২৬ মার্চ
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১১:২৬ এএম
আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১১:৩৪ এএম
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান- ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন
পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বর্বর সামরিক অভিযান চালিয়ে যখন নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিকে নিমর্মভাবে হত্যা করছিল, তখনই মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকে এ প্রমাণ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর এ অভিযানে সারা দেশে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
আরো পড়ুন: ২৬ মার্চ : স্বাধীনতা সহযোদ্ধার লাশ আর সন্তানের নিথর দেহ |
মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, বীর উত্তম তার লেখা ‘বাংলাদেশ অ্যাট ওয়ার’ গ্রন্থে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, “২৫ মার্চ রাতে নিজের কমান্ডিং অফিসারের সঙ্গে হিসাব চুকিয়ে নিয়ে জিয়া সিদ্ধান্ত নেন তার ব্যাটালিয়নকে শহরের বাইরে নিয়ে গিয়ে পুনর্গঠন করবেন, শক্তি সঞ্চয় করবেন এবং চট্টগ্রামে এক চূড়ান্ত আঘাত হানবেন। সেই অনুযায়ী সব সৈন্যকে পটিয়ার অদূরে এক স্থানে জড়ো করা হয়েছিল।” তিনি লিখেছেন, “সব সৈন্য তখন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন। জিয়া ২৬ মার্চ বিকাল ৪টায় এই শপথবাক্য পাঠ করান। এরপর তিনি ২৬ মার্চ প্রথমবারের মতো রেডিওতে ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় তিনি শুধু পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলেননি, বরং নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও ঘোষণা করেন।”
শফিউল্লাহ আরও লিখেছেন, ব্যাটালিয়ন শক্তিশালী হতে শুরু করলে, ২৭ মার্চ বিকালে জিয়া কালুরঘাটে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আরেকটি ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় তিনি বলেন, “আমি, মেজর জিয়া, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী প্রধান সেনাপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”
জিয়াউর রহমান নিজেও তার স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করেছেন। তার লেখা ‘বার্থ অব অ্যা নেশন’ নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, “২৫ মার্চ রাতে আমরা স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ করি।” তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেনাবাহিনীর একজন মেজর ছিলেন। এই নিবন্ধ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এবং পরে ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় পুনঃপ্রকাশিত হয়। মেজর জিয়া নিবন্ধে লিখেছেন, “যখন আমি ব্যাটালিয়নে ফিরে আসি তখন দেখি সব পাকিস্তানি অফিসারকে গ্রেপ্তার করে একটি ঘরে রাখা হয়েছে। আমি অফিসে যাই। আমি লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী ও মেজর রফিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু পারিনি। পরে, বেসামরিক বিভাগের টেলিফোন অপারেটরকে ডেকে ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার, কমিশনার, ডিআইজি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের জানানোর অনুরোধ করি যে ৮ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করেছে এবং তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবে।” এ তথ্য সাংবাদিক ও লেখক মাহফুজ উল্লাহর বই ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ : অ্যা পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি’-তে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমান আরও লিখেছেন, “আমি টেলিফোনে সবার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের ধরতে পারিনি, তাই টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করি। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার এবং সৈন্যদের ডাকি। আমি তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেই। তারা সবকিছু জানত। সংক্ষেপে আমি সবকিছু বলি এবং যুদ্ধের নির্দেশ দেই। তারা সবাই সর্বসম্মতভাবে আমার আদেশ পালন করতে রাজি হয়। আমি একটি সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করি।”
‘এটি ছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, রাত ২:১৫ মিনিট। বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের মানুষ চিরদিন এই দিনকে স্মরণ করবে। তারা ভালোবেসে এই দিনটিকে মনে রাখবে। তারা কখনও দিনটিকে ভুলবে না। ক-খ-ন-ও না।’ জিয়াউর রহমানের বরাত দিয়ে নিবন্ধটি শেষ করা হয়। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তার প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ‘চট্টগ্রামে অস্ত্র হাতে লড়াইরত মেজর জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগ নেতাদের পরামর্শ অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গণহত্যা বন্ধে সাহায্যের আবেদন জানান।’
ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ বিষয়ক ইতিহাস প্রকাশিত হয়েছে ‘ভারত রক্ষক› শিরোনামীয় সাইটে। সেখানে ৯৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়া ২৬ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের (Temporary Head of Republic) দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন।”
১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে একটি বক্তব্য দেন, যেটি প্রচারিত হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, The brilliant success of our fighting forces and the daily additions to their strength in manpower and captured weapons has enabled the Government of the Peoples Republic of Bangladesh, first announced through Major Ziaur Rahman, to set up a fullfedged operational base from which it is administering the liberated areas. [Bangladesh Documents, vol-I, Indian Government, Page 284] .
