এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ
সিলেটে ধর্ষণের ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রায় ছয় বছর আগে সিলেটের মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘটিত বহুল আলোচিত দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত।
রায়ে প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন চার আসামি।
সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার মঙ্গলবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায় অনুযায়ী, সাইফুর রহমানের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম রনি ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ইসলাম এবং মাহফুজুর রহমানকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।
সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রায়ের পর দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নেই এবং ভুক্তভোগীও তাদের শনাক্ত করেননি। তার দাবি, অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই কয়েকজনকে দণ্ডিত করা হয়েছে। এ কারণে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
এর আগে সকালেই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের উদ্দেশে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বলেন, তারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নন; রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তাদের মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং ভুক্তভোগীও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি।
রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত এলাকায় গণমাধ্যমকর্মী ও উৎসুক মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
ঘটনার রাত
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এক তরুণী (২০) স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান (রহ.) মাজার এলাকায় বেড়াতে যান। ফেরার পথে টিলাগড়ে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে তার স্বামী পাশের একটি দোকানে গেলে কয়েকজন যুবক তাদের জিম্মি করে।
পরে প্রাইভেটকারসহ তাদের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসসংলগ্ন বালুচর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয় এবং ছাত্রাবাসের মধ্যে ওই তরুণীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হলেও প্রাইভেটকার ও নগদ অর্থ রেখে দেয় অভিযুক্তরা।
ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে ভুক্তভোগীর স্বামী পুলিশকে বিষয়টি জানান। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় শুরুতে ছাত্রাবাসে প্রবেশে দেরি করে পুলিশ। সেই সুযোগে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে রাতভর অভিযান চালিয়ে ছাত্রাবাসের বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
মামলা ও তদন্ত
ঘটনার পর ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা দুজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার তিন দিনের মধ্যেই পুলিশ ও র্যাব অভিযুক্ত ছয়জন এবং সন্দেহভাজন আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত চলাকালে আসামিরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের নমুনার সঙ্গে আলামতের মিল পাওয়া যায়।
অভিযোগপত্রে যাদের নাম ছিল
২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান (রনি), তারেকুল ইসলাম (তারেক), অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন (আইনুল) এবং মিসবাউল ইসলাম (রাজন)-এর বিরুদ্ধে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। অপরদিকে রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়। তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ আটজনকেই স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চারজনের ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিল করে। এছাড়া ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনির বিরুদ্ধে পৃথক অস্ত্র মামলাও দায়ের করা হয়।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া
অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলায় ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর এবং ধর্ষণ মামলায় একই বছরের ৩ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে দুই মামলার বিচার একই আদালতে পরিচালনার আবেদন, হাইকোর্টের নির্দেশনা, বিচার বিলম্ব নিয়ে আদালতের অসন্তোষ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তর—এসব আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটি অগ্রসর হয়।
রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর গত বছরের মে মাসে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হলে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। বিচার চলাকালে মোট ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ভুক্তভোগী, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট, তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের একাধিক শিক্ষক এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।