× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এ বছরই দেশে ফিরব: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬ ১৬:১৫ পিএম

আপডেট : ২৩ ঘণ্টা আগে

শেখ হাসিনা। ছবি: এএফপি

শেখ হাসিনা। ছবি: এএফপি

ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি চলতি বছরেই বাংলাদেশে ফিরবেন।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানিয়েছেন। রবিবার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এই নেত্রী এনডিটিভিকে দেওয়া একান্ত ই-মেইল সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। নিচে সেই সাক্ষাৎকারের অনুলিপি তুলে ধরা হলো:

এনডিটিভি: আপনি বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং আপনার সমর্থকরাও আশাবাদী যে আপনি শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। এমনকি দলের কয়েকজন নেতা বলেছেন, এ বছরের মধ্যেই আপনার প্রত্যাবর্তন সম্ভব। কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকা অবস্থায় এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: “আমার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি আরও বৃহত্তর একটি প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত: বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ফিরিয়ে আনা এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে।”

“আমার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা যায়। অতীতেও এমন চেষ্টা হয়েছে। তখনও তারা ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।”

“আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাইদের এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট আমাকে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। ‘জনগণের ভোটে’ আমি পাঁচবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের নজিরবিহীন উন্নয়নে কাজ করেছি। আমার প্রায় পুরো জীবনটাই বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই: সব বাধা ও সব ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরে আসব ”

এনডিটিভি: বাংলাদেশে সরকারের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আওয়ামী লীগ পুনরায় সমর্থন ফিরে পাচ্ছে বলে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এটিকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি দলটির রয়েছে?

হাসিনা: “আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন নয়। এটি এমন এক রাজনৈতিক শক্তি, যার শিকড় বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জুড়ে আছে। ৭৭ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগ বহুবার আক্রমণের শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।”

“আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই নিজের পথ তৈরি করে। জনগণের সমর্থন সব সময়ই আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তিকে ভিত্তি করেই আমরা সরকারে থাকাকালে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছি। বাংলাদেশবিরোধী শক্তিগুলো জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে ষড়যন্ত্রমূলক ও সুপরিকল্পিত আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তারা মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।”

“মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে মানুষ নিজ চোখে বাস্তবতা দেখছে। দেশে ‘গণতন্ত্র নেই’। ‘আইনের শাসন’ নেই। মানুষের ‘নিরাপত্তা’ নেই। অর্থনীতি ‘দুর্বল’ হয়ে পড়েছে। সংখ্যালঘুরা ‘হামলার শিকা’র হচ্ছে। ‘উগ্রবাদ’ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে’র মুখে পড়েছেন। মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ‘দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত’ হয়।”

“সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে বলতে গেলে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি অলিগলি নিজের হাতের তালুর মতো চেনে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলই বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রতিটি ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব’ আমরা দিয়েছি। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের রক্তে মিশে আছে। আগুনে সোনা আরও খাঁটি হয়। তেমনি শাসকদের দমন-পীড়ন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করে তুলছে।”

“দলের ৭৭তম বর্ষে আমাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আমার বার্তা খুবই সহজ: ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। দেশের প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি ওয়ার্ড ও প্রতিটি ইউনিয়নের মানুষের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে কখনও আপস করবেন না। আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ অতীতেও মানুষের সঙ্গে ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।”

এনডিটিভি: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক পুনরুদ্ধার কতটা সম্ভব?

হাসিনা: “আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর। একটি অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো একটি সাজানো নির্বাচনের বাইরে আওয়ামী লীগকে রাখতে পেরেছে। তারা হয়তো দলের কার্যালয়গুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তারা হয়তো সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন করেছে। কিন্তু তারা ‘মানুষের হৃদয়’ থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। আর সে কারণেই ‘আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান’ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।”

“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ধরনের নির্যাতন ও দমন-পীড়নের সত্বেও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। এসব মিছিলে শুধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরাই নন, ‘সাধারণ মানুষ’ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন। ‘মায়েরা’ তাদের সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে ‘সাহস ও সমর্থন’ দিচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।”

“বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে যে তারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে ‘ভয়’ পায়। সে কারণেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে তারা সেনাবাহিনী, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং পুলিশ মোতায়েন করেছে। এটি তাদের ‘দুর্বলতা’রই বহিঃপ্রকাশ। শক্তি প্রয়োগ করে আওয়ামী লীগকে দমন করা যাবে না। যে দল জনগণের জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয়ভীতি বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, আওয়ামী লীগ কখনোই শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। বরং সেই রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই ‘বিজয়ের পতাকা’ উড়িয়েছে।”

“বাংলাদেশে যথাযথ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত ‘অবৈধ নিষেধাজ্ঞা’, ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার করতে হবে। ‘রাজনৈতিক বন্দি’দের মুক্তি দিয়ে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও অবরুদ্ধ করে রাখেন, তাহলে মানুষের মধ্যে জমে ওঠা ক্ষোভ, বেদনা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য একটি নতুন পথ তৈরি করবে।”

এনডিটিভি: ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আপনি বলেছেন, বাংলাদেশ তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এই রূপান্তর বলতে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা কি বিস্তারিতভাবে বলবেন? 

হাসিনা: “আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণের স্বার্থে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই স্পষ্ট: সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়। তবে সেই সম্পর্ক অবশ্যই রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।“

“বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সামরিক শাসন, বৈষম্য, দমন-পীড়ন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং গণতন্ত্রকে অস্বীকার করার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানেই বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয়ের ওপর আঘাত হানা।”

“৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ‘সর্বাত্মক আক্রমণ’ লক্ষ করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জুতার মালা’ পরিয়ে ‘অপমান’ করা হয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ‘ভাঙচুর’ করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শেখ মুজিবের বাসভবনে বারবার হামলা চালানো হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ‘হামলার শিকার’ হয়েছেন। মন্দির ‘ভাঙচুর’ করা হয়েছে। সুফি মাজার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে  ‘উগ্রবাদ’ বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্য কথায়, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

“অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা স্থিতিশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং দৃশ্যমান অগ্রগতির একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২ হাজার ৭৯৩ আমেনিকান ডলারে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল, যা আগের অবস্থান থেকে ২৯ ধাপ অগ্রগতির প্রতিফলন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারে উন্নীত হয়েছিল।”

“আমরা দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিশুমৃত্যুর হার চার গুণ কমে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছিল। সাক্ষরতার হার পৌঁছেছিল ৭৮.৫ শতাংশে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৩.৪৪ শতাংশে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪ হাজার ৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছিলাম।”

“আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসন করেছি। প্রায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ১১৫ জন মানুষকে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দুই শতক জমিসহ একটি করে বাড়ির মালিকানা দেওয়া হয়েছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছিলাম। আমরা প্রমাণ করেছি, বাঙালি জাতি যদি সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পায়, তবে তারা নিজেদের শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।”

“৫ আগস্টের পর যেভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ধ্বংস করা হয়েছে এবং যেভাবে দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে একমাত্র আওয়ামী লীগই সক্ষম। জনগণ তা বুঝতে পেরেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই বিজয়ী হতো। ইউনূস এবং ‘বাংলাদেশবিরোধী’ রাজনৈতিক শক্তিগুলো তা খুব ভালোভাবেই জানে। সে কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে ধ্বংস করেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটিই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেল।”

এনডিটিভি: আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং একটি সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আপনার গোপন আলোচনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব দাবির কি কোনো সত্যতা আছে?

হাসিনা: “ষড়যন্ত্রকারীরা জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে প্রায়ই এ ধরনের অপপ্রচার চালায়। আমার অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং বিচার—এসব কোনো গোপন দর কষাকষির বিষয় নয়। এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।”

“আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। একইভাবে বিচারও কোনো দয়া বা দান নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে হবে। রাজনৈতিক নির্দেশে পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্য কিংবা বিচার বিভাগের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কখনোই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।”

“আমি সবসময় রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষেই ছিলাম। তবে সেই সমাধান হতে হবে উন্মুক্ত, নীতিনিষ্ঠ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। কোনো গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে নয়। আওয়ামী লীগ কারও কাছ থেকে রাজনৈতিক দয়া বা করুণা চায় না। আওয়ামী লীগ তার সাংবিধানিক অধিকার, জনগণের সমর্থন এবং জনশক্তির ভিত্তিতেই রাজনীতি করবে।”

এনডিটিভি: সম্প্রতি মন্দিরে ‘হামলা’, হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর ‘আক্রমণে’র প্রতিবেদন এবং কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর ‘বিক্ষোভ ও হুমকি’র বিষয়গুলো আপনি কীভাবে দেখছেন?

