× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শান্তির নতুন দিগন্ত: মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

 শাহাব উদ্দিন মাহমুদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরন্তন সত্য হলো এখানে কোনো স্থায়ী শত্রুতা বা স্থায়ী মিত্রতা থাকে না, যা থাকে তা হলো কেবলই রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা আর কূটনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক শান্তিচুক্তিটি বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও কৌশলগত রাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত কেবল দুই দেশের সম্পর্কের বরফই গলায়নি, বরং পারস্য উপসাগরের তীরে এক উন্নত ও সমৃদ্ধ ইরানের নতুন হাতছানি তৈরি করেছে। এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক অভাবনীয় রূপান্তর এনেছে।

১. ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের পারদ ক্রমাগত নিচে নেমেছে। মার্কিন সম্পর্কের এই বৈরিতা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছিল। তেল রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক বাধা, বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা (সুইফট) থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি ইরানের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে একপ্রকার বন্দি করে রেখেছিল।

নিষেধাজ্ঞার এই দীর্ঘ সময়ে ইরানকে এক তীব্র ‘অবরুদ্ধ অর্থনীতি’র মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের অবমূল্যায়ন দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছিল। তবে এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরান তার অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সামরিক খাতকে স্বাবলম্বী করার এক ব্যতিক্রমী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মুক্তি ও বিশ্বমঞ্চে পূর্ণাঙ্গ আত্মপ্রকাশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সংযোগ অপরিহার্য। এই শান্তিচুক্তি ইরানকে সেই অর্থনৈতিক অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তির ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে, যা দেশটির পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে।

২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি জ্বালানি খাত আবারও পূর্ণ শক্তিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদধারী দেশ। চুক্তি-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারে ইরানের তেলের অবাধ প্রবেশ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত বড় ভূমিকা রাখছে।

• ইরান এখন আন্তর্জাতিক বাধা ছাড়াই দৈনিক লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এশীয় ও ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি করতে পারছে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে রেকর্ড গতি এসেছে।

• বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো (যেমন টোটাল, এনি বা এশিয়ার জ্বালানি জায়ান্টরা) ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডসহ বিভিন্ন বড় বড় প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি সই করছে।

* পশ্চিমা প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ইরানের তেল শোধনাগার এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটছে, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় মুনাফা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৩. কেবল জ্বালানি বা তেল খাতই নয়, এই শান্তিচুক্তি ইরানের অন্যান্য খাতের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের জোয়ার এনেছে। অটোমোবাইল, বিমান চলাচল, খনিজ সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক কৃষি বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগের ঢল নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরে খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবে ইরানের বিমান সংস্থাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বোয়িং ও এয়ারবাসের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নতুন বিমান কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা দেশটির যোগাযোগ ও পর্যটন খাতকে রাতারাতি বদলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে ব্যাংকিং খাতে। আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা ‘সুইফট’-এ ইরানের ব্যাংকগুলো পুনরায় যুক্ত হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্য বহুগুণ সহজতর হয়েছে। এর ফলে ইরানের স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিশ্ববাজারে তাদের ঐতিহ্যবাহী পারসিয়ান কার্পেট, মূল্যবান জাফরান, পেস্তা বাদাম এবং উন্নত মানের শিল্পজাত পণ্য সহজে ও সরাসরি রপ্তানি করতে পারছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল বাজারে পশ্চিমা ও এশীয় পুঁজির অবাধ প্রবেশ ইরানের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

৪. ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তির সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে। দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আবর্তিত হতো ইরান-আমেরিকা বৈরিতা এবং এর ফলে সৃষ্ট আঞ্চলিক মেরুকরণকে কেন্দ্র করে। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ নাটকীয়ভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে।

ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক এবং লেবাননের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ও রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশগুলোতে ইরানের বিশাল প্রভাব রয়েছে। এতদিন আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে ইরানের বিরোধের কারণে এই দেশগুলো ছায়া যুদ্ধ বা ‘প্রক্সি ওয়ার’-এর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। এই শান্তিচুক্তির পর তেহরানের কূটনৈতিক অবস্থান নরম হয়েছে, যা এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকটগুলোর রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ উন্মুক্ত করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রধান পরাশক্তি ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার বৈরিতা এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা ছিল। আমেরিকার সাথে ইরানের এই চুক্তি এবং ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতা বা নমনীয়তা রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে সাহায্য করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে তীব্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ছিল, তা হ্রাস পেয়ে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

৫. এই চুক্তির ফলে চীন ও রাশিয়ার সাথে ইরানের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ইরান মূলত চীন ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্লকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল। বিশেষ করে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এ ইরান এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

এখন আমেরিকার সাথে শান্তিচুক্তির পর ইরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকল্পের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। তেহরান এখন কেবল বেইজিং বা মস্কোর ওপর এককভাবে নির্ভরশীল না থেকে ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে। এটি বিশ্বরাজনীতিতে ইরানের কৌশলগত গুরুত্ব বা ‘লিভারেজ’ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। 

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

উন্নত ও সমৃদ্ধ ইরানের এই পথচলা সম্পূর্ণ মসৃণ বা চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। প্রথমত, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের অভ্যন্তরে যে প্রশাসনিক ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, ইরানের ভেতরের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই চুক্তিকে সবসময় ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি হলো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে যে দোদুল্যমানতা দেখা যায় (যেমন অতীতে জেসিপিওএ বা পরমাণু চুক্তি থেকে মার্কিন প্রত্যাহার), তা এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। তেহরানকে তাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করতে হবে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগের স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানো সম্ভব হয়।

ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তি কেবল একটি সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, এটি পারস্যের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার আধুনিক অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের এক মহাসড়ক। নিষেধাজ্ঞা আর সংঘাতের অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে ইরান এখন এক নতুন ভোরের মুখোমুখি। তেল ও গ্যাসের অফুরন্ত প্রাকৃতিক ভান্ডার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং অত্যন্ত দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে ইরান আগামী এক দশকের মধ্যে সমগ্র এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

একই সাথে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক আগ্রাসী বা বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র থেকে এক দায়িত্বশীল, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে ইরানের এই রূপান্তর বিশ্বশান্তির জন্য এক বড় আশীর্বাদ। ইরান তার জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে, শান্তির হাত ধরে এক উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবেÑ এটাই আজ বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ও প্রত্যাশা।


লেখক: শাহাব উদ্দিন মাহমুদ (কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা