লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২২ ১৫:৪১ পিএম
আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২২ ১৫:৫৭ পিএম
প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় শাহীন রেজা রাসেল গড়ে তুলেছেন জলবায়ু জাদুঘর
তীরন্দাজ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা, আবৃত্তি সংগঠন ‘বৈঠক’-এর সভাপতি, শিল্পকলা একাডেমির সহকারী পরিচালক শাহীন রেজা রাসেল। তবে তার আরেক পরিচয় তিনি একজন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় গড়ে তুলেছেন জলবায়ু জাদুঘর।
প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ শাহীন রেজা রাসেলের জীবনই এক লড়াই, বাঁচার জন্য লড়াই। ৩৮ বছর বয়সি এই যুবকের কাজের ভার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। বিপন্ন পৃথিবীকে মুক্ত করার দায় নিয়েছেন নিজের কাঁধে। যে দায়বদ্ধতা থেকে একের পর এক নতুনের সন্ধান করে চলেছেন। মাগুরার শ্রীপুর উপজেলা শহরে ১৯৮৪ সালের ২৭ এপ্রিলে তার জন্ম। সেখানেই বেড়ে ওঠা। নদী-নালায় ভরপুর ছিল শ্রীপুর। গাছপালা, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। এ যেন স্বর্গ! যেখানে চোখ বন্ধ করে ভাবা যায় পৃথিবী বড়ই সৌন্দর্যময়। প্রকৃতির সান্নিধ্যেই কেটেছে তার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের একাংশ।

পরিবেশ নিয়ে বৃহৎ পরিসরে কাজ শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সংগঠন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ’। এরই ধারাবাহিকতায় গড়েছেন ‘পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘর’।
জাদুঘরটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়েছে। ঘরটির ভেতরে কাঠের টেবিলের ওপর নির্দিষ্ট মাপের সারি সারি কৌটা সাজিয়ে রাখা। এসব কৌটার কোনোটিতে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের বীজ। কোনোটিতে নদীর পানি। আবার কোনোটিতে ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলা, গ্রানাইট পাথর, বিভিন্ন পতঙ্গের বাসা, নানান মাটির নমুনা। ২ শতাধিক উপকরণ স্থান পেয়েছে পরিবেশবান্ধব ঘরটিতে।

ঘরের ভেতরের দেয়ালে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবর্তনের কারণ, পরিবেশ দূষণ, দুর্যোগ, সমুদ্র, পাখি, বাস্তুতন্ত্র, প্রাণী, উদ্ভিদ ইত্যাদি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোকে সচিত্র তথ্যের মাধ্যমে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেন দর্শনার্থীরা পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সম্যক ধারণা পেতে পারেন। নিভৃত পল্লীর ছোট্ট এ জাদুঘরটি দেখতে প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছে। তবে এসব দর্শকের বেশিরভাগই বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দর্শনার্থীর জন্য খোলা রাখা হয় জাদুঘরটি।
রাসেল বলেন, প্রতিদিন নতুন করে ভাবতে শিখেছেন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ইতিবাচকভাবে ভাবতে জানেন। বিশ্বে জলবায়ু কিংবা পরিবেশ আক্রান্তে বাংলাদেশ যে অন্যতম সেটা আমরা জানি। তবে এখানে শাহীন রেজা রাসেল ব্যতিক্রম। কারণ তিনি এগিয়ে এসে উদ্যোগ নিয়েছেন। ‘সাহসের জাদুঘর’ নামে একটি জাদুঘর করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। যেখানে অনেক হতাশ মানুষ, জীবন যায় যায় মুহূর্তের মানুষ জাদুঘরের এক পাশ দিয়ে ঢুকবে, আরেক পাশ দিয়ে বের হবে সাহস নিয়ে। যেখানে স্টিফেন হকিংয়ের মতো একজন মানুষ, হুইল চেয়ারে একজন প্রতিবন্ধী হয়ে কীভাবে বিশ্ব জয় করেছিলেন, কীভাবে অসাধারণ সব কাজ করেছেন! এ রকম চমৎকার কিছু কাজ, উদাহরণ রেখে যদি সাহসের জাদুঘর করা যায়, সেটিও হবে এক অসাধারণ কাজ।’

শাহীন রেজা রাসেল ২০০৮ সালে সর্বপ্রথম পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি, সেহেতু এমন একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশেই হওয়া উচিত বলে তিনি সব সময় ভাবতেন। কিন্তু অর্থ, উপযুক্ত জায়গা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করা তখন সম্ভব হয়নি বলে জানান। তিনি আরও বলেন, ‘আমার ইচ্ছা ছিল জাদুঘরটি ঢাকায় করব, যাতে দেশের সব প্রান্তের মানুষ এটি পরিদর্শন করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে যোগাযোগটা সহজ হয়। কিন্তু ঢাকায় এটি তৈরি করার মতো অর্থ বা জায়গা আমার নেই।’

২০২১ সাল থেকে শ্রীপুরে রয়েছেন শাহীন রেজা রাসেল। যার ভেতরে স্বপ্ন বোনা এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের বীজ বপন একবার হয়, তাকে দমানো যায় না। তিনি সেখানে বসেই ভাবেন গ্রামেই ‘পরিবেশ ও জলবায়ু জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু একে ছড়িয়ে দিতে চান সারা দেশে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত সব তথ্য এবং ডেমোনেস্ট্রেশন এখানে থাকবে, পৃথিবীর সব দেশের মাটি, সব সমুদ্র-হ্রদ-নদীর পানি, সব প্রজাতির গাছের পাতা, সব ধরনের প্রাণীর মমি, সব ফুল-ফলের বীজ, সব খনিজ পদার্থের নমুনা, জলবায়ু, আবহাওয়া, সৌরজগৎ, গ্রহনক্ষত্র, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদির ডেমোনেস্ট্রেশন এ জাদুঘরে থাকবে। আমি কাজ করে চলেছি। আমি হয়তো আর বেশিদিন নেই পৃথিবীতে। কিন্তু আমার মৃত্যুর পরও যাতে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানুষের সহযোগিতায় জাদুঘরটি টিকে থাকে এবং সারা পৃথিবীতে আলো ছড়ায় সেটাই আমার একমাত্র প্রত্যাশা।’