ব্যাংকিং খাত
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৪১ পিএম
আমরা ছাত্রজীবনে একটা কথা প্রায়ই শুনতাম, তা হচ্ছে ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশে প্রতিটা শিশু ভূমিষ্ঠ হয় বিশাল এক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে’। আমাদের শিক্ষকরা যখনই অর্থনীতি বিষয়ে পড়াতেন এবং তৃতীয় বিশ্ব বা উন্নয়নশীল দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়ে কথা বলতেন, তখনই এই বিষয়ে কথা বলেছেন। এমনকি সে সময় পত্রপত্রিকায় যে লেখালেখি হতো, সেখানেও বিষয়টা আলোচিত হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের মতো দেশে আসলেই প্রতিটা শিশু বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্মগ্রহণ করে কি না, তা আমরা সেভাবে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার চেনাজানা যারা আছেন, তাদের ব্যক্তিগত দায়দেনা কিছু আছে। তবে তারা সেই মাপের ঋণে জর্জরিত নয় যে তাদের সন্তান বিশাল অঙ্কের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্মগ্রহণ করবে।
বিষয়টি অবশ্য ব্যক্তিগত ঋণ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ঋণকে বোঝানো হয়েছে। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক, তাই রাষ্ট্রীয় ঋণের বোঝা মূলত জনগণেরই বোঝা। এই কথার সত্যতা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সেভাবে নেই। রাষ্ট্রীয় ঋণ দেশের জনগণ ব্যক্তিগতভাবে পরিশোধ করেছেÑ এমন নজির পৃথিবীতে আছে কি না আমার জানা নেই। মানুষ ব্যক্তিগত ঋণের জন্যই দায়ী থাকে এবং ব্যক্তিগতভাবে এই ঋণ পরিশোধ করে। সেই বিবেচনা থেকে বাংলাদেশে প্রতিটা শিশুর ঋণগ্রস্ত হয়ে জন্মানোর বিষয়টি নিশ্চিত হতে না পারলেও, কানাডা আসার পর এটা অন্তত নিশ্চিত হয়েছি যে আমেরিকা-কানাডার মতো দেশে অধিকাংশ শিশু ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই জন্মগ্রহণ করে।
আমেরিকা-কানাডার মতো দেশে যে শিশু জন্মগ্রহণ করে, তার বাবা-মা আগে থেকেই ক্রেডিট কার্ড বা ব্যক্তিগত ঋণে জর্জরিত হয়ে থাকে। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমজনতার ক্ষেত্রে এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা। বাবা-মা নবজাতকের জন্য যা কিছু করে, তার সবই ক্রেডিট কার্ড বা ব্যক্তিগত লাইন অব ক্রেডিট ব্যবহার করে। এখানে যেহেতু হাইস্কুল পর্যন্ত পড়াশোনা বিনামূল্যে, তাই বিদ্যালয়ের বেতন দিতে হয় না। তবে লেখাপড়ার যে আনুষঙ্গিক খরচ আছে, সেগুলোও চলে বাবা-মা’র ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংক ছাত্রছাত্রীদের হাতে একটি করে ক্রেডিট কার্ড ধরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে শুরু হয়ে যায় জীবনের ঋণের চাকা, যা আর থামে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ মেটানোর জন্য আছে রাষ্ট্রীয় ঋণের ব্যবস্থা। আমেরিকায় তো শিক্ষা ঋণ এক মারাত্মক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মোট শিক্ষা ঋণের পরিমাণ ১.৭০ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অঙ্কের শিক্ষা ঋণ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও উদ্বিগ্ন এবং বিষয়টি দেখার জন্য বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন তার ট্রেজারি সেক্রেটারি, স্কট বেসেন্টাকে। কানাডায় সরাসরি রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। এখানে প্রভিন্সিয়াল সরকারের মাধ্যমে একই ধরনের শিক্ষা ঋণ দেওয়া হয়। অন্টারিওতে এই ঋণ ওসাফ ঋণ নামে পরিচিত এবং বেশ জনপ্রিয়ও বটে। এই শিক্ষা ঋণ এতটাই জনপ্রিয় যে যারা গুরুত্ব সহকারে পড়াশোনা করে, তারাও এই ঋণ গ্রহণ করে। আবার যারা নামেমাত্র পড়াশোনা করে, তারাও এই শিক্ষা ঋণ নিয়ে থাকে। কানাডায় এই শিক্ষা ঋণের পরিমাণ কত, তার সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে এই পরিমাণ যে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বেশি ছাড়া কম হবে না, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
