ফারজানা কুইন
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৩ ১৬:৫৫ পিএম
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৩ ১৭:১৬ পিএম
অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কারও দয়া কিংবা অনুগ্রহে নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকুক সমাজের প্রতিটি মানুষ। এমন উপলব্ধি থেকে প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের পাশে দাঁড়ান প্রান্তোষ বৈদ্য।
বরিশালের ইছাকাঠি গ্রামে প্রান্তোষের জন্ম। স্বপ্ন দেখেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায়। উন্নত জীবনের আশায় ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকায়। শিক্ষাজীবন শেষ করে ভালো বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করেছিলেন। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে রেখেছিলেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য কিছু করার। বিশেষ করে প্রতিবন্ধীদের প্রতি অবজ্ঞামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সব সময় ভাবিয়ে তুলত।
একসময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেমে পড়েন। একক প্রচেষ্টায় ঢাকা ছেড়ে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন সমতা ইনক্লুসিভ স্কুল। প্রতিবন্ধী ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে প্রান্তোষের এমন উদ্যোগ। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে শুরু করেন স্কুলের কার্যক্রম। গ্রামের দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সংগ্রহ করে নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে ভর্তি করান।

বর্তমানে এ স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫ জনে। সবাইকে শিক্ষাসামগ্রী থেকে শুরু করে চাহিদা অনুযায়ী হুইলচেয়ার, ক্রাচ, জামা, জুতোসহ প্রয়োজনীয় ব্যবহারসামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করেন তিনি। নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে বহন করে চলেছেন শিশুদের এ ব্যয়ভার। বিনামূল্যে টিউশন প্রদান করার পাশাপাশি নাচ, গান, কবিতা, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে এ শিশুরা। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম শেষে শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাদ্যও বিতরণ করছেন তিনি।
দরিদ্র এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিষ্ঠিত করতে স্বেচ্ছায় শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। একক প্রচেষ্টায় এ বিশাল কর্মযজ্ঞের সামাল দিয়ে যাচ্ছেন প্রান্তোষ নিজেই। এ ছাড়া কর্মহীন দরিদ্র নারী সদস্যদের হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
স্থানীয় অভিভাবক দেলোয়ার হোসেন জানান, গ্রামের দরিদ্র শ্রেণির অনেক মানুষ আছে। সাধারণ স্কুলগুলোতে পড়ার মতো তাদের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা নেই। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকরা চিন্তিত ছিলেন। ‘সমতা’ স্কুলের মাধ্যমে তারা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
প্রতিবন্ধী এক শিক্ষার্থীর মা রিতা হাজরা বলেন, ’প্রতিবন্ধীদের সবাই বোঝা মনে করে। একজন মা কখনও তা মনে করেন না। আমার তো তাকে লালন-পালন করতে হয়। মেয়েটার লেখাপড়া-ভবিষ্যৎ নিয়ে এত দিন দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ’সমতা’ স্কুলে ভর্তি করানোর পর মেয়েটাকে নিয়ে এখন কিছুটা আশার আলো দেখছি। আমি নিজে মেয়েকে প্রতিদিন স্কুলে দিয়ে আসি।‘
কথা হয় প্রতিবন্ধীদের নিয়ে এগিয়ে চলা সমতা ইনক্লুসিভ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রান্তোষ বৈদ্যের সঙ্গে। তিনি বলেন, ’আমাদের সমাজে একটা শ্রেণি আছে সব সময় অবহেলার স্বীকার হয়। শিক্ষা ও নানা রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। তাদের প্রতি এ অবহেলাটা আমাকে সব সময় তাড়া করে বেড়াত। অবহেলিত সেসব শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমার এ উদ্যোগ। ওদের সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে বুঝতে পারি ওরা কতটা অসহায়। তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেই আমার সার্থকতা। ইতোমধ্যে আমরা এমপিওভুক্ত হওয়ার সব শর্ত পূরণ করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ পাশাপাশি দরিদ্র্র প্রতিবন্ধী শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন।
নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলের দরিদ্র প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবনমান উন্নত করতে তিনি সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চান। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজের অন্তত কেউ না কেউ তার পাশে দাঁড়াবেন।