অর্থনীতি
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩১ পিএম
এই শতকের শুরুর দিকে আমি তখন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন (ক্রেডিট অ্যাপ্রোভাল) বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। একদিন দুজন ঊর্ধ্বতন ক্রেডিট অফিসার বিশাল অঙ্কের এক ঋণ প্রস্তাব সুন্দর সুন্দর সুপারিশ প্রদান করে অনুমোদনের জন্য আমার কাছে উপস্থাপন করে দ্রুত স্বাক্ষর করার জন্য অনুরোধ জানায় এবং ঘন ঘন তাগাদা দিতে থাকে। আমি কোনো অবস্থাতেই তাদের কথায় কর্ণপাত না করে আমার মতো করে ঋণ প্রস্তাবটি সময় নিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তাদের তাগাদার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল এবং এক পর্যায়ে আমি সেই বিভাগের কর্মকর্তাদের বললাম, ‘আপনারা আপনাদের কাজ করেছেন, এবার আমাকে আমার কাজ করতে দিন। কেউ যদি ঋণ প্রস্তাব বিলম্বিত হওয়ার কারণ জানতে চায়, তাহলে তাদের জানিয়ে দিন যে, আমি ধরে রেখেছি এবং বাকিটা আমি দেখব।’ তখন তারা আমাকে জানায়, ‘গ্রাহক বিদেশ যাবে এবং তার ফ্লাইট আজকে, তাই তিনি ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যেতে চান।’ তারা আমাকে আরও জানায় যে, এমডি অপেক্ষা করছেন এই ঋণ অনুমোদনে স্বাক্ষর করার জন্য। আমি ভাবলাম যে, এ তো ভয়ংকর বিপদের কথা। এই বিশাল অঙ্কের ঋণ এভাবে তাড়াহুড়ার মধ্যে অনুমোদন করলে মারাত্মক ভুল হতে পারে এবং সেই ঋণ অল্পদিনের মধ্যেই খেলাপি হতে পারে।
আমি তখন ঋণ প্রস্তাবটি ভালো করে বিশ্লেষণ করলাম এবং ব্রাঞ্চের সংশ্লিষ্ট ক্রেডিট অফিসারের সঙ্গে কথা বলে এই ঋণের অনেক দুর্বল দিক এবং ঝুঁকির বিষয় জানতে পারি। এসব বিষয় নিয়ে সাহস করে সরাসরি এমডির সঙ্গে কথা বলে তাকে জানানোর পর তিনি আমার কাছে সরাসরি জানতে চাইলেন, ‘এই ঋণ প্রদানে আসলেই অনেক ঝুঁকি আছে কি না।’ আমি বললাম, ‘আমার বিশ্লেষণ বলে যে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে এবং এই ঋণ খুব সহসাই খেলাপি হয়ে যেতে পারে।’ আমার এমন মতামতের পর এমডি আর সেই ঋণ অনুমোদন করতে রাজি হননি। সেই প্রভাবশালী গ্রাহক তখন প্রচণ্ড রেগে যান এবং নানারকম হুমকি-ধমকির কথা শুনিয়ে বিদেশে চলে যান। আজ থেকে দুই যুগ আগে নিজের ব্যাংকিং পেশার তিক্ত অভিজ্ঞতাটি মনে পড়ল যখন দেখলাম স্থানীয় একটি পত্রিকায় একটি ব্যাংকের মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে সেই ব্যাংকের এমডির জড়িত থাকার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
সেই প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেই আলোচিত ব্যাংকের সাবেক এমডি নিজে মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে জড়িত থেকে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন এবং ঢাকা শহরে বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল ফ্লাটসহ অনেক সহায়সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। সংবাদটি পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম যে, একটি ব্যাংকের এমডি নিজে সরাসরি মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে জড়িত হন কীভাবে? ব্যাংকের কার্যক্রমের ব্যর্থতা বা সেখানে কোনোরকম অপরাধ সংঘটিত হলে তার সার্বিক দায়িত্ব সেই ব্যাংকের এমডির ওপর বর্তাবেÑ সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অপরাধের দায়িত্ব নেওয়া আর অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা এক বিষয় নয়। তখনই বুঝলাম যে, এই প্রশ্নের উত্তর তো লেখার শুরুতে উল্লেখ করা আমার ব্যাংকিং পেশার তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যেই আছে। অর্থাৎ যে দেশের ব্যাংকে এমডি বললে সবকিছু হয়ে যায় বা এমডিকে খুশি করার জন্য একশ্রেণির কর্মকর্তা আগ বাড়িয়েই সবকিছু করে দেন, সেখানে ব্যাংকের এমডি মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতেই পারে।
