খুলনার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে নাগরিক মতামত গ্রহণের উদ্দেশ্যে আয়োজিত খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) মতবিনিময় সভা শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন আলোচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিশৃঙ্খলার কারণেই বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে।
আমন্ত্রণপত্র ও ডিজিটাল ব্যানারে দুই সংসদ সদস্যের নাম না থাকার অভিযোগ তুলে সভা বয়কট করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খুলনা জেলা ও মহানগর শাখা। পরে ডিজিটাল ব্যানারে নাম যুক্ত হলেও দলটির নেতারা আর সভায় ফেরেননি। এরই মধ্যে বিশেষ অতিথির বক্তব্য চলাকালে জিয়া হলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় দফায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে পুলিশের নিরাপত্তায় খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরোয়ারকে সভাস্থল ত্যাগ করতে হয়।
শনিবার (১১ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আগামীর খুলনা বিনির্মাণে কেডিএ ও জনগণের ভাবনা শীর্ষক এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে পৌনে ১১টার দিকে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে যশোর রোড থেকে ভেন্যুতে প্রবেশের পথে জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগর শাখার কয়েকজন নেতাকর্মীকে অবস্থান করতে দেখা যায়। সেখানে উপস্থিত এক নেতা জানান, অনুষ্ঠানের ব্যানারে খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল এবং খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালামের নাম না থাকায় তারা সভা বর্জন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, কেডিএ চেয়ারম্যান পরে ব্যানারে নাম সংযুক্ত করার আশ্বাস দেন। পরে ডিজিটাল ব্যানারে দুই সংসদ সদস্যের নাম প্রদর্শিত হলেও দলটির নেতারা আর সভায় ফিরে যাননি।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, উন্নয়ন ভাবনা বিষয়ক দাওয়াত কার্ডে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, একটি নমুনা কার্ডে দুই সংসদ সদস্যের নাম থাকলেও বিতরণ করা অধিকাংশ আমন্ত্রণপত্রে সেই নাম ছিল না। একইভাবে অনুষ্ঠানস্থলের ব্যানারেও শুরুতে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়। এ কারণেই জামায়াতের নেতারা অনুষ্ঠান বয়কট করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কেডিএ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, খুলনার উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, জামায়াত যে অভিযোগ করেছে তা সঠিক নয়, আমন্ত্রণপত্র ও ব্যানারে দুই সংসদ সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে আরেক দফা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরোয়ার নগরীর শিববাড়ি মোড়ে ভেঙে ফেলা জিয়া হলের জায়গায় একটি সিটি সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই হলের বিভিন্ন স্থান থেকে উপস্থিত একাংশ প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। তারা সিটি সেন্টার নয়, জিয়া হল চাই বলে স্লোগান দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন বক্তাকে উদ্দেশ করে তীব্র সমালোচনা করেন, কেউ কেউ পাদুকা প্রদর্শন করেন এবং তাঁকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার দাবিও তোলেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তা দিয়ে মোস্তফা সরোয়ারকে সভাস্থল থেকে সরিয়ে নেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষ অতিথি খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী মঞ্চ থেকে নেমে উপস্থিত লোকজনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এরপর সভার কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
এদিকে সভার ঘোষিত প্রধান অতিথি জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে নাম থাকা খুলনা-৪ ও খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল ও আলী আসগর লবি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়নি। পরে আয়োজকদের পক্ষ থেকে খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমির এজাজ খানকে প্রধান অতিথি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সভায় কেডিএ চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত খুলনা গড়ে তুলতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে নাগরিকদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। নগর উন্নয়নকে অংশগ্রহণমূলক করতে প্রতি তিন মাস অন্তর নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময়েরও পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে দিনের শেষে উন্নয়ন পরিকল্পনার চেয়ে আমন্ত্রণপত্র, ব্যানারে নাম অন্তর্ভুক্তি, রাজনৈতিক বয়কট এবং বক্তৃতাকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।