নীরা ইসলাম
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৩ ১৮:১৭ পিএম
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৩ ১৪:৩৯ পিএম
ফ্যাশন হাউসগুলোও পোশাকে ফুটিয়ে তুলছে দেশীয় সংস্কৃতি
চলতি সময়ের ফ্যাশন প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পোশাকের মোটিফেও দেখা যাচ্ছে নতুনত্ব। কখনও দেখা মেলে একদম নতুন কিছু, আবার কখনও পুরাতন ও নতুনের সংযোজন। কখনও আবার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশেলে ফিউশন। তবে পোশাকের মোটিফে এখন দেশীয় মোটিফই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে

পোশাকের মাধ্যমে ফুটে ওঠে একজন ব্যক্তির সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও রুচিবোধ। বর্তমানে পোশাক তৈরিতে পশ্চিমা সংস্কৃতির আধিপত্য থাকলেও তরুণ-তরুণীদের দেশীয় পোশাকের প্রতিও রয়েছে আকর্ষণ। তরুণ-তরুণীদের পছন্দের কথা মাথায় রেখে ফ্যাশন হাউসগুলোও পোশাকে ফুটিয়ে তুলছে দেশীয় সংস্কৃতি।
পোশাকে ফুল, লতাপাতার নকশা নতুন কিছু নয়। একটা সময় ফুল, লতাপাতা ছাপিয়ে পোশাকে স্থান পায় স্ট্রাইপ ও বল প্রিন্ট। ব্লক, বাটিক, টাইডাই সবার পছন্দের। তবে কেমন হয় যদি পোশাকে ফুটে উঠে সুনীল আকাশ, গ্রামীণ পরিবেশ অথবা শহুরে রিকশা। এমন সব বিচিত্র মোটিফ নিয়ে পোশাক তৈরির কাজ করছেন এ সময়ের ফ্যাশন ডিজাইনাররা। অনলাইন ও অফলাইনে যেগুলো খুবই জনপ্রিয়।

মোটিফ কী : মোটিফ মূলত নকশা। এটি হতে পারে একটি ধারণা অথবা গোটা একটি গল্প। বিভিন্ন উৎসব, বিশেষ দিন ও ঋতুকে কেন্দ্র করে মোটিফ নির্ধারিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ভাষা আন্দোলন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা, শরতের কাশফুল সবই এখন ফুটিয়ে তোলেন ডিজাইনাররা তাদের পোশাকের ক্যানভাসে। শাড়ি, কুর্তি, লেহেঙ্গা, কামিজ, কাফতান, ওড়না, গাউন, টপস, কুটি, ব্লাউজ, ফতুয়া, পাঞ্জাবি বাদ নেই কোনো কিছু। সব কিছুতেই শোভা বাড়াচ্ছে নানা ধরনের মোটিফ।
বৈশাখী মোটিফ : গ্রীষ্মকালে হয়ে থাকে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ। বছরের এই দিনটিতে সবাই চায় নিজেকে বাঙালি হিসেবে দেখতে। বৈশাখ মানেই ফুল, নকশি, মেলা, পাখি ও হাতির মোটিফ। ফ্যাশন হাউসগুলো পোশাকেও এসব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলছে। তবে শুধু বৈশাখই নয়, সারা বছরই এমন মোটিফের পোশাক পরেন ফ্যাশনপ্রেমী তরুণীরা।
বর্ষা মোটিফ : বর্ষা মানেই ঘনকালো আকাশ, মুষলধারে বৃষ্টি। তাই বর্ষার পোশাকে শোভা পায় মেঘ, বৃষ্টি ও ছাতা। এ সময়ে গাছে গাছে থাকে কদম ও বেলি ফুল। গ্রাম-বাংলার বিলজুড়ে ফুটে থাকে শাপলা ও পদ্ম। টানা বৃষ্টিতে চারদিক টইটম্বুর থাকে পানিতে। এই সময়ে গ্রাম-বাংলার বেশির ভাগ মানুষের চলাচলের প্রধান বাহন নৌকা। অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় নৌকা বাইচের। শাড়ি, কুর্তি, পাঞ্জাবিতেও দেখা যায় এসব মোটিফ। আবার কখনও ময়ূর তো কখন কদম, বেলি, শাপলা ও পদ্ম শোভা বাড়ায় পোশাকের।

