× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

২৬ মার্চ

স্বাধীনতা সহযোদ্ধার লাশ আর সন্তানের নিথর দেহ

আর কে চৌধুরী

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১১:০৯ এএম

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১১:২৮ এএম

স্বাধীনতা যেকোনো জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করেছে রক্তস্নাত পথ ধরে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

স্বাধীনতা যেকোনো জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করেছে রক্তস্নাত পথ ধরে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

স্বাধীনতা যেকোনো জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করেছে রক্তস্নাত পথ ধরে। স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। দিতে হয়েছে দুই লাখেরও বেশি মা-বোনের সম্ভ্রম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তারা রাতের আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত মানুষের ওপর। শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম গণহত্যা। দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। আর এর মাধ্যমেই অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মহিমান্বিত বিজয়। আমি একজন রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯টি মাস। এই ৯ মাসকে কেন্দ্র করেই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম আনন্দ-বেদনার স্মৃতি। আমি প্রত্যক্ষ করেছি, একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়, দেখেছি সহযোদ্ধার লাশ আর আপন সন্তানের নিথর দেহ। 

আরো পড়ুন: ২৬ মার্চ: স্বাধীনতা ও সাফল্যের কথা

আমরা তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমার ভাই শাহ আলম চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। ২৫ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পর আমি ঢাকা থেকে হেঁটে, রিকশা এবং নৌকায় অনেক কষ্টে ২৭ মার্চ নরসিংদী পৌঁছি। নেই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। যোগাযোগ হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত মেজর নূরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি ক্যাপ্টেন মতিউরকে পাঠালেন যুদ্ধ প্রস্তুতির সার্বিক পরিস্থিতি জানার জন্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিরে গিয়ে ক্যাপ্টেন মতিউর আবার নরসিংদী এলেন ৩০ মার্চ, সঙ্গে বহু ইপিআর সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র। নরসিংদীর জনগণ উজ্জীবিত হয়ে ঢাকা আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। ২ এপ্রিল ক্যাপ্টেন মতিউরের পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। বিকালে নরসিংদীর পাঁচদোনা পৌঁছলে পাকবাহিনী নৌ, রেল ও স্থল তিন দিক থেকে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় মুখোমুখি সংঘর্ষ। শত্রুবাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। তাদের অতর্কিত আক্রমণে আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও অসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ চালাতে থাকলাম। পাকবাহিনীর ৮-১০ জন সৈন্য হতাহত হয়। উড়িয়ে দেওয়া হলো তাদের দুটি গাড়ি। আমাদের কয়েকজন হতাহত হয়। 

নরসিংদীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্তুতি নিলাম ভারত যাওয়ার। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকামীদের প্রথম এবং সহজতম আশ্রয়স্থল ছিল ত্রিপুরার আগরতলা। আগরতলা পৌঁছলাম। পেলাম পরিচিত মুখ মেজর নূরুজ্জামানসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী ও ঢাকার অনেক সংগঠকদের। ১৯৭১-এর এপ্রিল মাসে আমি আগরতলা যাই। মাঝখানে কর্নেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার, মেজর নূরুজ্জামান প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যুদ্ধ বিষয়ে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টার। সে দায়িত্ব থেকেই ২৫ এপ্রিল আমি খালেদ মোশাররফ ও কুমিল্লার হোমনার এমপি মোজাফফর আলী প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করি। তার নির্দেশনা গ্রহণ করে কলকাতা থেকে আগরতলায় ফিরে আসি। সংগঠক হিসেবে সে সময়ে মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পসহ ত্রিপুরার অনেক ক্যাম্পেই প্রতিনিয়তই যেতে হতো আমাকে। সূর্যমনিনগর হাসপাতাল, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য। পরিদর্শনে গিয়ে দেখা হলো আমার স্কুলজীবনের বন্ধু ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। এ সময়ে অর্থাৎ ২৮ মে তৎকালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কথা বলারও সুযোগ হয় আমার।

