সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৩ ১০:৪৬ এএম
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৩ ১২:৪৪ পিএম
ফাইল ফটো
চট্টগ্রামে ক্রমশ বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি মৌসুমে ৭২১ জন আক্রান্তের পাশাপাশি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি জুলাই মাসের প্রথম সাত দিনেই আক্রান্ত হয়েছে ২৫৭ জন; মারা গেছে তিনজন। সেই হিসেবে চট্টগ্রাম ক্রমশ ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে বৃহস্পতিবার ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরপরও চট্টগ্রাম নগরবাসীর দেখভালের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি অনেকটা ‘ঘুমিয়ে’ দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ তুলেছে সচেতন মহল। তবে চসিকের দাবি, চসিকের পক্ষ থেকে ওয়ার্ডভিত্তিক আলাদা ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ১০০ জনের টিম দিয়ে প্রতিদিন ৮-১০টি স্থানে ক্রাশ পোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। মশার পর্যাপ্ত ওষুধও মজুদ আছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যেভাবে দিন দিন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, তা উদ্বেগজনক। চলতি জুলাই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। এক কথায়, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ২০১৯ সালের মতো হতে পারে। তাই ইতোমধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মশকনিধনে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চসিককে চিঠি দিয়েছি। সিটি মেয়রের পাশাপাশি ডেঙ্গুর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালককেও (সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অবহিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে ৭ জুলাই) মহানগরসহ চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৭২১ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চ মাসে ১২, এপ্রিলে ১৮, মে মাসে ৫৩ এবং জুন মাসে সর্বোচ্চ ২৮২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ছয় মাসের মধ্যে জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১৮২ জন। আর শুধু জুন মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ২৮২ জন। আর চলতি মৌসুমের সবচেয়ে বেশি মৃত্যুও হয়েছে জুন মাসে। চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মোট ১২ জনের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে জুন মাসে। জানুয়ারি মাসে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। আর চলতি জুলাই মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু রোগী গাদাগাদি করে সাধারণ রোগীদের পাশে
তথ্য পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, গত বছর প্রথম পাঁচ মাসে মহানগরসহ চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭ জন। আর চলতি বছর প্রথম পাঁচ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৮২ জন, যা গত বছরের চেয়ে ১০ গুণের বেশি। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪ জন, মার্চে ১ জন, এপ্রিলে ৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আর মে মাসে কোনো রোগীই শনাক্ত হয়নি।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৭২১ জনের মধ্যে শুক্রবার পর্যন্ত মোট ১৫২ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালেই ভর্তি আছেন ৩৪ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১১ এবং অন্য হাসপাতালগুলোতে আরও ১০৭ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল শুক্রবার বিকালে মানববন্ধন করেছে চট্টগ্রাম গণস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা পরিষদ। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এই মানববন্ধনে পরিষদের সভাপতি ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামে যেভাবে ডেঙ্গু বাড়ছে তা উদ্বেগজনক। দিন দিন হটস্পটে রূপ নিচ্ছে। ডেঙ্গু ঠেকাতে হবে। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ মশকনিধনে রাস্তাঘাটে ওষুধ ছিটাচ্ছে। এতে কোনো কাজ হবে না। ডেঙ্গু হচ্ছে বড়লোকের মশা। বাসাবাড়ির ছাদে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে শিগগিরই কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
চসিকের ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ সালে বাজেট বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চসিক কর্তৃপক্ষ মশকনিধনে গত দুই বছরে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। বিনিময়ে মশার কামড় থেকে মুক্তি মেলেনি চট্টগ্রাম মহানগরীর ৭০ লাখ মানুষের। মোট ব্যয়ের মধ্যে মশার ওষুধ হিসেবে অ্যাডালটিসাইড/লার্ভিসাইড/কালো তেল ক্রয়ে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, ফগার/পাওয়ার/স্প্রে/হ্যান্ড মেশিন ক্রয় হয়েছে ৩৫ লাখ টাকার। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪০ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রত্যেক এলাকার খাল, নালা-নর্দমা মশার লার্ভায় কিলবিল করছে। শুধু সন্ধ্যা বা রাত নয়, এখন দিনেও বাসাবাড়িতে মশা কিলবিল করছে। মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ মানুষ। এতে নগরবাসীর সেবাদানকারী সংস্থা চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কার্যক্রম ও ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম নিয়ে নিয়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে মশকনিধনে ১০০ দিনের ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে চসিক। গত ২২ জুন চমেক হাসপাতাল এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রোগ্রামের উদ্বোধন করেন চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।
চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিটি ওয়ার্ডে চসিকের ক্রাশ প্রোগ্রাম চলছে। ওয়ার্ডভিত্তিক আলাদাভাবে ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ১০০ জনের টিম প্রতিদিন ৮-১০টি স্পটে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। জনসচেতনতায় লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং কার্যক্রম চলছে। এমনকি কোনো ছাদবাগানে বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানা করা হচ্ছে। রবিবার থেকে ড্রোন দিয়ে লার্ভার স্থান চিহ্নিত করে ওষুধ ছিটানো ও অন্যান্য কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত করা হবে। এ ছাড়া মশক নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নতুন ওষুধ কেনা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের পাশাপাশি চসিকের স্টোরে যথেষ্ট পরিমাণ মশার ওষুধ মজুদ আছে। সব মিলিয়ে ১৫ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড, ৩ হাজার লিটার লার্ভিসাইড ও ৫ হাজার ১০০ লিটার মসকুবান মজুদ আছে।’