শরৎ মোটিফ : শরৎ মানেই নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে সাদা কাশফুল। শরতের এই মোটিফ নিয়ে তৈরি করা শাড়ি, কামিজ, ওড়না ও পাঞ্জাবি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বসন্ত মোটিফ : রঙ-রূপ আর বৈচিত্র্য নিয়ে আসে বসন্ত ঋতু। বসন্তে ফুলেল ও স্ট্রাইপড মোটিফ নিয়ে তৈরি হয় এ সময়ের পোশাকগুলো। কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল ফুলের নকশা পোশাকে এনে দেয় নতুনত্ব। আবার দেখা মেলে ক্যালিওগ্রাফির। কবিতাংশ কিংবা গানের চরণ পোশাকে ফুটিয়ে তোলেন নকশাকাররা।
বিজয় দিবসের মোটিফ : বিজয় দিবস আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার একটি দিন। এই দিনটি উপলক্ষে লাল-সবুজ ছাপিয়ে পোশাক তৈরিতে মোটিফ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে জাতীয় ফুল শাপলা, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পত্রিকার কোলাজ, সে সময়ের দেয়ালচিত্র এবং নানা ধরনের ক্যালিওগ্রাফি।
জামদানি মোটিফ : হাল ফ্যাশনে জামদানি ফেব্রিক সবার প্রিয়। তেমনি জনপ্রিয়তা পেয়েছে জামদানি মোটিফ। ময়ূরকণ্ঠী, পুঁইপাতা, কলকা, দুবলা, বেলপাতা, ইঞ্চি, জুঁই, বেলি, শাপলা, গোলাপসহ বিভিন্ন ফুলেল ও জ্যামিতিক নকশা পোশাকে ব্যবহৃত হচ্ছে। কখনও প্রিন্ট, কখনও আবার এমব্রয়ডারির নকশা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে জামদানির চিরায়ত এই মোটিফগুলোতে। সালোয়ার-কামিজের পাশাপাশি কুর্তা, টপস, স্কার্ট, লেহেঙ্গা ও গাউনের মতো পোশাক ডিজাইন হচ্ছে জামদানি মোটিফে। শুধু মেয়ে নয়, আছে ছেলেদের পাঞ্জাবি, ফতুয়া এমনকি ক্যাজুয়াল শার্টও ব্যবহার করা হচ্ছে জামদানি মোটিফে। হ্যান্ডলুম তাঁতে বোনা জামদানির মোটিফ তুলে এনে স্ক্রিন, ব্লক বা এমব্রয়ডারিসহ অন্যান্য ডিজাইনের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন ডিজাইনাররা।

পূজা মোটিফ : সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গা উৎসব। ষষ্ঠি থেকে দশমী উৎসবের প্রতিটি দিন সবাই নিজেকে একটু আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে চান। এই সময়ে সন্দেশ, কলমকারী, দেবী দুর্গার অলংকার, মন্ত্রের ক্যালিওগ্রাফি, নটরাজের মূর্তি, দুর্গার মুখ, দেবীর আগমন এবং গমনের বাহন, সরস্বতী, গণেশ, প্যাঁচা ইত্যাদির মোটিফ নিয়ে পোশাক তৈরি করে ফ্যাশনহাউসগুলো। এ ছাড়া শাড়ির ভাঁজে থাকে ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনীর শৈল্পিক উপস্থাপনা।
গামছা মোটিফ : দেশীয় মোটিফের মধ্যে গামছা বিশ্বদরবারে সুনাম কুড়িয়েছে। একটা সময় গামছা তৈরি হতো শুধু ফেব্রিক হিসেবে। এখন তৈরি হচ্ছে গামছা মোটিফে শাড়ি, লেহেঙ্গা, ওড়না, পাঞ্জাবি, বেবি ফ্রক ইত্যাদি। শুধু তা-ই নয়, জুতা, গলার মালা, কানের দুল, চুড়ি-বালা, বটুয়া, পার্স, শপিং ব্যাগও তৈরি হচ্ছে গামছা মোটিফে।

