খেজুর রস
রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:৫৬ এএম
আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৬:৩২ পিএম
খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন গাছি। ঠাকুরগাঁওয়ের নারগুন ইউনিয়নের বোচাপুকুর গ্রামে। প্রবা ফটো
শীত পড়তে শুরু করেছে। আবার আনন্দমুখর হয়ে উঠেছে উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের একমাত্র খেজুরবাগান। জেলার নারগুন ইউনিয়নের বোচাপুকুর গ্রামের এই বাগানে ভোর থেকে রস খেতে আর গুড় তৈরি দেখতে ভিড় করে অনেক মানুষ।
মোটরসাইকেল, অটোরিকশার পাশাপাশি মাইক্রোবাস নিয়ে আসে দূরের মানুষ। জেলার আর কোথাও খেজুরগাছ না থাকলেও ঠাকুরগাঁও সুগার মিল কর্তৃপক্ষ তাদের আখের জমিতে গড়ে তোলে এই বাগান, যা আকর্ষণীয় করে তোলে ঠাকুরগাঁওবাসীর শীতের আমেজ। এ এলাকায় গাছি নেই। তাই দূরের জেলা থেকে উচ্চ মজুরিতে ভাড়া করা হয় গাছি।
রংপুর থেকে খেজুরের রস খেতে এবং গুড় তৈরি দেখতে আসেন আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘আমি ভোর ৪টায় আসছি খেজুরের বাগানের খেজুর রস আর গুড় তৈরি দেখতে। বেশ ভালো লাগল। প্রাকৃতিকভাবে কোনো ভেজাল ছাড়া এখানে খেজুরের গুড় তৈরি হচ্ছে। বাসার জন্য তিন কেজি খেজুরের গুড় নিলাম।’
সারা রাত খেজুরগাছের আগায় লাগানো হাঁড়িতে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হয় রস। ভোরে গাছে ওঠেন গাছিরা। রসভর্তি মাটির হাঁড়ি নামিয়ে টিনের পাত্রে জ্বাল দিয়ে তৈরি করেন গুড়। খেজুর রসের গুড় তৈরির এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ ভিড় করে না, আশপাশের অনেক জেলা থেকেও মানুষ আসে।
জেলা শহরের গোয়ালপাড়া থেকে আসা আরিফুল ইসলাম নামে আরেকজন বললেন, ‘এসে রস খেলাম। প্রতি লিটার রস ৫০ টাকা করে নিছে। চোখের সামনে খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছে দেখে অনেক ভালো লাগছে।’ উম্মে ইফতি নামে আরেকজন বলেন, ‘ভোরে ৪টার পর আসলে খেজুরের রস পাওয়া যায় না। তাই বড় ভাইসহ চলে আসছি রস খেতে। সরাসরি গাছ থেকে রস নামিয়ে গুড় তৈরির প্রক্রিয়াটি দেখলাম। রস কিনে খেলাম। সত্যি মনোরম পরিবেশ, মুগ্ধকর। তবে গুড়ের দামটা একটু বেশি। এক কেজি গুড় ৩০০ টাকা। দামটা একটু কম হলে ভালো হতো।’
খেজুরবাগানে কাজ করেন নাটোরের লালপুর থেকে আসা ছয়জন গাছি। তারা প্রতিদিন গাছগুলোতে হাঁড়ি তোলেন ও নামান। আব্দুল গফুর নামে একজন গাছি বলেন, ‘প্রতিবার আমরা ঠাকুরগাঁওয়ের এই খেজুরের বাগানে কাজ করি। আমাদের মজুরি মাসে ৩০ হাজার টাকা। প্রতিদিন জনপ্রতি ৫০-৫৫টা গাছে হাঁড়ি লাগাই আমরা। ভোরে তা সংগ্রহ করি।’
মজিদ নামে আরেক গাছি বলেন, ‘এখন শীত কম হওয়ায় প্রতিদিন ৩০-৪০ লিটার রস হয়। আর ৪০-৫০ কেজি গুড় উৎপাদন করছি। তবে শীত যত বাড়বে রস ও গুড়ও বাড়বে। ভোর থেকে এই জেলা ও জেলার বাইরে থেকে প্রচুর মানুষ আসে রস ও গুড় কিনতে। আমরা রস ও গুড়ের মধ্যে কোনো ভেজাল দিই না। প্রায় ১৫ দিন ধরে গাছে হাঁড়ি বাঁধছি।’ খেজুরবাগানের মালিক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘দুই বছরের চুক্তিতে আমি সুগার মিল থেকে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা দিয়ে ৭০০ গাছ লিজ নিয়েছি। গতবার আমার মোটামুটি আসল উঠে গেছে। এইবার যা আসবে সব লাভ। আশা করছি দুই-তিন লাখ টাকা লাভ করতে পারব। শীত বাড়লে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার লিটার রস সংগ্রহ করা যাবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শীতের শুরুতে নারগুন ইউনিয়নে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহ। ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি খেজুরবাগান করার জন্য উপযোগী। আমরা চেষ্টা করব যেসব অনাবাদি জমি আছে সেখানে কৃষকরা যাতে খেজুরের বাগান করে স্বাবলম্বী হতে পারেন।’