× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষাঙ্গন: মূল্যবোধের অবক্ষয়

তিথি আফরোজ

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬ ১৪:১২ পিএম

আপডেট : ০৭ মে ২০২৬ ১৪:২৬ পিএম

ধীরে ধীর আমাদের সমাজের অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের যে করুণ পরিণতি তৈরি হয়েছে তা সহজে গড়া কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়।  গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ধীরে ধীর আমাদের সমাজের অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের যে করুণ পরিণতি তৈরি হয়েছে তা সহজে গড়া কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আমার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল ঢাকার একটা বিখ্যাত মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটিতে পড়াশোনার, শৃঙ্খলা, নিয়ম, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহিতার মান ছিল উঁচু মানের। কিন্তু সেখানে যে বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল বলে আমার মনে হয়েছে তা হলো জ্ঞানচর্চার পরিবেশ। তিন বছরের শিক্ষকতা শেষে আমার মনে হয়েছে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের একটা করে তথ্যভাণ্ডার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যা অনেকটা জৈবযন্ত্রের মতো। তথ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। এর উৎপাদন, প্রয়োগ ও সংরক্ষণ জরুরি। এই কাজটা তো এখন যন্ত্রই করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মানুষের মেধা ব্যবহার করা একটা বড় অপচয়ের নমুনা।

আরও পড়ুন: শিক্ষাঙ্গনে উগ্রবাদী রাজনীতির কোনো স্থান নেই: ববি হাজ্জাজ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত উপলব্ধ/ অর্জিত জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ক্ষেত্র। তবে তা শুধু জ্ঞানের জায়গা নয়, এখানে তৈরি হয় শিক্ষার্থীদের নিজের প্রতি আস্থা আর বিশ্বাস। এটা তৈরি করতে দরকার উপযুক্ত শিক্ষক। শুধু একজন মানুষের নয়, একটি জাতির মেরুদণ্ড তৈরি করবে যে তার মনুষ্যত্বের মেরুদণ্ড থাকতে হবে আগে। শিক্ষকতা এমন মহান পেশা যে, একজন শিক্ষককে হতে হয় মহান, সর্বগুণে গুণান্বিত। 

যখন আমাদের সমাজের অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, মূল্যবোধের অভাব দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র বারবার বিপদগ্রস্ত হচ্ছে তখন প্রশ্ন উঠবে সবার আগে শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষকের প্রতি। যখন শিক্ষার্থী আর শিক্ষকের সম্পর্কের সীমানা ঝাপসা হয়ে যায়, দায়িত্বের জায়গা থেকে সরে গিয়ে শিক্ষক ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানো শুরু করে, তখন একজন শিক্ষার্থী বুঝে ওঠার আগেই জড়িয়ে পড়ে এক অদৃশ্য জালে। তা প্রায়শ নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন করে। সংবাদপত্রে হয়তো সব খবর প্রকাশিত হয় না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা এই অবক্ষয়ের যে চিত্র দেখি তা ভয়াবহ। 

কেবল ব্যক্তিগত ভুল বলে এর সীমাবদ্ধতা আনা যাবে না। এটা ক্ষমতার অসমতা। যেখানে একজনের হাতে থাকে নম্বর, মূল্যায়ন, প্রভাব; আর অন্যজনের হাতে থাকে ভয়, দ্বিধা, আর নীরবতা। বিষয়টি শুধু শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের মধ্যের বিষয় নিয়ে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অফিস-আদালতে ক্ষমতার অপব্যবহারে জিম্মি করা হচ্ছে একজন অসহায় নারী বা পুরুষকে। এটা আমাদের সামাজিক ব‍্যাধিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িত বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভবিষ্যৎ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর আত্মহত্যায় প্ররোচনার একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, তার প্ররোচনায় মিমো আত্মহত্যা করেছে। 

ঘটনার পেছনে কয়েকটি কঠিন বাস্তবতা থাকেÑ ক্ষমতার অপব্যবহার : শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক inherently অসম। প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা : অভিযোগ করার নিরাপদ পথ থাকে না বা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। ভয় ও লজ্জা : ‘কেউ বিশ্বাস করবে না’ এই ধারণা শিক্ষার্থীকে চুপ করায়। সামাজিক চাপ : চরিত্রহননের ভয়ে অনেকেই সামনে আসতে পারে না। এই নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ তা অপরাধীকে সাহসী করে, ভুক্তভোগীকে আরও একা করে দেয়।

আরও আগেই আমাদের করণীয় যা ছিল

পরিষ্কার নীতিমালা ও জিরো টলারেন্স প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের সীমা স্পষ্ট থাকতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা। নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা (Grievance Redressal) গোপনীয়তা রক্ষা করে রিপোর্ট করার সুযোগ, স্বাধীন কমিটি, বাইরের সদস্যের উপস্থিতি। বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্যÑ consent, boundaries, power dynamics নিয়ে নিয়মিত সেশন। কাউন্সেলিং ও সাপোর্ট সিস্টেম মানসিক সহায়তা সহজলভ্য করা, যাতে কেউ একা না পড়ে। কারও আচরণে অস্বস্তি দেখলে গুরুত্ব দেওয়া, পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজন হলে রিপোর্টে সহায়তা করা।

ধীরে ধীর আমাদের সমাজের অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের যে করুণ পরিণতি তৈরি হয়েছে তা সহজে গড়া কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি আমরা নীরবতার বদলে স্বচ্ছতা বেছে নেই, ভয়ের বদলে নিরাপত্তা, আর দায় এড়িয়ে না গিয়ে দায় স্বীকার করি। একজন শিক্ষক তখনই শিক্ষক, যখন তিনি জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা আর মর্যাদাও নিশ্চিত করেন। আর একটি প্রতিষ্ঠান তখনই সত্যিকারের শিক্ষাঙ্গন, যখন সেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু শিখতে নয়, নিরাপদ থাকতে পারে।


তিথি আফরোজ

কবি ও শিক্ষাবিদ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা