তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:৩২ পিএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৪ ২১:২০ পিএম
যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের ঘুনি এলাকায় গাছ প্রস্তুতে ব্যস্ত গাছি। বৃহস্পতিবার তোলা। প্রবা ফটো
রাতের শেষের কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহের এটাই সেরা সময়। মিষ্টি রসের জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গাছিরা। যশোর জেলার কয়েকটি অঞ্চলে দেখা মিলছে খেজুর গাছ প্রস্তুতের কাজ। এ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
একটা সময় সন্ধ্যায় গ্রামীণ পরিবেশ খেজুর রসের ঘ্রাণে মধুর হয়ে উঠত। রস আহরণকারী গাছিদের প্রাণচাঞ্চল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। গাছির গলায় শোনা যেত ‘ঠিলে ধুয়েদে বৌ গাছ কাটতে যাবো, খেজুর গাছে চোমর বেড়েছে তোরে এনে দেব, সন্ধ্যায় রস পেড়ে এনে জাও রেনদে খাবো।’
ভোর থেকে শুরু করে সারা বেলা যেন গাছিরা মেতে থাকত রস জ্বালিয়ে পাতলা ঝোলা, দানা গুড় ও পাটালি তৈরির কাজে। নলেন গুড়ের সাধ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন প্রজন্মের কাছে এখন অবশ্যই রূপকথা মনে হবে। যত বেশি শীত পড়বে তত বেশি মিষ্টি রস দেবে খেজুর গাছ।
যশোরের খেজুর গুড় ইতোমধ্যে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রশাসনের উদ্যোগে উঠান বৈঠক, গাছি সমাবেশ, খেজুরের গুড়ের মেলা ও ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা হয় প্রতি বছর।
গতকাল বৃহস্পতিবার যশোরের সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের ঘুনি এলাকায় গেলে চোখে পড়ে গাছিরা রস সংগ্রহের জন্য খেজুর গাছের মাথা প্রস্তুত করছেন।
এ সময় কথা হয় গাছি নজরুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ খেঁজুর গাছ ছিল। শীত আসতে থাকলে গাছিদের আনোগোনা বাড়তে থাকত। দেখা যেত রস জ্বালানোরও প্রস্তুতি। কিন্তু ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে খেজুর গাছ কমতে থাকায় এখন আর আগের মতো এ কাজে যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে না গাছিদের। তা ছাড়া মানুষের জীবন-মানের পরিবর্তনের ফলেও এখন আর তীব্র শীতের মধ্যে গাছিরা গাছে উঠতে চায় না। ফলে দিনদিন খেজুর গাছের রস সংগ্রহ কমে যাচ্ছে। যেসব গাছি গাছ কাটছে, তারাও একান্ত নিজের প্রয়োজনে এ কাজ করছে।
ইসমাইল নামে অপর আরেক গাছি বলেন, আগে এ গ্রামে কম করে হলেও এক থেকে দেড়শ লোক খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করত। এখন সব মিলিয়ে ৪০-৫০ জন গাছ কাটে। শীতের মধ্যে ভোরবেলা এখন আর কেউ খেজুর গাছে উঠে রস সংগ্রহ করতে চায় না। যে কারণে বাজারে রসগুড়ের দাম বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, এ বছর তিনি ১২টি খেজুর গাছ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করছেন। কয়েক দিন পর রস সংগ্রহ করে ঝোলা ও পাটালি গুড় তৈরি শুরু হবে। চলবে প্রায় ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সকালে শহর থেকে মানুষ দলে দলে ছুটে আসে গ্রাম-বাংলার খেজুর রস-গুড় খেতে।
রাধানগর গ্রামের গাছি আবু মুসা বলেন, শীতের পুরো মৌসুমে চলে রস, গুড়, পিঠা-পুলি ও পায়েস খাওয়ার মহা উৎসব। শহর থেকে সকলে গ্রামের বাড়িতে আসে রস-গুড় খেতে। তবে নতুন করে কেউ আর খেজুর গাছ তোলা-কাটার কাজ করতে চায় না। তবে খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এই ঐতিহ্যকে যেকোনো মূল্যে আমাদের রক্ষা করতে হবে। একটি খেজুর গাছ ১৫-২০ বছর পর্যন্ত রস দেয়। এটাই তার বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়া খেজুর পাতা জ্বালানি কাজেও ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কালের বিবর্তনসহ বন বিভাগের নজরদারি না থাকায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ এখন উপজেলাজুড়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে।
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, যশোরের যশ খেজুরের রস এ আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য রক্ষা করতে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও পতিত জমিতে খেজুর গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। খেজুর গুড় ইতোমধ্যে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ পেশার সঙ্গে জড়িত গাছিদের নিয়ে সমাবেশ করে তাদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এ মৌসুমেও গুড় মেলা করা হবে।