গণঅভ্যুত্থানের নায়কেরা
বাসস
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৫ ০৯:৩১ এএম
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫ ১৬:৪৩ পিএম
মা চাইতেন ছেলেকে ডাক্তার বানাতে, আর ছেলে স্বপ্ন দেখত পাইলট হয়ে অ্যাডভেঞ্চারের, বিশ্ব ঘুরে দেখার। কিন্তু ফ্যাসিবাদী হাসিনার খুনি বাহিনীর প্রাণঘাতী গুলিতে শহীদ হয়ে অকালে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন সেই স্বপ্নবাজ তরুণ আলিফ আহমেদ সিয়াম (১৫)। তিনি ছিলেন সাভারের ডেইরি ফার্ম হাই স্কুলের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। তুখোড় মেধাবী ও সাহসী সিয়াম নিয়মিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতেন, সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের চূড়ান্ত দিন ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় বাসা থেকে বের হয়ে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেন সিয়াম। এ সময় সাভার থানার বাসস্ট্যান্ড ফুটওভার ব্রিজের নিচে আনুমানিক দুপুর আড়াইটার দিকে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। গুলিটি মাথার নিচে দুই ভ্রুর মাঝখান দিয়ে ঢুকে পিছন দিয়ে বের হয়ে যায়।
সাড়ে ৩টার দিকে খবর পেয়ে মা তানিয়া আক্তার সিয়ামকে সাভারের এনাম মেডিকেলে ভর্তি করান। কিন্তু বাঁচানো যায়নি তাকে। আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় শাহাদত বরণ করেন সিয়াম। ইসলাম নগর বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও জাহাঙ্গীরনগর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জানাজা শেষে ৮ আগস্ট সকালে বাগেরহাটের বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের মা তানিয়া আক্তার পেশায় শিক্ষিকা। তিনি ছেলেকে ডাক্তার বানানোর ইচ্ছা পোষণ করতেন। তবে আলিফ তার মাকে বলতেন, তিনি পাইলট হবেন, অ্যাডভেঞ্চার করবেন এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে পবিত্র হজব্রত পালন করবেন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার মাকে দিয়ে মেধাবী ছাত্র সিয়ামকে আন্দোলনে না যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এতে দমে না গিয়ে সিয়াম মাকে বলেছিলেন, ‘হয় বীরের মতো বাঁচব, নইলে বীরের মতো মরব।’
কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে সিয়ামের মা তানিয়া আক্তার কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমি স্বামীর বদলে আমার ছেলের নামে পরিচিত হতে চেয়েছিলাম। এখন সবাই আমাকে শহীদ আলিফের মা হিসেবেই চেনে।’
তানিয়া আক্তারের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, আলিফ ১৭ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলে রাবার বুলেট ও টিয়ার শেলে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলন থেকে পিছপা হননি। কারণ ক্লাস ওয়ানে ও ক্লাস সিক্সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরীক্ষা দিয়েও কোটার কারণে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। ওই জেদ থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে শেষ দিন পর্যন্ত রাজপথে ছিলেন সিয়াম।
বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের বাঁশবাড়ীয়া কাশিমপুর এলাকার ব্যবসায়ী মো. বুলবুল কবীর ও শিক্ষিকা তানিয়া আক্তারের একমাত্র ছেলে ছিলেন সিয়াম। তার একমাত্র বোন ইসরাত জাহান লামহা (১২) বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের বাবা ব্যবসায়ী বুলবুল কবীর বলেন, ‘আমার সন্তান দেশের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ত্বরান্বিত করতে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে।’ তিনি শহীদ আলিফের নামে বাগেরহাটের কোনো স্কুল, কলেজ অথবা হাসপাতালের নামকরণের দাবি জানান।
শহীদ আলিফের বাবা আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী খুনি হাসিনার নির্দেশে বিডিআর হত্যা, হেফাজতে ইসলাম হত্যা এবং ২ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তার বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার।’