পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক নিরাপত্তা ধারণাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক উপস্থিতির ধরন বদলাতে হতে পারে।
ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে অঞ্চল থেকে সব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানালেও, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওয়াশিংটন নিজেই হয়তো বড় আকারের স্থায়ী ঘাঁটি থেকে সরে আসতে বাধ্য হবে।
২০২২ সালে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় ইয়ানবু শহরের কাছে একটি নতুন সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্র।
সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় এ ঘাঁটির কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। কারণ ইরানের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তা আব্বাস দাহুক বলেন, ইরানের উপকূলের কাছাকাছি না থেকে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখতেই ওই ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও রাশিয়ার স্যাটেলাইট সহায়তায় ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হেনেছে।
এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সামরিক প্রধান ডেভিড পেট্রাউস সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান যেভাবে এসব ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়েছে, তাতে আগের মতো সেখানে অবস্থান ধরে রাখার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে।
তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান না করেও দূর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যুদ্ধের এই যুগে বিশাল ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতেও সেই দুর্বলতা আবার সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন কার্যত ঝুঁকির মুখে। সামরিক বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধ স্থায়ী ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ছোট আকারের, দ্রুত স্থানান্তরযোগ্য এবং ইরানের সীমানা থেকে দূরে থাকা ঘাঁটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে।
বর্তমানে কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্থায়ী ঘাঁটি নেই, তবে দেশটি বন্দর ও আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে থাকে। চলমান সংঘাতে ওমানে তুলনামূলক কম হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সৌদি আরবও ২০০৩ সালের পর স্থায়ী ঘাঁটির পরিবর্তে যৌথ প্রশিক্ষণ ও সীমিত সামরিক সহযোগিতার মডেলে চলে যায়। বর্তমানে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনার সংখ্যা দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে ওমানের মতো ‘হালকা উপস্থিতি’ কৌশলের দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করবে।
৩৭ বার সমঝোতার দাবি ট্রাম্পের
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর দুই মাসেরও বেশি সময় পার হলেও আলোচ্য চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো চুক্তি হয়নি। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মার্চের শেষদিক থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৭ বার ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে চুক্তি শিগগিরই হতে যাচ্ছে অথবা ইরান সমঝোতায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা অব্যাহত রয়েছে।