মানি লন্ডারিং একটি মারাত্মক আর্থিক অপরাধ। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে বর্তমানে ব্যাংকের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটিত করা বেশ কঠিন কাজ। কেননা এখন ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে কঠোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ অনেক বিধিবিধান এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা মেনে চলতে হয়। এখন আর সেদিন নেই যে, ব্যাংকে একটি হিসাব খুলেই যেমন খুশি তেমন লেনদেন করা যায়। এখন ব্যাংকে হিসাব খোলার সময় “তমার গ্রাহককে জান বা কে-ওয়াই-সি (নো ইউর কাস্টমার) এবং গ্রাহকের সম্ভাব্য লেনদেন বিবরণী (কাস্টমার অ্যাক্টিভিটি প্রফাইল) নেওয়া হয়। কে-ওয়াই-সি এবং গ্রাহকের সম্ভাব্য লেনদেন বিবরণী নিলেই হবে না, প্রতিনিয়ত এই তথ্যগুলো হালনাগাদ বা আপডেট করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, গ্রাহকের প্রকৃত লেনদেন অবশ্যই এ দুটো তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হতে হবে। এছাড়াও আছে কাস্টমার অনবোর্ডিং ব্যবস্থা, নগদ লেনদেন প্রতিবেদন বা সি-টি-আর (ক্যাশ ট্র্যানজেকশন রিপোর্ট) এবং সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন বা এস-টি-আর (সাসপিসিয়াস ট্র্যানজেকশন রিপোর্ট) দাখিল। এমনকি এসব প্রতিবেদন অনুসন্ধান করে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এড়িয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটিত করা আসলেও এক কঠিন কাজ।
এতকিছুর পরও আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর পিছনে অনেক কারণ আছে। প্রথমত, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে গৃহীত ব্যবস্থা মূলত কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে সেভাবে প্রয়োগ করা হয় না। কে-ওয়াই-সি এবং কাস্টমার অ্যাক্টিভিটি প্রফাইল নিতে হবে তাই নেওয়া হয়। অধিকাংশ ব্যাংকার জানেও না যে এসব ডকুমেন্ট আসলে কি এবং কেনই-বা নেওয়া হয়। তেমনি গ্রাহকরাও এসব ডকুমেন্ট সম্পর্কে জানে না এবং কেন দিচ্ছে তাও নিশ্চিত নয়। ব্যাংকার বলেছে, তাই তারা দিয়েছে। এমনও দেখা গেছে যে ব্যাংকার গ্রাহকদের বলে থাকেন যে একটা কিছু বলে দেন, এবং গ্রাহক তখন যা উল্লেখ করে, ব্যাংকার তাই লিখে দেয়। একইভাবে সি-টি-আর বা এস-টি-আর দাখিল করতে হবে, তাই করে দেয়। এগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তার কিছুই হয় না। তদুপরি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং বিধিবিধানগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হয় না। যেহেতু ম্যানুয়ালি প্রয়োগ করা হয়, তাই চাইলে ব্যাংকার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এখনও ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা এমডি যা চান, তাই হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাংকিং আমাদের দেশে চালু আছে। চেয়ারম্যান যা বলেন, এমডি তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগ্রহভরে করে দেন কেবল চেয়ারম্যানের মন জয় করার জন্য। একইভাবে এমডি যা বলেন, অধিকাংশ ব্যাংকার তা আগ্রহভরে করে দেন শুধুমাত্র এমডির প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য। এই ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু থাকার কারণেই মানি লন্ডারিং অপরাধ যেমন সংঘটিত হয়, তেমনি নামে-বেনামে ঋণ প্রদান, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া এবং অন্যান্য অপরাধও সংঘটিত হয়। ব্যাংক পরিচালনায় এই ধরনের অপেশাদার এবং অনৈতিক প্র্যাকটিস বন্ধ করতে না পারলে, শুধু মানি লন্ডারিং অপরাধ কেন, অন্যান্য অনিয়ম বা অপরাধও বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
বর্তমান বিশ্বে ব্যাংকিং খাতে মানি লন্ডারিং অপরাধ একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। এই অপরাধ প্রতিরোধে অনেক কঠোর নিয়ম এবং বিধিবিধান প্রণিত হয়েছে। আছে বিভিন্ন পর্যায়ের তদারকি এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। তারপরও এই অপরাধ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। কেননা এই অপরাধ যারা সংঘটিত করে, তারা ব্যাংকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ে মোটেই কম স্মার্ট নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি ধূর্ত। ফলে যতই কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করা হোক না কেন, অপরাধীরা কোনো না কোনো ফাঁকফোকর বের করে ঠিকই এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে ফেলে। এই সমস্যা বিশ্বের সর্বত্রই আছে এবং এমনকি আমেরিকা, কানাডা এবং ইউরোপের উন্নত দেশের উচ্চমানের ব্যাংকিং খাতেও আছে। কিছুদিন আগে আমেরিক-কানাডার বৃহৎ কয়েকটি ব্যাংক, যাদের আছে বিশ্বের সেরা এবং সবচেয়ে কঠোর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা, তারাও বিশাল অঙ্কের জরিমানা গুনেছে শুধুমাত্র মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অপরাধে। কিন্তু এতকিছুর পরও এই খাতে একটি বড় অর্জন হচ্ছে আগের তুলনায় মানি লন্ডারিং অপরাধ কাজটা ব্যাংকের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়া যথেষ্ট কঠিন হয়ে গেছে এবং বলা চলেÑ প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এ কারণেই ব্যাংকের মাধ্যমে সংঘটিত মানি লন্ডারিং অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে না পারলেও, এর মাত্রা যথেষ্ট কমে এসেছে। এটাই ব্যাংকিং খাতের বড় সাফল্য।
এই সাফল্যের পিছনে যেমন প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধানের কঠোর প্রয়োগ কাজ করেছে, তেমনি আছে ব্যাংকারদের কমিটমেন্ট এবং ডেডিকেশন নিয়ে কাজ করার পরিবেশ। সেই সঙ্গে সবেচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তথ্যপ্রযুক্তির ডিজিটাল পদ্ধতি। মানি লন্ডারিং অপরাধ বন্ধের সব আইন, বিধিবিধান এবং নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণ প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে প্রযুক্তির মাধ্যমেই অনেক অপরাধ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি প্রযুক্তির মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে কোনো ব্যাংকার, বিশেষ করে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি বা অন্য কোনো প্রভাবশালী চাইলেও এমন কোনো লেনেদেন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, যে লেনদেনের সঙ্গে মানি লন্ডারিং অপরাধের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। আমাদের দেশে কঠোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং অনেক বিধিবিধান থাকলেওÑ এই অপরাধ বন্ধে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ কারণেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই অপরাধ বন্ধে যতটুকু সফলতা অর্জন করার কথা ছিল তা আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত করতে পারেনি। আর এ কারণেই একটি ব্যাংকের এমডি মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে জড়িত হতে পারে।