প্রচ্ছদ
নীরা ইসলাম
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৩ ১৬:৩৭ পিএম
আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৩ ১৬:৪৬ পিএম
মডেল : মৃত্তিকা; পোশাক ও ছবি : রঙ বাংলাদেশ
সময় বদলের সঙ্গেই বদলেছে মানুষের চাহিদা ও পছন্দ। ফ্যাশনপ্রেমী মানুষ এখন চায় ভিন্ন কিছু। বছরের এই সময়টিতে রোদ ও বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে ফ্যাশন হাউসগুলো তৈরি করছে মৌসুম উপযোগী পোশাক

খরতাপে জরাজীর্ণ প্রকৃতিতে প্রাণের স্পন্দন জাগাতে আবির্ভূত হয় বর্ষাকাল। ঝকঝকে নীল আকাশ মুহূর্তেই ছেয়ে যায় ঘনকালো মেঘে। রোদ ঝলমলে দিনে অশ্রু হয়ে ঝরে বৃষ্টির ধারা। মাঠ-ঘাট, রাস্তা প্লাবিত হয়ে যায় পানিতে। বর্ষণমুখর এমন দিনে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উপভোগ করতে কিন্তু বেশ লাগে। আকাশে মেঘ জমলেই মন আনচান করে বৃষ্টির ছোঁয়ায় গা ভাসাতে। অনেকটা রবি ঠাকুরের লেখা ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে পাগল আমার মন জেগে ওঠে’- এই লাইনটির মতোই।
অনেক সময় এই মনোরম বৃষ্টি কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিরক্তির। বৃষ্টিতে মন নেচে উঠলেও নিত্যদিনের কাজগুলো থেকে আর ফুরসত মেলে না। স্কুল-কলেজ, অফিসসহ বিভিন্ন কাজে বাইরে বের হতেই হয়। জলাবদ্ধতা ও কাঁদায় হতে হয় নাজেহাল। তাই এমন দিনে বাইরে যেতে পোশাক নির্বাচনে হতে হবে সচেতন।
সময় বদলের সঙ্গেই বদলেছে মানুষের চাহিদা ও পছন্দ। ফ্যাশনপ্রেমী মানুষ এখন চায় ভিন্ন কিছু। বছরের এই সময়টিতে রোদ ও বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে ফ্যাশন হাউসগুলো তৈরি করছে মৌসুম উপযোগী পোশাক। একটা সময় পোশাকে কাজ বলতে সুতা, চুমকি, এম্ব্রয়ডারি বোঝা গেলেও বর্তমানে পোশাকগুলো তৈরি করা হয় সময় অনুযায়ী মোটিফে। পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে মৌসুম উপযোগী ফেব্রিক, যা একদিকে যেমন আরামদায়ক, অন্যদিকে ট্রেন্ডি লুক দেয়।

বর্ষায় ফেব্রিক : বর্ষাকালে বাইরে বের হলে ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি। তাই এমন ফেব্রিকের পোশাক পরতে হবে, যা সহজেই শুকিয়ে যাবে। তেমন কিছু ফেব্রিক সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাক।
সিফন : সিফন টপ, স্কার্ট ও শাড়ি অফিসসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে খুব সহজে মানিয়ে যায় ও সুন্দর লুক দেয়। আর এমন বৃষ্টিময় দিনে শিফনের পোশাক ভিজে গেলেও অসুবিধা নেই। কারণ এই কাপড় তুলনামূলক কম পানি টানে। তাই খুব দ্রুতই শুকিয়ে যায়।
সিল্ক : বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় আরাম দেবে সিল্ক। হাফসিল্ক, ক্রেপ সিল্ক, আর্ট সিল্ক, সেমি তসর সিল্ক, কটন মিক্সড সিল্কের তৈরি শাড়ি, কুর্তি ও টপস খুব মানানসই এমন দিনে। ছেলেদের জন্য মেলে সিল্কের শার্ট, পাঞ্জাবি ও কুর্তা। বৃষ্টির দিনে তাই সিল্কের যেকোনো পোশাক নির্দিধায় বেছে নেওয়া যেতে পারে।
জর্জেট : বর্ষায় বৃষ্টি, কাঁদার সঙ্গে অস্বস্তিতে ফেলে ভ্যাপসা গরম। তাই এ সময় একটু পাতলা কাপড়ই আরাম দেবে। জর্জেট তেমনই একটি ফেব্রিক। এটি পাতলা, তাড়াতাড়ি শুকিয়ে এবং সহজেই ধুয়ে ফেলা যায়। জর্জেট পোশাকে অব শোল্ডার, কোল্ড শোল্ডার, প্রজাপতি ও বেল স্লিভের ডিজাইন খুবই আকর্ষণীয়। বর্ষায় যেকোনো অনুষ্ঠানে পরতে পারেন উজ্জ্বল ব্লাউজের সঙ্গে জর্জেট ওয়েটলেস শাড়ি।
ডেনিম : ডেনিম ভারী তন্তুর হওয়ায় এটি শুকানো বেশ কষ্টদায়ক। এটি তেমন একটা আরামদায়কও হয় না। তবে বৃষ্টিতে ভিজে অনেক কাপড় শরীরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, এমন অবস্থা বেশ বিড়ম্বনায় ফেলে। ডেনিমে এমন ঝামেলা নেই। এটি শরীরে জড়ায় না। ভিজে গেলেও শরীরের অবয়ব বোঝা যায় না।
সিনথেটিক : বর্ষায় দ্য বেস্ট ফেব্রিক বলা হয় সিনথেটিককে। কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি হয় বলে এর পানি ধারণের ক্ষমতা কম থাকে। সিনথেটিক শাড়ি আপনাকে করে তুলবে স্টাইলিশ ও চনমনে। এটি ক্যারি করাও সহজ বটে। ফরমাল বা ক্যাজুয়াল যেকোনো অনুষ্ঠানে সিনথেটিক শাড়ি বা যেকোনো পোশাক বেছে নিতে পারেন।

মোটিফ : পোশাকে ফুল লতাপাতার নকশা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। স্ট্রাইপও কমবেশি প্রায় সবারই পছন্দ। তবে এখন সব ফ্যাশন হাউসগুলো পোশাকে বিভিন্ন মোটিফ ও থিম নিয়ে কাজ করছে। ফুটিয়ে তুলছে বাহারি নকশা। যেহেতু এখন বর্ষাকাল, তাই শাড়ি, কুর্তি, টপস ও পাঞ্জাবিতে আকাশ, মেঘ, বর্ষণের আধিপত্য বেশি। শৈল্পিক ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে এসব বিষয়। বর্ষা মানেই সবুজ পাতার ফাঁকে হলুদ-সাদা কদম। শাড়ির ভাঁজে পরম যত্নে স্থান পাচ্ছে কদম। এ যেন ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’। আকাশে উড়ে চলা পাখির মোটিফ নিয়েও খুব সুন্দর পোশাক তৈরি করা হচ্ছে বর্ষায়। গ্রাম বাংলার বিলে শাপলা ও পদ্ম ফুটতে দেখা যায়- তাই এই বর্ষায় শাড়ি, কুর্তি, স্কার্টে কাজ করা হচ্ছে পদ্মঝিল মোটিফে। এ ছাড়া দেখা মেলে ছাতা, মধুবনী চিত্রকলা ও সমুদ্রের থিম।
সাধারণ কাপড়গুলো ডিজাইনারদের হাতের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে অসাধারণ। কখনও কাপড়ে শোভা পায় ফুলেল নকশা। কখনও বা জ্যামিতিক আঁকিবুঁকিতে হয়ে ওঠে অনন্য। ব্লক, হ্যান্ড পেইন্ট, টাইডাই, ডিজিটাল প্রিন্ট, চুমকির কাজ কিংবা সিকোয়েন্স ডিজাইনের পোশাক যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য মানানসই। এ ছাড়া আঁচলে টারসেল লাগানো শাড়িগুলো অনেকে পছন্দ করছে।
বর্ষার পোশাকে রঙ বৈচিত্র্য : বর্ষার গুমোট আবহাওয়া নিজের মনকে সতেজ করতে নির্বাচন করুন গাঢ় রঙের পোশাক। কমলা, কালো, গাঢ় লাল, সি গ্রিন, ধূসর, লেমন, সবুজ, গাঢ় বেগুনি, নীল, ফরেস্ট গ্রিন, ম্যাজেন্টা, জলপাই, নেভি ব্লু ভালো মানাবে। এ সময় সাদা রঙ এড়িয়ে চলাই ভালো।

যেমন হতে পারে বর্ষা দিনের পোশাক : এ সময় সব ধরনের পোশাকই পরা যায়, তবে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও কাঁদার সমস্যায় পড়তে হয় বলে বেশি লম্বা কামিজ না পরাই ভালো। একটু শর্ট টপস, কটি কাফতান, টিউনিক্স, লেডিস পাঞ্জাবি, পালাজ্জো, কেপরি স্কার্ট ও লুজ প্রিন্টেড শার্ট সুবিধাজনক পোশাক। এই মৌসুমে একটু ঢিলেঢালা পোশাক পরাই ভালো। এতে বৃষ্টিতে ভিজলেও পোশাক শরীরের সঙ্গে লেগে যাবে না। এ সময় লেয়ারিং সবচেয়ে ভালো উপায়। লেয়ারিংয়ের জন্য টি-শার্টের ওপর কটি ব্যবহার করতে পারেন। এতে বৃষ্টিতে কটি ভিজে গেলেও গন্তব্যে পৌঁছে তা খুলে শুকিয়ে নেওয়া যাবে এবং ভেতরের টি-শার্টটি শুকনোই থাকবে। সিগারেট প্যান্ট, লেগিংস, ডেনিম প্যান্ট পরতে পারেন। আর যদি শাড়ি পরে বের হতে চান তাহলে উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙের হাফ সিল্ক, শিফন, জর্জেট বা সাটিনের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। সুতি পরতে হলে হ্যান্ডলুমের পাতলা শাড়ি পরতে পারেন। তবে সুতির পরিবর্তে এ সময় সিনথেটিক কাপড়ের ব্লাউজ পরাই ভালো। বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও এগুলো সহজে শুকিয়ে যাবে এবং বাড়ি ফিরে শাড়ি ধুয়ে নেওয়াও সহজ হবে। ছেলেদের আউটফিটের জন্য গ্যাবার্ডিন জাতীয় মোটা তন্তুর প্যান্ট ব্যবহার না করে কিছুটা হালকা বা মিশ্রিত তন্তুর প্যান্ট পরুন। মোটা তন্তুর তৈরি পোশাকে দীর্ঘ সময় পানি আটকে থেকে তা শরীর ও ত্বকের ক্ষতি করে। রেয়ন মিশ্রিত তন্তু দিয়ে তৈরি শার্ট বা গেঞ্জি পরাই ভালো। ফরমাল কোনো কাজ বা অনুষ্ঠান না হলে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরুন। এতে কাঁদায় নষ্ট হওয়ার সুযোগ কম।

সুন্দর পোশাকের সঙ্গে চাই পরিপাটি একটি লুক। কেননা বর্ষায় তো আর বাইরে বের হওয়া থেমে থাকবে না। নিয়মিত কলেজ, অফিসে যেতেই হয়। এ ছাড়া থাকে নানানরকম অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। অন্যান্য ঋতু থেকে এই ঋতু অনেকটাই ভিন্ন, তাই নিজেকে সাজাতে একটু ভিন্ন কৌশলও অবলম্বন করতে হয়। বর্ষায় মেকআপ হালকা হলেই ভালো। কেননা বৃষ্টির পানিতে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাইরে বের হতে ত্বকে সানস্ক্রিন ক্রিম লাগিয়ে ত্বকের টোন অনুযায়ী প্রথমে প্রাইমার ব্যবহার করুন। অফিস অথবা কলেজে যাওয়ার জন্য বিবি ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন সব যেন ওয়াটারপ্রুফ হয়। চোখ সাজান আইলাইনারে। কাজল দিতে চাইলে বেছে নিন ওয়াটারপ্রুফ কাজল। তাহলে বৃষ্টির পানিতে গলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। লিপস্টিকের ক্ষেত্রে একটু গাঢ় রঙ বাছাই করুন। ডার্ক ব্রাউন, ডার্ক পিংক, পিচ পিংক, লাল, মেজেন্টা অথবা নিজের পছন্দমতো ডার্ক কালারে ঠোঁট রাঙিয়ে নিন। এ সময় টপ নট পনিটেইলে (উঁচু করে ঝুঁটি) বেশি স্বাচ্ছন্দ্য পায় সবাই। কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য সাইডে মেছি বান করে নিতে পারেন। চুলের নিচের দিকে হালকা কার্ল করে চুল ছেড়ে দিলেও ভালো দেখাবে। এ ছাড়া চুল স্ট্রেট করে খুলে রাখতে পারেন। ব্লো ড্রাইও করতে পারেন। ব্লো ড্রাই করলে চুল থাকে ভলিউম, শাইনিং ও হেলদি। ট্রাডিশনাল বা ওয়েস্টার্ন যেকোনো আউটফিটকেই খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে যায়।