অন্যান্য মোটিফ : চায়ের কাপ, ধোঁয়া ওঠা চা, কফি, জাদুর শহর, ব্যাঙ, ব্যাঙাচি, পালকি, সূর্যমুখী, জারুল ফুল, পাখি, সূর্য, সমুদ্র, মধুবনী ইত্যাদি মোটিফেও তৈরি হচ্ছে পোশাক। সুতি, সিল্ক, জর্জেট, ভিসকোস, সিনথেটিক, শিফন, লিলেন ফেব্রিক যেটাই হোক না কেন দেশীয় মোটিফের ছোঁয়ায় তৈরি পোশাক হয়ে ওঠে অনন্য। সেই সঙ্গে জরি, প্যাচওয়ার্ক, ডিজিটাল প্রিন্ট, সিকোয়েন্স, এমব্রয়ডারি ও কারচুপির কাজ পোশাকে যোগ করে ভিন্নমাত্রা।
আজকাল দেশীয় মোটিফে পোশাকের মতো তৈরি করা হচ্ছে গয়নাও। কাঠের ওপর ময়ূর, পালকি, রিকশা প্রিন্ট, ফুল পাতা, বিখ্যাত মানুষের ছবিসহ পেনডেন্ট, আংটি, কানের দুলগুলো এখনকার গয়নাগুলোতে দিয়েছে ভিন্ন রূপ। মেটাল, সুতা, কড়ি, রুদ্রাক্ষ, পুঁতি, ঝিনুক ও বিডসের নানা রকম গয়না এখন বেশ জনপ্রিয়।
আরও পড়ুন : নীল অঞ্জন ঘন

দেশীয় মোটিফের সুন্দর পোশাকের সঙ্গে চাই মানানসই পরিপাটি সাজ। দিনের বেলা বাইরে যাওয়ার সময় একদম হালকা সাজ রাখলেই ভালো। সে ক্ষেত্রে ক্রিম ও সানস্ক্রিন লুজ পাউডার লাগিয়ে নিতে পারেন। চাইলে হালকা ফাউন্ডেশন ও ফেস পাউডারও ব্যবহার করতে পারেন। অথবা বিবি ক্রিম লাগিয়ে গালে হালকা ব্লাশন দিতে পারেন। তবে মেকআপের পূর্বশর্ত হলো পরিষ্কার ত্বক। অপরিষ্কার ত্বকে মেকআপ লাগালে ব্রন বা র্যাশের মতো সমস্যা দেখা দেবে। তাই মেকআপের আগেই মুখ ক্লিনজার দিয়ে ভালো করে ক্লিন করে নিন। এরপর টোনার ব্যবহার করুন। চোখের সাজে অন্যতম অনুষঙ্গ কাজল। অফিস অথবা ক্যাম্পাস যেকোনো জায়গায় কাজলের ছোঁয়া চোখকে করে তুলবে আকর্ষণীয়। আইলাইনার ও হালকা আইব্রু আর্ট হতে পারে নিত্যদিনের চোখের সাজ। সঙ্গে লাগিয়ে নিন মাশকারা। কোনো অনুষ্ঠানের জন্য লাইট পিচ অথবা পিংক কালার শ্যাডো লাগাতে পারেন। রাতের কোনো অনুষ্ঠানের জন্য সিমার কিংবা গ্লিটার আই লুক করতে পারেন। নিত্যদিনের জন্য ঠোঁট সাজাতে বেছে নিতে পারেন ট্রেন্ডি নুড লিপস্টিক। ঠোঁটের ধরন বুঝে সেটি হতে পারে ম্যাট, সেমিম্যাট টেক্সচারের।
মডেল : সামান্থা কবির; পোশাক : হরিতকী; মেকআপ : রাজিয়া’স মেকওভার; ছবি : ফারহান ফয়সাল