‘জানতে পারছি, নিক্সনই আমাদের একমাত্র শত্রু। নিক্সনকে মারতে হবে। তাকে না মারলে, তোদের ক্রসফায়ার কইরা মাইরা ফালামু। নিচে পুলিশের গাড়ি খাড়া করাইয়া রাখছি।’ টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম নিক্সন হত্যার নির্দেশ এভাবেই দিয়েছেন আলোচিত সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির। তার এই কথার উত্তরে নিক্সন হত্যা মামলার প্রধান আসামি সুমন বলেছিলেন, ‘না লিডার, আমি মারতে পারব না, আমার মারা সম্ভব না। নিক্সনও আওয়ামী লীগ করে, আমিও আওয়ামী লীগ করি। আমি নিক্সনকে মারতে পারব না।’
আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম নিক্সন হত্যা মামলার প্রধান আসামি সুমন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার পর আদালতের গারদখানায় রেকর্ড করা এক ভাইরাল ভিডিওতে এসব কথাবার্তা হওয়ার দাবি করেছেন। ওই ভিডিওতে তিনি একাধিকবার দাবি করেছেন, টাঙ্গাইলের সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির আলোচিত নিক্সন হত্যার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী। পাশাপাশি সংসদ সদস্যর পিএস মির্জা আসিফ মাসুদসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য সবার কথাও বলেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওর তথ্যসহ বিভিন্ন কথার সঙ্গে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মিল পাওয়া গেছে।
হত্যার পরিকল্পনা এমপির অফিসের দোতলায়
আওয়ামী লীগ নেতা নিক্সন হত্যা মামলার প্রধান আসামি সুমনের ভিডিও ফাঁস হয়েছে গত ৪ জুন। ফেসবুকে আপলোড হওয়া ২০ মিনিট ২১ সেকেন্ডের এই ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় উঠেছে। ‘দ্য টাঙ্গাইল স্টোরিজ’-এ প্রকাশিত ওই ভিডিওতে সুমনের বক্তব্যের কিছু অংশের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল-২ আসনের এমপি তানভীর হাসান ছোট মনির তার ঘনিষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ার আজিজকে ফোন করে হাফিজুল, সবুজ, সুমন, অমি, কামরুল, মজনু ও হাবিবুলদের নিয়ে টাঙ্গাইল আসতে বলেন। তারা এমপির অফিসের দোতলায় বসে নিক্সন হত্যার পরিকল্পা করেন। সেখানে সবার সামনে সুমনকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন সুমন বলেন, ‘না লিডার, আমি আর মারতে পারব না, আমার মারা সম্ভব না। নিক্সনও আওয়ামী লীগ করে, আমিও করি। আপনি অন্যদিক দিয়া এই কাজ করান। কোনো জায়গায় আমি এইটা বলব না।’
সুমনের এ কথায় এমপি মনির রাগ করে পিএস মাসুদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে কল করে তার অফিসের নিচে পুলিশের গাড়ি আনান। পরে সুমনসহ উপস্থিত সবাইকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির পুলিশ সদস্যদের দেখিয়ে বলা হয়, ‘নিক্সনের কারণে তোমাদের এলাকায় আমরা যাইতে পারি নাই। তোমরা ব্যতীত আমাদের আরও লোক আছে। তাদের কাছে জানতে পারছি, নিক্সনই আমাদের একমাত্র শত্রু। নিক্সনকে মারতে হবে। তাকে না মারলে তোদের ক্রসফায়ার কইরা মাইরা ফালামু।’ এমন আলাপের পর ইঞ্জিনিয়ার আজিজ সাত দিন সময় নেন বড় মনির ও ছোট মনিরের কাছ থেকে। পরে ইঞ্জিনিয়ার আজিজ সুমনকে ফোন দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বলেন।
‘সুমন মানসিক রোগী’-এমপি ছোট মনির
হত্যার বিষয়ে ভিডিওতে বলা হয়, এমপি মনির মাসুদকে প্রায় ১০ লাখ টাকা সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘কাজ শেষে তোরা আর টাকা নিয়া নিবি। আর যদি লাগে আরও দিমু। আর কাজ শেষে এসএমএস দিবি। এসএমএস দিয়া আমাকে জানাবি। ফাস্টে যে এসএমএস দিতে পারবি তারে পুরস্কার দেওয়া হবে।’ এমন সব আশ্বাসে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হত্যা মিশনে এমপির পক্ষে থেকে দুইজন এবং ইঞ্জিনিয়ার আজিজের পক্ষ থেকে দুইজন অংশ নেন। তাদের রাজধানী থেকে আনা হয়। হত্যার পর সুমন এসএমএস করে এমপি মনিরকে ঘটনা জানান।
তিনি ভিডিওতে বলেন, ‘আদালতে আমি বড় মনির, ছোট মনিরসহ সবার নাম বলছি। আমি এখানে যেভাবে বললাম এই ভাবে ১৬৪ ধারার কোর্টে খাড়াইয়া ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দি দিছি। ম্যাজিস্ট্রেট জানি না কতটুকু লেখছেন।’
তবে বিষয়টিকে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির দাবি করছেন, ‘সুমন একজন মানসিক রোগী। সে জেলখানায় বসে সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানার ভাই সাবেক পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সদস্য সহিদুর রহমান খান মুক্তির কথায় এসব পাগলামি করছে।’ মুক্তি এখন কারাগারে আছেন বলেও দাবি করেন তিনি।