প্রতীকী ছবি
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বড় সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, যা দেশের মোট জিডিপির এক দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা (জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ)। সেই তুলনায় নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনই টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। সে কারণে সাধারণ মানুষকে মানসম্মত চিকিৎসা দিতে হাসপাতাল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে”।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য হবে সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ; চিকিৎসা-কেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর; গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া; মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদারকরণ। স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করে দ্রুতই জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার”।
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে”।
তিনি জানান, জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে।
সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে। করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট ইত্যাদি ব্যবস্থা থাকবে। রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবের জন্য ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন করা হবে। প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদান করা হবে। দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ ও টিকা পৌঁছানো সম্ভব হয়।
এছাড়া, দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী। স্থানীয় ও বৈদেশিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষিত বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ৪ মাস মেয়াদি ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সীমিত আয়ের মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমানো, মানসম্মত ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে বলেও বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী।