× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পথের ধারে ‘পান্থজনের সখা’

বহ্নি ফারহানা

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২২ ১৭:২৪ পিএম

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২২ ১৭:৩৮ পিএম

ছবি: রাজধানীর সাতরাস্তার মোড়ে কিছুটা হাঁটতেই চোখে পড়বে ফুটপাতে সাদা দেয়ালে বড় করে লেখা ‘ভালো কাজের হোটেল’

ছবি: রাজধানীর সাতরাস্তার মোড়ে কিছুটা হাঁটতেই চোখে পড়বে ফুটপাতে সাদা দেয়ালে বড় করে লেখা ‘ভালো কাজের হোটেল’

‘হোটেল’ শব্দটির সরল ও আভিধানিক অর্থ যেখানে মূল্য দিয়ে ভোজন এবং ক্ষেত্রবিশেষে বসবাসের ব্যবস্থাও করা যায়। কিন্তু ভালো কাজের হোটেল তেমন নয়, এটা শুনে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ উপন্যাসের গল্পটা মনের মধ্যে একবার উঁকি দিয়ে গেলেও এই হোটেল তেমন নয়। ওই উপন্যাসের শেষে রাঁধুনি হিসেবে হাজারি ঠাকুরের জনপ্রিয়তা রানাঘাট থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও তার হোটেলে বিনে পয়সায় খাবার জুটত না।

শুধু খাবার খাওয়ানো নয়। হোটেল বলতেই কানে আসে বেয়ারার হাঁকডাক, চেয়ার-টেবিল টানাটানির শব্দ, হরেক রকমের খাবার পরিবেশনের হট্টগোল। অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত খাবার দেওয়া হয় যেসব হোটেলে, তার সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে ভালো কাজের হোটেল। ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়’- ব্যতিক্রমধর্মী এই হোটেলে খাবার পাওয়ার জন্য লাগে সামান্য কোনো একটি ভালো কাজ। 

আগেই বলা হয়েছে, কয়েকজন তরুণের ব্যতিক্রমধর্মী এই উদ্যোগের নাম ‘ভালো কাজের হোটেল’। এই হোটেলেও আছে বাকির খাতা। যদি কেউ ভালো কাজ করে আসতে না পারেন এবং কথা দেন আরেকদিন সেই ভালো কাজটা করে আসবেন, তার বিনিময়েও পেয়ে যান একবেলার খাবার।

এ হোটেলের উদ্দেশ্য কী? ‘ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র চিবিয়ে খাবো’- গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার দুর্ভিক্ষের সময় কবি রফিক আজাদ তাঁর কবিতায় ক্ষুধার সর্বগ্রাসী রূপের কোনোকিছুই ফেলনা না। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের মানচিত্রও চিবিয়ে খেতে পারে। কবিতায় কথাগুলো রূপকার্থে ব্যবহৃত হলেও মানুষ যে কোনো অন্যায়ের দিকে এগিয়ে যেতে পারে ক্ষুধার তাড়নায়,সেই চিন্তা থেকে ক্ষুধা ও অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অসহায় মানুষদের জন্য তারা খুলে বসেছেন ‘ভালো কাজের হোটেল’।


রাজধানীর সাতরাস্তার মোড়ে কিছুটা হাঁটতেই চোখে পড়বে ফুটপাতে সাদা দেয়ালে বড় করে লেখা হোটেলের নাম ‘ভালো কাজের হোটেল’। পথের ধারে এ যেন ‘পান্থজনের সখা’। বহুকাল আগে বাংলার পথে পথে থাকত এমন পান্থশালা। বিগত দিনের ইতিহাস তো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই নতুন প্রজন্মের তরুণদের এই আয়োজনে আছে প্রতিযোগিতাও। ‘ভালো কাজের হোটেল’ লেখার পাশেই আবার ‘ভালো কাজের পুরস্কার’ লিখে তিনটি শূন্যস্থান রাখা হয়েছে। ভালো কাজের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী প্রথম তিনজনকে পুরস্কৃতও করা হয়।

দুদিন আগে দুপুরের দিকে দেখা হলো ওই হোটেলের অতিথিদের সঙ্গে। দেড়টা বাজতেই আউলা চুলের বাউলাটাইপের একজন এসে বসলেন হোটেলে। এখানে বসে আছেন কেন? ইশারায় বললেন খেতে এসেছেন, তবে কোনো ভালো কাজ করেননি। খেতে দেবে তাহলে? প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা চিন্তায় পড়েছেন। কিছুক্ষণ পর জটাচুলের আরও একজন এলেন। কিছু বলার আগে নিজেই বললেন, ‘আমি এরশাদের আমল থেকে এখানে, এটা আমার জায়গা। আমি এখানে খাই।’ ভালো কাজ করেছেন? বললেন, ‘খারাপ কাজ করি না, এডাই ভালো কাজ’। তারপর বুক ফুলিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন একবার এদিক আরেকবার ওদিক। আবারও ঘুরে এসে বললেন, ‘এখানে আমরা খাই’। তাঁর পেছনেই দেয়ালে বড় করে ‘ভালো কাজের হোটেল’ লেখাটা হয়তো কোনোদিন পড়েননি। তবে দুজনের কেউই নিজের নামটা ঠিকমতো বলতে পারেননি। কিছুটা ভারসাম্যহীন হলেও এতটুকু অনুভব করতে পারেন এখানে তাদের ভিক্ষা দেওয়া হয় না, এটা তাদের খাবার। ধীরে ধীরে বিভিন্ন বয়সের আরও অনেকে আসতে শুরু করেন। হোটেলে বসে গল্প করছেন একে অপরের সঙ্গে। বোঝা যাচ্ছে এই হোটেলে তাদের আনাগোনা অনেক আগে থেকেই। তাদের কেউই নিজেদের ভালো কাজের কথা বলতে চান না। একজন বললেন, ‘ওরা এসে খাতায় লিখবে তখন বলব।’ 

হুমায়ূন আহমেদের ‘সবুজ ছায়া’ নাটক থেকে এ হোটেলের নামকরণ করেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আরিফুর রহমান। ওই নাটকে ফারুক নামের এক যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেন জাহিদ হাসান। ফারুক সিদ্ধান্ত নেন প্রতিদিন একটি করে ভালো কাজ করবেন। তবে ভালো কাজ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি স্কুুলশিক্ষককে বলেন কি করবেন? তিনি তাঁকে বলেন, কিছু যদি না পাও তবে মানুষের সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলো, তাদের শারীর-স্বাস্থ্যের খবর নাও। এই হোটেলেও এমন মানুষ আসে যারা ভালো কাজ খুঁজে পাননি। তাদেরও খাবার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না বরং পরদিন দুটি ভালো কাজ করার উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ভলান্টিয়াররা নিজেদের করা ভালো কাজের গল্পও বলেন তাঁদের। 

কিছুক্ষণ পর দুপুর আড়াইটার দিকে খাবারের গাড়ি চলে আসে। ফুটপাতের নিচে রঙ দিয়ে সিট নম্বর লেখা। সিটের নম্বর অনুযায়ী বসতে সবাইকে মাইকে অনুরোধ জানাচ্ছেন মো. হাসান। তিনি ইয়ুথ ফর বাংলাদেশের একজন ভলান্টিয়ার। এখানে খাবার দেওয়ার দায়িত্বটা তাঁর। কেমন ভালো কাজ করতে হবে এ হোটেলে খেতে হলেÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালো কাজের কোনো আলাদা সংজ্ঞা নেই। কেউ মাকে বাসায় সাহায্য করছেন, কেউ কারও বোঝা তুলে দিচ্ছেন, কেউ অন্ধকে রাস্তা পাড় করিয়ে দিচ্ছেন, হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাকে কেউ বাসায় পৌঁছে দিচ্ছেন, কাউকে রাস্তা চিনতে সাহায্য করছেন, সবই ভালো কাজ।’

অন্য একজন ভলান্টিয়ার হাতে খাতা-কলম নিয়ে সবার কাছে জানতে চাইছেন তাদের বয়স, কী করেন, আজ কী ভালো কাজ করেছেন? পাশেই একটি গ্যারেজে কাজ করেন হৃদয় (৩০)। তিনি আজ এক অন্ধকে রাস্তা পার করিয়ে দিয়েছেন। টিটু (২০) নামের অপর একজন যুবক বললেন, একজনকে ভ্যান ঠেলতে সহযোগিতা করেছেন। আবার কেউ তার বাসায় মাকে সাহায্য করেছেন। অনেকেই আছেন, যারা কোনো ভালো কাজের কথা জানাতে পারছেন না। 

পেছনে অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন, সিট পাননি পরের দফায় খেতে বসবেন। একটি ছোট বাচ্চা অভিমান করে আছে। একজন ভলিন্টিয়ারের কাছে ছুটে গেল। কেউ কিছু বলেছে তাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ভলান্টিয়ার তাকে শান্ত করলেন। এখানে খেতে আসা প্রত্যেকেই এ হোটেলের অতিথি। তাদের কেউ অসম্মান করলেও জবাবদিহি করতে হবে। 


এ কার্যক্রম মানুষের মধ্যে কতটুকু পরিবর্তন এনেছে তা নিয়ে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য মো. ফারুক বলেন, ‘কমলাপুরে একজন চুরি করতেন। এখন আর চুরি করেন না। কারণ জানতে চাইলে বলেন, আমি খাবারের জন্যই চুরি করতাম। খেতে পারলে কেন চুরি করব। এটাও একটা পরিবর্তন। আমরা তাদের একটা কাউন্সিলিংয়ের মধ্যে রাখি। তারা যেন আবার সে অপরাধে ফিরে না যান সে জন্য নিয়মিত তাদের সঙ্গে কথা বলি।’

এই হোটেলের শুরু ২০১৯ সালে। এর পেছনে আছে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইয়ুথ ফর বাংলাদেশ’। এ সংগঠন যাত্রা শুরু করেছিল ২০০৯ সালে। প্রথমে এ সংগঠনের কাজ ছিল বিভিন্নভাবে দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করা, এক থেকে ১১ বছরের শিশুদের হৃদরোগ ও ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা দেওয়া, বন্যার্তদের মাঝে সাহায্য দেওয়া ও শীতবস্ত্র বিতরণ। এর পাশাপাশি বছরে তিন থেকে চারবার অসহায় মানুষদের খাওয়াত সংগঠনটি। 

শনি থেকে বৃহস্পতি প্রতিদিন ঢাকার বনানী, কমলাপুর, সাত রাস্তার মোড়ে প্রায় ৭০০ মানুষের খাবারের জোগান দেয় সংগঠনটি। সম্প্রতি চট্টগ্রামের পুরাতন রেলস্টেশনে ভালো কাজের হোটেলের আরেকটি শাখা চালু হয়েছে। কীভাবে এত মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন? তা জানতে চাইলে মো. ফারুক বলেন, মূলত এটি একটি ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন। এ সংগঠনের সদস্যরা প্রতিদিন ১০ টাকা জমা দেন।  তাদের ডেইলি টেন মেম্বার বলে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এ অর্থ দিয়ে প্রতি মাসে এই হোটেলের সাড়ে ৪ লাখ টাকার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ ছাড়া, অনেক শুভাকাক্সক্ষীসহ অনেকেই এ কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে সহযোগিতা করেন।

প্রবা/জিকে


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা