ফেনী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:২৩ পিএম
আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:৪০ পিএম
খেজুর গাছ থেকে রস আহরণের কাজ করছেন এক গাছি। ছবি : প্রবা
বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের গ্রামের চিরন্তন রূপ। একটা সময় শীত মৌসুমে গ্রামে খেজুর রস আহরণের ধুম পড়ে যেত। তবে সেই দিনগুলো এখন অনেকটাই স্মৃতি। অবাধে খেজুর গাছ নিধন এবং পেশাদার গাছি সংকটে ফেনীর দাগনভূঞা উপজলাতেও খেজুর রস ও রসের তৈরি ঐতিহ্যবাহী রাব বিলুপ্ত হতে চলেছে।
ধীরে ধীরে জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুর গাছের কদর বাড়ে শীত এলেই। সকালে শীতের কুয়াশা যেন চাদরের মতো জড়িয়ে আছে প্রকৃতির গায়ে। এই হাড়কাঁপানো শীতে মধুর লাগে প্রাকৃতিক কোমলপানীয় মিষ্টি খেজুরের রস, যার স্বাদ ও ঘ্রাণ আলাদা।
খেজুর গাছের বৈশিষ্ট্য হলো, শীত যত বাড়বে রস তত মিষ্টি হবে। দরিদ্র মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে খেজুর রস কোমলপানীয় হিসেবে কদর পায়। হাড়কাঁপানো শীতকে উপেক্ষা করে গাছিরা খেজুরের রস সংগ্রহ করেন।
এই শীতে দাগনভূঞাতেও খেজুরের রস সংগ্রহ শুরু হয়েছে। শীতের সকালে রস সংগ্রহ, রসের তৈরি পিঠা, পায়েস, জাউ, ক্ষীর তৃপ্তির রসাল খাদ্য। গাছিদের ভাষায়-মাটির বাছুর কাঠের গাই, বছর বছর দুয়ে খাই।
প্রাকৃতিকভাবেই দাগনভূঞা উপজেলাতে খেজুর গাছ জন্মে। একসময় এটি খেজুর গাছে সমৃদ্ধ এলাকা ছিল। গাছ থেকে শীত মৌসুমে রস ও রসের তৈরি রাব উৎপাদন হতো।
এই খেজুর রসের তৈরি রাবের বেশ সুখ্যাতিও রয়েছে। তবে নানা প্রতিকূলতায় বর্তমানে এ অঞ্চলের রাবের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। শীত এলেই এ অঞ্চলে খেজুর গাছ একটা শিল্পে পরিণত হতো। বর্তমানে রস আহরণ করার পেশায় নিয়োজিত গাছি সংকটের কারণে খেজুর গাছ শীত মৌসুমেও উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। গাছের সংখ্যাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
আগে গাছিরা খেজুর গাছ কেটে যে রস পেত, তার অর্ধেক মালিককে দিত। বর্তমানে মালিকরা গাছিকে গাছপ্রতি ২৫-৩০ টাকা এবং রসের অর্ধেক দিয়েও যথাসময়ে গাছি পাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে জানা যায়, এই পেশায় জড়িত গাছিরা রস আহরণে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। বর্তমানে মালিকরা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় কিছু এলাকায় খেজুর রস সংগ্রহ করতে দেখা যাচ্ছে। এই রস দিয়ে শুধু তাদের পারিবারিক প্রয়োজনে শীতের পিঠা-পায়েস তৈরি করা হয়।
দাগনভূঞার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের শফিকুল ইসলাম নামে এক গাছি বলেন, ‘শীত আসা মাত্রই আমরা খেজুর গাছ ছিলানোর জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেগেই আছি। পাঁচ মাস খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে তা জ্বালিয়ে রাব বানিয়ে বাজারে বিক্রি করলে আর্থিক সচ্ছলতা আসে।’
তিনি বলেন, ‘নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চালাতে হয়। শীত জেঁকে বসার আগে গাছিরা গাছ কাটার জন্য দা তৈরি, ঠুঙি, দড়ি ও মাটির কলস কেনার কাজ সেরে নিয়েছেন।’
কৈখালী গ্রামের গাছি আবুল কাশেম বলেন, ‘আগের মতো খেজুর গাছ আর নেই। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গাছ। ইটভাটায় জ্বালানির কাজে নিধন হচ্ছে খেজুর গাছ।’
স্থানীয়রা বলছেন, খেজুর রস ও রাবকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ভাটায় গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এ অঞ্চলে খেজুর গাছ, রস ও রাবের কোনো চিহ্নই একদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। শীত মৌসুম শুরু হলেও খেজুর রস ও রসের তৈরি হরেক রকমের পিঠা-পায়েস খাওয়ার ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।
দাগনভূঞা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মজুমদার বলেন, খেজুর রস পেতে হলে সবার আগে গাছ সংরক্ষণ করতে হবে। গ্রামে কেউ খেজুর গাছ লাগাতে চায় না। খেজুর রস কিংবা রাব পেতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গাছ রোপণে জোর দিতে হবে।