একজন ছাত্র তার প্রাপ্য অনুযায়ী শিক্ষা ঋণ তো গ্রহণ করেই, সেই সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেডিট কার্ড, লাইন অব ক্রেডিট এবং গাড়ির ঋণও গ্রহণ করে। ফলে দেখা যায় একজন ছাত্র বা ছাত্রী যখন শিক্ষাজীবন শেষ করে বের হয়, তখন তার মাথার ওপর থাকে প্রায় এক লাখ ডলার বা তার বেশি পরিমাণ ঋণ। শিক্ষাজীবন শেষে যে মানের চাকরিই জোগাড় করা হোক না কেন, সেই উপার্জন দিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা শেষ করে যদি একটি ভালো মানের চাকরিও পেয়ে যায়, তাতেও তার বাৎসরিক বেতন হাতে-গোনা দুয়েকজন বাদ দিলে কোনো অবস্থাতেই সত্তর/আশি হাজার ডলারের বেশি হবে না। আয়কর এবং অন্যান্য কর্তন শেষে হাতে পাবে প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলারের মতো। অথচ তার জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ষাট হাজার ডলারের মতো। তাহলে এই উপার্জন দিয়ে সে এই ঋণ পরিশোধ করবে কীভাবে। ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় অন্য আরেক ঋণ নিয়ে এই শিক্ষা ঋণ শোধ করতে হয়। সেই সঙ্গে নতুন সংসার চালাতে হয়, অন্যান্য প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়। ফলে যে শিক্ষা ঋণ দিয়ে জীবন শুরু হয়েছিল, সেই ঋণ অন্যান্য ঋণের সঙ্গে মিলে ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে ঋণের বেড়াজালে আটকে যেতে হয়।
আগে শিক্ষা ঋণ নিয়ে যারা উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছে, তাদের অধিকাংশই ভালো চাকরি পেয়েছে এবং এই শিক্ষা ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করেছে। কিন্তু এখনকার অবস্থা ভয়াবহ। সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির রমরমা অবস্থার কারণে এখন ভালো চাকরির সুযোগ ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। এখন অধিকাংশ চাকরি শ্রমনির্ভর এবং ঘণ্টাপ্রতি বেতন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বা তার চেয়ে কিছু বেশি বেতন দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করে রেস্টুরেন্ট, ফ্যাক্টরি বা শপিংমলে সর্বনিম্ন বেতনে চাকরি করছেÑ এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তারা এই শিক্ষা ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবে, তা কল্পনা করাও কঠিন। আশা নিয়ে বেড়ে ওঠা এসব প্রতিশ্রতিসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের সামনে সুন্দর ভবিষ্যৎ অনেক ক্ষেত্রেই ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। এ যেন ভদ্রবেশী দুর্বিষহ জীবন।
উন্নত বিশ্বের সৌন্দর্য হচ্ছে জীবনের শুরুতেই ঋণের বেড়াজালে আটকে গেলেও, তা মানুষের জীবনে এবং সমাজব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয় না। এখানে কাউকে দেখে মনে হবে না যে তার মাথার ওপর বিশাল এক ঋণের বোঝা আছে। কীভাবে এই ঋণ শোধ হবে, সেই চিন্তাও তার মধ্যে নেই। বরং ঋণের ওপর ঋণ নিয়ে উন্নত জীবন উপভোগ করে থাকে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ক্রমাগত ক্রেডিট কার্ড ঋণ বৃদ্ধি করতে থাকে। অবস্থা এমন যে ক্রেডিট কার্ড বা ব্যক্তিগত