মঈদুল হাসান লিখেছেন, মেজর জিয়া তার প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। [মূলধারা : ৭১, ইউপিএল, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ৫]। একই পৃষ্ঠায় মঈদুল হাসান আরও লেখেন, “মেজর জিয়া শেখ মুজিবের নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বললেও নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আগেকার ঘোষণা সংশোধন করেননি।”
মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিক-উল ইসলাম (বীর উত্তম) তার A Tale of Million বইয়ের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘২৭ মার্চের বিকালে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে ঘোষণা করেন। পরে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।’ কেন জিয়া মত পরিবর্তন করেন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মেজর রফিক-উল ইসলাম। তিনি বলেছেন : “একজন সামরিক কর্মকর্তা নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে ঘোষণা দিলে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র (Political Character of the Movement) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং স্বাধীনতার জন্য এই ঘোষণা সেনাঅভ্যুত্থানরূপে চিত্রিত হতে পারেÑ এই ভাবনায় মেজর জিয়া পুনরায় ঘোষণা দেন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। এই ঘোষণা শোনা যায় ২৮ মার্চ পর্যন্ত।”
মেজর এম এস এ ভূঁইয়া (সুবিদ আলী ভূঁইয়া) তার “মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস’ বইয়ের ৫৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “এখানে মেজর জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, বেতার কেন্দ্র থেকে যারা সেদিন মেজর জিয়ার ভাষণ শুনেছিলেন তাদের নিশ্চয় মনে আছে, মেজর জিয়া নিজেকে হেড অব দি স্টেট’ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধানরূপেই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন।” তিনি আরও লেখেন, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা এই যে, জিয়াউর রহমান নিজে উদ্যোগ নিয়েই এই ঘোষণা প্রচার করেছিলেন। এতে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কতটুকু সুবিধা হয়েছিল তাও বিচার্য। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার নিরিখে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার মান ছিল অত্যন্ত উঁচু। ওই সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর ওই সেনাবাহিনীর অফিসার হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণার ঝুঁকি নেওয়াটা কম কথা নয়। এর একটা মারাত্মক দিকও ছিল। বিদ্রোহ যদি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেত তাহলে যারা সেনাবাহিনীতে ছিলেন, মিলিটারি বিচার অনুযায়ী তাদের ভাগ্যে কি জুটত? সামরিক বাহিনীতে যারা ছিলেন এবং যাদের নাম বিপ্লবের শুরুতেই জানাজানি হয়েছিল তাদের ভাগ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই ছিল না।
পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, ইতিহাসে বিদ্রোহ করার অপরাধে সামরিক বাহিনীর কত লোকেরই না ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে যেতে হয়েছে। বিদ্রোহ যদি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো এবং তৎকালীন পাকিস্তান সরকার টিকে থাকত তখন আমাদের অবস্থাও তাই হতো। ভারতীয় সাংবাদিক জ্যোতি সেন গুপ্ত তার বই ‘হিস্ট্রি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ’-এ লিখেছেন, “মেজর জিয়া ও তার বাহিনী ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বিদ্রোহ করে এবং ওইদিন সন্ধ্যায় তার নিজের নামে রেডিওতে প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।”
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ সহকারী মঈদুল হাসান তার বই ‘মূলধারা ৭১’-এ লিখেছেন, ‘৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন।’ মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বাহিনীর উপ-অধিনায়ক এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার তার বই “১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’-এ লিখেছেন, ‘মেজর জিয়া তার প্রথম ঘোষণায় নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে উপস্থাপন করেন। পরে তিনি এটি সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এটি টেপে রেকর্ড করা হয়। এটি ২৭ মার্চ সন্ধ্যার আগেই পুনঃপ্রচার করা হয়।”
মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটের জন্যে গঠিত যুব শিবিরের মহাপরিচালক এস আর মির্জা তার বই “মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর : কথোপকথন’-এ লিখেছেন যে তিনি ২৫ মার্চের পর থেকে সব সময় একটি রেডিও সঙ্গে রাখতেন এবং বার বার সেটি চালাতেন। তিনি বলেন, ‘আমি ২৭ মার্চ দুপুরে স্পষ্ট শুনেছিলাম, মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছেন।” ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা সুখান্ত সিং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল তার বই ‘ইন্ডিয়াস ওয়ারস সিন্স ইন্ডিপেনডেন্স : দ্য লিবারেশন অব বাংলাদেশ’-এ লিখেছেন, “২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারে বাঙালি অফিসার মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর ইতোমধ্যে গর্জে উঠেছিল।”
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান- ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন