ঢাকার আলোকি কনভেনশন সেন্টারে ইয়ুথনেট গ্লোবাল ও ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ (এফইএস) বাংলাদেশের আয়োজনে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত জাতীয় যুব সম্মেলন ‘জাস্ট ট্রানজিশন অ্যান্ড সাসটেইনেবল আরবান মোবিলিটি’তে সমাপনী অনুষ্ঠান। প্রবা ফটো
বাংলাদেশের পরিবহন খাতে সবুজ রূপান্তরের সময় শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেছেন, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি।
ঢাকার আলোকি কনভেনশন সেন্টারে ইয়ুথনেট গ্লোবাল ও ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ (এফইএস) বাংলাদেশের আয়োজনে মঙ্গলবার (১৬ জুন) অনুষ্ঠিত জাতীয় যুব সম্মেলন ‘জাস্ট ট্রানজিশন অ্যান্ড সাসটেইনেবল আরবান মোবিলিটি’তে সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
সম্মেলনে প্রায় ১৫০ জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তরুণ নেতা, নীতিনির্ধারক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক, গবেষক ও শ্রমিক প্রতিনিধি। বাংলাদেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সবুজ, নিরাপদ ও ন্যায়সংগত করার পথ নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।
বাংলাদেশ যখন হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি ৩.০) বাস্তবায়ন এবং কপ-৩১-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনায় ন্যায্য রূপান্তরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এনডিসি ৩.০-তে পরিবহন খাতকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাইকেল মিলার ইয়ুথনেট গ্লোবালের ১০ বছরের যাত্রার প্রশংসা করে বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সার্কুলার অর্থনীতি নিয়ে সংগঠনটির কাজ ইইউ-বাংলাদেশ সহযোগিতার অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, তরুণদের শুধু কথা বলার সুযোগ দিলেই হবে না, তাঁদের মতামতকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে। “তরুণদের কথা শুধু শোনা নয়, তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তও নিতে হবে,” বলেন তিনি।
মিলার বলেন, দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। আজকের নেওয়া বৈদ্যুতিক পরিবহন, গণপরিবহন ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের জীবনমান নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, নগর চলাচল শুধু পরিবহনের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু সহনশীলতা ও সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত। যানজটের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে কার্যকর নগর পরিবহন ব্যবস্থা জরুরি, বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, টেকসই পরিবহন অবকাঠামো ইইউর ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ও ইইউ সদস্যদেশগুলোর সহযোগিতায় বাংলাদেশে রেল যোগাযোগ ও বিদ্যুতায়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-গাজীপুর পর্যন্ত সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক রেল করিডরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর বিলম্বের সুযোগ নেই।
“জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সীমিত করার বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় সিদ্ধান্তগুলো আর পিছিয়ে দেওয়া যাবে না,” বলেন তিনি।
মিলার বলেন, পরিবহন ব্যবস্থা সবার জন্য হতে হবে। এতে শ্রমিক, চালক, যাত্রী, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে। পরিচ্ছন্ন পরিবহনে রূপান্তরের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন ও নগর স্থান তৈরিতে ইইউর ব্র্যাকের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থা হতে হবে নিরাপদ, সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, স্মার্ট, সহনশীল ও কম নিঃসরণভিত্তিক।
সম্মেলনের উদ্বোধন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পরিবহন খাতে রূপান্তর প্রয়োজন, তবে সেই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।
এফইএস বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি ড. ফেলিক্স গেরডেস বলেন, নগর পরিবহন ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ন্যায়সংগত ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কম কার্বন নিঃসরণকারী, ন্যায়সংগত ও জলবায়ু সহনশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুব নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্মেলনের একটি অধিবেশনে ‘নগর সহনশীলতা, সুশাসন ও সবুজ অবকাঠামো’ বিষয়ে আলোচনা হয়। সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ও উন্নয়ন সহযোগিতার উপপ্রধান নয়োকা মার্টিনেজ-ব্যাকস্ট্রম বলেন, ঢাকার পরিবহন সংকট মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা।
তিনি বৈদ্যুতিক বাস, উন্নত ফুটপাত ও সাইকেল ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নারী, শিশু, পথচারী ও বয়স্ক মানুষের নিরাপত্তাকে পরিবহন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানান।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জামান মজুমদার পরিবহন খাতে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উন্নত জ্বালানি মান, পরিবেশগত নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ মহাসচিবের জলবায়ুবিষয়ক যুব পরামর্শক দলের সদস্য ফারজানা ফারুক ঝুমু বলেন, নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই তরুণদের যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক সময় নীতি তৈরির পর তরুণদের মতামত নেওয়া হয়, যা অর্থবহ অংশগ্রহণ নয়।
শ্রমিক প্রতিনিধি নাহিদুল হাসান নয়ন বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের সঠিক তথ্যভান্ডার, পরামর্শ প্রক্রিয়া ও সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। তিনি শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, অধিকার সুরক্ষা এবং বড় নীতি সিদ্ধান্তে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।