লাইন অব ক্রেডিট ঋণ ছাড়া এখানে এক দিনও চলার সুযোগ নেই। চাকরি না থাকলেও চলবে, এমনকি নিয়মিত উপার্জন না থাকলেও চলবে, কিন্তু ক্রেডিট কার্ড না থাকলে এক দিনও চলবে না। আমার কথা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। আমাদের অনেকের পরিচিত বা আত্মীয়স্বজন এখন আমেরিকা-কানাডা থাকে। তাদের অনেকেই যেনতেন একটা চাকরি করে দামি গাড়ি হাঁকাচ্ছে এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। কীভাবে করছে, সেই উত্তর জানার চেষ্টা করলেই আমার কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে।
উন্নত বিশ্ব মূলত ঋণনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রীয় ঋণ যেমন আছে মাত্রাতিরিক্ত, তেমনি আছে ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ। হাতে-গোনা কিছু সৌভাগ্যবান ধনাঢ্য ব্যক্তির কথা বাদ দিলে, এমন কোনো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না যে তার ব্যক্তিগত ঋণ নেই। ব্যক্তিগত ঋণ বলতে মূলত ক্রেডিট কার্ড ঋণ, ব্যক্তিগত লাইন অব ক্রেডিট এবং গাড়ির ঋণকেই বোঝায়। উন্নত বিশ্বে ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ এতই বেশি যে মাথাপিছু গড় ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ মোট উপার্জনের ১৪০% থেকে ১৭০%। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির যে পরিমাণ বাৎসরিক উপার্জন তার দেড়গুণ হচ্ছে ব্যক্তিগত ঋণ। এই বিশাল ঋণনির্ভর জাতি হয়েও এসব দেশ কি সুন্দর উন্নত দেশ হিসেবে টিকে আছে। পক্ষান্তরে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশে মাথাপিছু গড় ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ নামমাত্র হলেও, সেসব দেশ উন্নতির পথে এগোতে পারছে না। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, আজ যদি বিশ্বব্যাংক বা আইএমএম এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয় যে ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যক্তিগত লাইন অব ক্রেডিট ঋণের মোট পরিমাণ কোনো অবস্থাতেই ঋণগ্রহীতার মোট উপার্জনের এক-চতুর্থাংশের বেশি হতে পারবে না। যাদের ইতোমধ্যে বেশি আছে, তাদের সেই ঋণের পরিমাণ হ্রাস করে উপার্জনের এক-চতুর্থাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। এমন সিদ্ধান্তের ফলে দেখা যাবে যে ঋণগ্রহীতা তো দেউলিয়া হবেই, সেইসঙ্গে আমেরিকা-কানাডার অর্থনীতিও মুখথুবড়ে পড়বে। অথচ এমন সিদ্ধান্তের কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনীতিতে তেমন কিছুই হবে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে ব্যক্তিগত ঋণের ভারে জর্জরিত হওয়া, ঋণব্যবস্থার মধ্যে টিকে থাকা এবং রীতিমতো বিলাসবহুল জীবনযাপন করা, তার শেষ পরিণতি কোথায়। বিষয়গুলো নিয়ে নিজে যেমন ভাবি, তেমনি আলোচনাও করি বিভিন্ন মহলে। সুযোগ পেলেই অতিরিক্ত ঋণে জর্জরিত হওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করি অনেকের সঙ্গে শুধুমাত্র সন্তোষজনক কিছু জানার আশায়। যেখানেই আলোচনা হয়, সেখানেই একটি বিষয় সামনে চলে আসে যে একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার ঋণ শোধ করতে পারবে কি না। যদি নাই পারে, তাহলে সেই ঋণের কী হবে। এর সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। তবে এতটুকু জানি যে বাবা-মা’র ঋণের টাকায় জন্ম নিয়ে, ঋণের টাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে, এই ঋণের টাকায় জীবনযাপন করে, সেই ঋণ রেখেই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে। অর্থাৎ ঋণের মধ্যেই জন্ম এবং ঋণের মধ্যেই মৃত্যু।