আমি ১ জুন হোমনার এমপি মোজাফফর আলী ও ছাত্রলীগ নেতা আলীসহ হবিগঞ্জের মাধবপুর বর্ডার দিয়ে দেশে প্রবেশ করি। রাত ২.৩০ মিনিটে বর্ডার ক্রস করতে সাহায্য করলেন ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিন। সকালে চারগাছ বাজারে চা-নাস্তা করার সময় লক্ষ করলাম স্থানীয় লোকজন আমাদের সন্দেহের চোখে দেখছে। সে সময়ে দেশে শত্রুমিত্র চেনা খুবই দুরূহ ছিল। সে কারণে দেরি না করে হোমনার উদ্দেশে রওনা হলাম। সারাদিন চলার পর রাতে ঝড়বাদলে মাঝি পথ হারিয়ে ফেলাতে অনেক কষ্টে ৩ জুন সকালে মোজাফফর আলী এমপির এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠলাম। 

পরদিন সকালে বাঞ্ছারামপুরের এমপি মহিউদ্দিনের খোঁজে তার এলাকায় গিয়ে তাকে পেলাম ডোমরাকান্দিতে। এরপর রায়পুরার এমপি আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে দেখা হলো নিলক্ষিয়ায়। শিবপুর-মনোহরদীর এমপি ফজলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় হাইরমারা গ্রামে। তাদের সবাইকে প্রধানমন্ত্রীর মেসেজ জানাই এবং তারা সবাই আগরতলায় তথা ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে একমত হন। এভাবে ২১ জুন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এমপি, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালিদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আলোচনা ও সাক্ষাৎকার কার্যক্রম চালাই। ২২ জুন নিজ গ্রাম নরসিংদীর আলোকবালীতে যাই। অপেক্ষা করছিল দুঃসংবাদ। জানতে পারলাম আমার সন্তান বিপ্লবের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর সংবাদ। চলতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ। আমাদের বাড়িতে ২৯ জুন রাতে পরিবার-পরিজনসহ এলেন নরসিংদীর এমপি মোসলেহউদ্দিন। তাকে পেয়ে আমার কাজে অনেকটাই সুবিধা হলো। এ সময়ে আলোকবালী নিরাপদ নয় ভেবে পরিবার-পরিজন স্থানান্তর করলাম বাঞ্ছারামপুরে। সেখানেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলো আমার ছোট মেয়ে সুইটি। পরে সেও হোমনাতে মারা গেল এক প্রকার বিনা চিকিৎসাতেই। পরিবার-পরিজন রেখে ৩০ জুলাই আবারও ঢাকার পথে রওনা হলাম। পায়ে হেঁটে, নৌকায়, রেলপথে ও রিকশায় অনেক কষ্টে ঢাকায় পৌঁছলাম ৩ আগস্ট রাতে। 

১৬ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মান্ডা, মুরাদপুর ও আশপাশের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ১৭ আগস্ট নরসিংদী রওনা হয়ে ১৯ আগস্ট পৌঁছি। নরসিংদী তখন ভীষণ উত্তপ্ত। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশনা দিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর ভোরে আবারও রওনা হই আগরতলার উদ্দেশে। পাকবাহিনীর চোখ এড়িয়ে দুয়েক জায়গায় ছদ্মবেশে অনেক বিপদ এড়িয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করি। ২৫ সেপ্টেম্বর মেজর নূরুজ্জামান ও ২৬ সেপ্টেম্বর গাজী গোলাম মোস্তফাকে দেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধ পরিস্থিতি বর্ণনা করি। এরপর ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আগরতলা, কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ও শরণার্থী শিবিরসমূহ পরিদর্শন এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কাজে ভারতে ছিলাম। দেশে এলাম ১৪ ডিসেম্বর মেজর হায়দারসহ হেলিকপ্টারে কুমিল্লায়। পরে নরসিংদী হয়ে ঢাকায় এলাম ১৫ ডিসেম্বর বিকালে। যাত্রাবাড়ীতে সেদিনই বিজয় উল্লাস। সে স্মৃতি সারাজীবন মনে রাখবার মতো, জনতা মেজর হায়দার ও আমাকে মাথায় নিয়ে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় নাচতে থাকে। ১৫ ডিসেম্বর কাটল আনন্দ আর উৎকণ্ঠায়। অবশেষে এলো জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিন ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকা ক্লাব থেকে আনা হলো চেয়ার-টেবিল, যে টেবিলে স্বাক্ষরিত হলো বাঙালির বিজয়ের দলিল। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসের সেই দৃশ্য আমার দৃষ্টিতে সুখ-স্বপ্ন হয়ে আছে এখনও।


আর কে চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী, প্রতিষ্ঠাতা 

আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা