও মানসম্মত পরিবেশ। রান্নাঘর বা গৃহকর্তার রোষানলে বন্দি করে ‘কাজ শেখানো’ সভ্য সমাজে কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিশুশ্রমের সঙ্গে দারিদ্র্য একেবারেই আলাদা নয়। দারিদ্র্য, শিক্ষা-বঞ্চনা ও সামাজিক অবহেলার সঙ্গে যুক্ত শিশুশ্রমের প্রভাব ভয়ংকর।
গৃহকর্মী প্রথার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতাÑ দারিদ্র্যের কারণে শিশু পরিবারের ভরসায় অচেনা ঘরে পাঠানো হয়। কিন্তু সেই শিশুদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখানে আইন থাকলেই চলবে না; দরকার কার্যকর বাস্তবায়ন, মনিটরিং, পরিদর্শন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা। শিশুশ্রম শুধু নির্যাতনের কারণ নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমস্যা হিসেবে শিশুদের জীবনের সব দিককে প্রভাবিত করেÑ শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতি, শিক্ষা ও সামাজিক যোগ্যতা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়Ñ কোন শিশু নিরাপদ? যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার বাসাতেও একটি শিশুর শৈশব সুরক্ষিত না থাকে, তবে নিরাপত্তার দায় আমরা কার কাছে দেব? এই প্রশ্নের সৎ ও কার্যকর উত্তর না খুঁজলে আজকের শিশুর ক্ষত কাল আমাদের সামষ্টিক বিবেকের ক্ষতে পরিণত হবে। আজকের এই ঘটনায় আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিতÑ শিশু অধিকার রক্ষা আর আইন প্রয়োগ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে তা ব্যর্থ। শিশুদের নিরাপদ রাখার জন্য সমাজের সকল স্তরে, পরিবারের, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে সম্মিলিত দৃষ্টি ও উদ্যোগ অপরিহার্য। কেবল তবেই আমরা বলতে পারব, কোনো শিশু সত্যিই নিরাপদ।
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি