প্রতীকী ছবি
রবিবার বিকাল সাড়ে ৩টা। রাজধানীর তেজগাঁও নাখালাপাড়া রেল গেটের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলেন রুবেল হোসেন। যিনি পেশায় একজন লরি চালক। বিগত ২৫ বছর যাবত এ পেশায় যুক্ত।
প্রায় ৪০ বছর বয়সী রুবেল হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয় কত বছর যাবত ধূমপান করছেন? জবাবে তিনি জানান, অন্তত ২৫ বছর হবে। দৈনিক তার ধূমপানে ব্যয় হয় একশ থেকে দেড়শ টাকা। অর্থাৎ মাসে সাড়ে ৪ হাজার ও বছরে প্রায় ৫৪ হাজার টাকা।
স্টার সিগারেট খাওয়া রুবেল হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয় কত টাকা দাম হলে তিনি সিগারেট খাওয়া ছাড়বেন? তিনি বলেন, ধরুন সিগারেটের দাম যদি খুব বেশি হয় অর্থাৎ এই স্টার সিগারেট যদি ১৫ টাকা হয় তখন হয়ত ছেড়ে দেব। কারণ এতটা দাম হলে কিছুটা দ্বিধা হবে কেন এত দামে সিগারেট খাব।
রুবেল হোসেনের সঙ্গে কথা বলার সময় তার পাশে এসে দাঁড়ালেন সারোয়ার সরদার। টাঙ্গাইলের সারোয়ার সরদার ঢাকায় থিতু হয়েছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। ঠেলাগাড়ি চালানো সারোয়ার খান ব্ল্যাক ডায়মন্ড সিগারেট। প্রতি শলাকা ব্ল্যাক ডায়মন্ডের দাম ৫ টাকা।
তিনি বলেন, “বাজারে অনেক ধরনের কম দামি সিগারেট রয়েছে। সরকার যদি এসব সিগারেটের দাম বেশি বাড়ায় তাহলে হয়ত ধূমপান কমবে। কারণ আমরা সব সময় কম দামে একটা না একটা সিগারেট পাই। সিগারেট না হলে বিড়ি পাই। যেটা কম পাই সেটাই খাই। কম দামি সিগারেট যত কমবে ধূমপান তত বেশি কমবে।
ধূমপান স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়া সত্ত্বেও কেন খান জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে এখন ২০ বিড়ির এক প্যাকেটের দাম ২০ টাকা। এতে অনেকেই খাওয়া কিছুটা কমিয়েছে।
তামাক ও তামাকজাত পণ্য নির্মূলে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) দাবি, তামাক, তামাকজাত পণ্য- বিড়ি, সিগারেট, জর্দা ও গুলে উচ্চ কর হার আরোপ করলে ধূমপায়ীদের সংখ্যা কমবে।
এ ব্যাপারে সম্প্রতি অ্যাডভোকেসি ফোরাম প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা), গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা) একাধিক সংবাদ সম্মেলন ও সাংবাদিক কর্মশালায় বর্তমানে ৪ স্তরের মূল্যস্তরকে নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে সমন্বয় করে তিন স্তরে নামিয়ে আনতে প্রস্তাব করেছেন।
সংগঠনগুলোর দাবি, যদি কম দামে ভোক্তা সিগারেট না পায় তাহলে তাদের মধ্যে অনেকেই সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিবেন। এতে দেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা কমবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তামাক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ হার বাংলাদেশে ৩৫.৩ শতাংশ, ভারতে ২৮.৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ।
২০১৭ সালের গ্যাটসের করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তা ছাড়া দেশে তামাক ব্যবহারজনিত কারণে বছরে ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
এ ব্যাপারে প্রজ্ঞার হেড অব প্রোগ্রাম হাসান শাহরিয়ার বলেন, “২০ শলাকা ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির অভিন্ন দাম ও করহার যথাক্রমে ৩০ টাকা ও ৫০ শতাংশ আরোপের করতে হবে। জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রে যথাক্রমে প্রতি ১০ গ্রাম ৬০ টাকা ও ৩০ টাকা খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করতে হবে। একইসঙ্গে সকল তামাকপণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখা দরকার”।
তিনি বলেন, “কর ও মূল্যবৃদ্ধির এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে তামাক খাত থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব হবে। বর্তমান অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে”।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক পণ্যের খুচরামূল্যকে করারোপের ভিত্তিমূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশে তামাকপণ্যের খুচরামূল্য বা ভিত্তিমূল্য খুবই কম, করহার বেশি হলেও তা তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে তেমন কোন অবদান রাখে না।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) প্রকাশিত গ্লোবাল টোব্যাকো এপিডেমিক ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮৬টি দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় ২০ শলাকার ১ প্যাকেট সিগারেটের দাম (আন্তর্জাতিক ডলারে সর্বাধিক প্রচলিত ব্রান্ড) সবচেয়ে বেশি ৩৪.৩৮ টাকা এবং করহার ৬৮.৩৭ শতাংশ। তুর্কেমেনিস্তান (দাম ৩৩.৭৬ ডলার এবং করহার ৩১.৩২%), অস্ট্রেলিয়া (দাম ২৬.১৯ ডলার, করহার ৬৯.১৫%), নিউজিল্যান্ড (দাম ২৬ ডলার, করহার ৭৭.৬৮%) এবং আয়ারল্যান্ড (দাম ২২.৪৩ ডলার এবং করহার ৭৭.৮১%)। দামের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম (৩.৪৮ ডলার) তবে করহারের বিবেচনায় শ্রীলঙ্কা, তুর্কেমেনিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও উপরে রয়েছে বাংলাদেশ (৫৮.৪%)।
এ ব্যাপারে অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মা) কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ বলেন, “ত্রুটিপূর্ণ কর-কাঠামোই বেশি কর, কমদাম এই স্ববিরোধ তৈরি করেছে এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো এনবিআরকে কর না বাড়ানোর ব্যাপারে উৎসাহিত বা প্রভাবিত করে থাকে।
“বিশেষত বিগত বছরগুলোতে সিগারেটের নিম্ন স্তরে সম্পূরক শুল্ক না বাড়িয়ে তামাক কোম্পানিগুলোকে ব্যাপকভাবে মুনাফা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক না বাড়িয়ে কেবল মূল্যস্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে সিগারেটের দাম বাড়ানো হলে বর্ধিত মূল্যের একটি বড় অংশ তামাক কোম্পানির পকেটে চলে যায়”।
তামাক কোম্পানিকে লাভবান রেখে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, “শুধু করহার বাড়ালে তামাকের ব্যবহার কমবে এটা নাও হতে পারে। তবে সকল প্রকার তামাক পণ্য নির্মূল করতে হবে। এ জন্য গোড়াতেই আমাদের কাজ করতে হবে”।