হাসিনা: “বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গভীর উদ্বেগের। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে যখনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে, যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করেছে, তখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ‘ভয়াবহ নির্যাতন’ নেমে এসেছে। তাদের ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, ব্যবসা, জীবন ও মর্যাদা সবই হুমকির মুখে পড়েছে।”

“৫ আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, আহমদিয়া সম্প্রদায় এবং সুফি দরগাহ-সংশ্লিষ্ট মানুষসহ কেউই নিরাপদ ছিলেন না। মন্দিরে ভাঙচুর হয়েছে, প্রতিমা ভেঙে ফেলা হয়েছে, বাড়িঘরে লুটপাট চালানো হয়েছে। চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে ‘উদ্বেগজনক’ বিষয় হলো, ‘অবৈধ’ অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও এসব ঘটনা অস্বীকার করেছে অথবা রাজনৈতিক প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। অস্বীকারের এই সংস্কৃতিই অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করেছে। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনও একটি ‘মিথ্যা মামলা’য় কারাগারে রয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে যে সরকার বদলালেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ‘ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি’।

“আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়। তারা বাংলাদেশের সমঅধিকারসম্পন্ন ও সমমর্যাদার নাগরিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন এবং দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। শেখ মুজিব এমন একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। সেই বাংলাদেশকে ‘সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও উগ্রবাদের কাছে জিম্মি’ হতে দেওয়া যায় না।”

“যারা সংখ্যালঘুদের ওপর ‘হামলা’ চালায়, ‘মন্দির ভাঙচুর’ করে কিংবা ধর্মের নামে মানুষকে ‘হুমকি’ দেয়, তারা শুধু একটি সম্প্রদায়ের শত্রু নয়; তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনারও শত্রু। কোনো রাষ্ট্র তখনই ব্যর্থ হয়, যখন একজন নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। আজ বাংলাদেশের বহু সংখ্যালঘু পরিবার সেই ‘ভয়ের মধ্যে’ই দিন কাটাচ্ছে। নিরাপত্তার দাবিতে তাদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ‘লজ্জা’র।”

“সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ে ‘হামলা’র ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যারা শান্তিপূর্ণভাবে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, তাদের যেন ‘মিথ্যা মামলা বা হয়রানির শিকার’ হতে না হয়। তাদের কথা শুনতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

এনডিটিভি: ভারতে আপনার অবস্থানের এই সময়টা ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে কাটছে? আপনি কি আপনার মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে পারেন, নাকি নির্বাসিত জীবন মূলত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাটছে?

হাসিনা: “দীর্ঘদিন ধরেই আমার ব্যক্তিগত জীবন বলতে প্রায় কিছুই নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে আমি সবকিছু হারিয়েছিলাম। তখনও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থাকতে হয়েছিল। পরে দেশে ফিরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছি। আজ বাংলাদেশ আবারও একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের এমন সংকটময় মুহূর্তে আমি সেখানে থাকতে পারিনি, আমাকে সেই ‘সুযোগ’ই দেওয়া হয়নি। এটি আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়।”

“আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু আমার হৃদয় পড়ে আছে বাংলাদেশে। সেই মাটিতে, যেখানে আমার পিতা চিরনিদ্রায় শায়িত। সেই দেশে, যার মাটির সঙ্গে আমার পরিবারের রক্ত মিশে আছে; সেই দেশের মানুষের কাছে, যাদের সেবা করে আমি আমার পুরো জীবন কাটিয়েছি। নিজের দেশের মানুষ থেকে দূরে থাকা, নিজের মাটির গন্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং প্রতিদিন আমার ‘নেতা-কর্মীদের দুর্ভোগের খবর’ শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”

“আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দূরে থেকেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতির খোঁজ রাখি। আমাদের নেতা-কর্মীদের খবর নিই। নির্যাতিত পরিবারগুলোর কথা শুনি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমার সংগ্রাম থেমে যায়নি।”

“আমার শক্তি ‘বাংলাদেশের জনগণ’, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এবং শেখ মুজিবের আদর্শ। সেই শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই আমি প্রতিদিন বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের জনগণ আবারও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আমি সেই সংগ্রামের সঙ্গেই আছি, এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকব।”

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা