× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুশইন ও সীমান্ত উত্তেজনা

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে

পুশইন ও সীমান্ত উত্তেজনা

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’দের ঘিরে নতুন করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয় এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার এক জটিল সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ কর্তৃক আটক ব্যক্তিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার বা ‘পুশব্যাক’ করার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এমন একাধিক প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বলে জানা গেছে। কোথাও কোথাও সীমান্তের জিরো পয়েন্টে আটকে পড়া নারী, শিশু ও পুরুষদের মানবেতর অবস্থায় দিন কাটানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের সম্পর্কের জন্য অশনিসংকেত নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় মানবিক ও আইনি মানদণ্ড কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটি নিছক প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। আরএসএস-বিজেপি ধারাবাহিকভাবে এই ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে যে, ভারতে বিপুলসংখ্যক ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বসবাস করছে এবং তারা দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের জন্য হুমকি। অথচ এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান বা স্বচ্ছ তথ্য খুব কমই উপস্থাপিত হয়েছে।

বরং এই প্রচারণা ক্রমে এমন এক সামাজিক মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছে যেখানে মুসলিম পরিচয়কেই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদেরও ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। ফলে সীমান্ত রাজনীতির সঙ্গে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ জড়িয়ে গিয়ে বিষয়টি আরও বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছেÑ আন্তর্জাতিক আইন কী বলে? কোনো রাষ্ট্র কি ইচ্ছামতো কাউকে সীমান্তে এনে অন্য দেশে ঠেলে দিতে পারে?

আন্তর্জাতিক আইন বলছে, পারে না। জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং রাষ্ট্রীয় আচরণের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তিকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকতে হবে। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্মতি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘নন-রিফাউলমেন্ট’। যদিও এটি মূলত শরণার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবুও জোরপূর্বক এমন স্থানে কাউকে পাঠানো যাবে না যেখানে তার জীবন, নিরাপত্তা বা মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে। সীমান্তের জিরো পয়েন্টে দিনের পর দিন খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসাহীন অবস্থায় মানুষকে ফেলে রাখা নিঃসন্দেহে মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (ICCPR) অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কাউকে বিচার বা যাচাই ছাড়াই সীমান্তে ঠেলে দেওয়া ‘সমষ্টিগত বহিষ্কার’-এর শামিল, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।

বাংলাদেশ সরকার যে অবস্থান নিয়েছেÑ অর্থাৎ যথাযথ তালিকা, পরিচয় যাচাই এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন তা আন্তর্জাতিক আইনসম্মত। যদি সত্যিই কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হন এবং তিনি অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করেন, তাহলে দুই দেশের যৌথ যাচাইয়ের মাধ্যমে তাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব। অতীতে এমন বহু প্রত্যাবাসন দুই দেশের মধ্যে হয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।

ভারতেরও একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘ সীমান্ত, দারিদ্র্য, মানব পাচার, চোরাচালান ও শ্রমবাজারের বৈষম্যের কারণে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা ঘটেই থাকে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান রাজনৈতিক প্রচারণা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। কারণ সীমান্তে প্রতিটি মানুষই প্রথমত একজন মানুষÑ তারও মৌলিক অধিকার রয়েছে। এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের একটি বড় অংশের মিডিয়া ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে এমনভাবে প্রচার করছে, যেন এটি দেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন। অথচ তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, আইনি বিশ্লেষণ বা মানবিক দিকের চেয়ে উত্তেজনাকর প্রচারণাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে জনমনে বিদ্বেষ বাড়ছে এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে গভীরভাবে যুক্ত। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থও জড়িত। সেই সম্পর্ককে সীমান্ত রাজনীতির কারণে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া আত্মঘাতী হবে।

সমাধানের পথ কী 

প্রথমত, সীমান্তে যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অবিলম্বে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক কাঠামোর অধীনে আনতে হবে। বিএসএফ ও বিজিবির স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয় জোরদার করতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই একতরফা পুশব্যাক  করা যাবে না। 

দ্বিতীয়ত, যৌথ যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। যাদের বাংলাদেশি দাবি করা হচ্ছে, তাদের পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক তথ্য ও স্থানীয় তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, সীমান্তে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে হবে।

চতুর্থত, রাজনৈতিক স্বার্থে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। কোনো জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে ‘অবৈধ’ বা ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিপজ্জনক।

সবচেয়ে বড় কথা, এই সংকটকে আইন ও মানবিকতার ভিত্তিতে দেখতে হবে। সীমান্তরেখা রাষ্ট্রকে বিভক্ত করতে পারে, কিন্তু মানবিক দায়বদ্ধতাকে নয়। নারী, শিশু ও অসহায় মানুষকে কাঁটাতারের মাঝে আটকে রেখে কোনো রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত নৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারে না। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো উত্তেজনা নয়, আস্থা বাড়ানো; সংঘাত নয়, সমাধান খোঁজা। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতেই সেই সমাধান সম্ভব।


হাবিব বাবুল

জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা